<<<<<<<=>>>>>>> <<<এক বাকসো ভূত>>>
সংকলনেঃ অনলাইন জগতের বন্ধুরা । আমাদের কথা আমরা অনেকেই বই পড়তে খুব ভালবাসি ।সামর্থ্য অনুযায়ী বইও পড়ি অনেক ।ছোট বেলায় পড়ি ,ছোট ছোট রূপ কথা ,ভূতের গল্প আর বড় হয়ে নজরুল ,রবীন্দ্রনাথ ,শেক্সপিয়ারের মোটামোটা ,শক্তপোক্ত মহামূল্যমান বই ।এত কিছুর ভিড়েও কিন্তু আমাদের মন পড়ে থাকে সেই ছোটবেলার রুপকথা ,ভূতের গল্পের রাজ্যে ।ছোট ভাই/বোন কিংবা ছেলে /মেয়ের জন্য কিনে আনা বইগুলো গোগ্রাসে কিনে আনাই তার প্রমাণ ।যাক এখন এইসব প্যাচাল না পাড়ে স্বাগতম জানাই প্রথম uhtml ফরম্যাটের ভূতের গল্প সংকলন 'এক বাকসো ভূত'বইটিতে ।আর বইটি তৈরী করতে লেখা পাঠিয়ে আমাকে সাহায্য করেছেঃ প্রজন্ম ফোরাম ,রংমহল ফোরাম ,টরেন্টসবিড.কম সহ আরও অনেক ব্লগ ও ফোরামের সদস্যরা ।এজন্য তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ । ||ভূতের গল্প|| >পূর্ণেন্দু পত্রী<
আমি ভূতের গল্প বড় ভালবাসি। তোমরা পাঁচ জনে মিলিয়া গল্প কর, সেখানে পাঁচ ঘন্টা বসিয়া থাকিতে পারি। ইহাতে যে কিমজা! একটা শুনিলে আর-একটাশুনিতে ইচ্ছা করে, দুটা শুনিলে একটা কথা কহিতে ইচ্ছা করে। গল্প শেষ হইয়াগেলে একাকী ঘরের বাহিরে যাইতে ইচ্ছে হয় না। তোমাদের মধ্যে আমার মতন কেহ আছ কি না জানি না, বোধ হয় আছে। তাই আজ তোমাদের কাছে একটা গল্প বলি। গল্পটা একখানি ইংরেজি-কাগজে পড়িয়াছি। তোমাদের সুবিধার জন্য ইংরেজি নামগুলি বদল করিয়া দিতে ইচ্ছা ছিল, কিন্তু গল্পটি পড়িলেই বুঝিতে পারিবে যে শুধু নাম বদলাইলে কাজ চলিবে না। সুতরাং ঠিক যেরূপ পড়িয়াছি, প্রায় সেইরূপ অনুবাদ করিয়া দেওয়াই ভাল বোধ হইতেছে।
‘স্কটল্যাণ্ডের ম্যাপটারদিকে একবার চাহিয়া দেখিলে বাঁ ধারে ছোট ছোট দ্বীপ দেখিতে পাইবে। তাহার উপরেরটির নাম নর্থ উইস্ট্, নীচেরটির নাম সাউথ্ উইস্ট্। এর মাঝামাঝি ছোট-ছোট আর কতকগুলি দ্বীপ দেখা যায়। এ সেকালের কথা, তখত স্টীম্ এঞ্জিনও ছিল না, টেলিগ্রাফ্ও ছিল না। আমার ঠাকুরদাদা তখন এর একটি দ্বীপে স্কুলে মাস্টারি করিতেন।’
‘সেখানে লোক বড় বেশি ছিলনা। তাদের কাজের মধ্যে কেবল মাত্র মেষ চরান, আর কষ্টে সৃষ্টে কোন মতে দিন চলার মত কিছু শস্য উৎপাদন করা। সেখানকার মাটি বড় খারাপ; তারি একটুএকটু সকলে ভাগ করিয়া নেয় আর জমিদারকে খাজনা দেয়।… এরা বেশ সাহসী লোক ছিল। আর ঐরকম কষ্টে থাকিয়া এবং সামান্য খাইয়াও বেশ একপ্রকার সুখে স্বচ্ছন্দে কাল কাটাইত।’
‘এই দ্বীপে এল্যান্ ক্যামেরন নামে একজন লোক ছিলেন, তাঁহার বাড়ি গাঁ থেকে প্রায় এক মাইল দূরে।এল্যানের সঙ্গে মাস্টারমহাশয়ের বড় ভাব, তাঁর কাছে তিনি কত রকমের মজার গল্প বলিতেন। হঠাৎ একদিন ক্যামেরন বড় পীড়িত হইলেন, আর কিছুদিন পরে তাঁহার মৃত্যু হইল। তাঁহার কেউ আপনার লোক ছিল না, সুতরাং তাঁহার বিষয়-সমস্ত বিক্রি হইয়া গেল। তাঁর বাড়িটা কেহই কিনিতে চাহিল না বলিয়া তাহা অমনি খালি পড়িয়া রহিল।’
‘এর কয়েক মাস পরে একদিন জ্যোৎন্সা রাত্রিতে ডনাল্ড্ ম্যাকলীন বলিয়াএকটি রাখাল ঐ বাড়ির পাশ দিয়া যাইতেছিল। হঠাৎ জানালার দিকে তাহার দৃষ্টি পড়িল, আর সে ঘরের ভিতরে এল্যান্ ক্যামেরনের ছায়া দেখিতে পাইল। দেখিয়াই ত তার চক্ষু স্থির! সেখানেই সে হাঁ করিয়ার দাঁড়াইয়া রহিল। তাহার চুলগুলি খ্যাংরা কাঠির মত সোজা হইয়া উঠিল, ভয়ে প্রাণ উড়িয়া গেল, গলা শুকাইয়া গেল।’
‘শীঘ্রই তাহার চৈতন্য হইল। ঐরকম ভয়ানক পদার্থের সঙ্গে কাহারই বা জানাশুনা করিবার ইচ্ছা থাকে? সে ত মার দৌড়! একেবারে মাস্টার-মশাইয়ের বাড়িতে। তাঁহার কাছে সব কথা সে বলিল। মাস্টারমহাশয় এ-সব মানেননা। তিনি তাহাকে প্রথম ঠাট্টা করিলেন, তারপরে বলিলেন, তাহার মাথায় কিঞ্চিৎ গোল ঘটিয়াছি; আরো অনেক কথা বলিলেন-বলিয়া যাথাসাধ্য বুঝাইয়াদিতে চেষ্টা করিলেন যে, ঐরূপ কিছুতে বিশ্বাস থাকা নিতান্ত বোকার কার্য।’
‘ডনাল্ড্ কিন্তু ইহাতে বুঝিল না, সে অপেক্ষাকৃত সহজ বুদ্ধি বিশিষ্ট অন্যান্য লোকের কাছে তাহার গল্প বলিল। শীঘ্রই ঐ দ্বীপের সকলেই গল্প জানিতে পারিল। ঐ-সব বিষয় মীমাংসা করিতে বৃদ্ধরাই মজবুত। তাঁহারা ভবিষ্যতের সম্বন্ধে ইহাতে কত কুলক্ষণই দেখিতে পাইলেন।’
‘ঐ দ্বীপের মধ্যে কেবলমাত্র মাস্টারমহাশয়ের কাছে খবরের কাগজ আসিত। মাসের মধ্যে একবার করিয়া কাগজ আসিত আর সেদিন সকলে মাস্টারমহাশয়ের বাড়িতে গিয়া নূতন খবর শুনিয়া আসিত। সেদিন তাহাদের পক্ষে একটা খুব আনন্দের দিন। রান্নাঘরে বড় আগুন করিয়া দশ-বার জন তাহার চারিদিকে সন্ধ্যার সময় বসিয়া কাগজের বিজ্ঞাপন হইতে আরম্ভ করিয়া অমুক কর্তৃক অমুক যন্ত্রে মুদ্রিত হইল ইত্যাদি পর্যন্ত সমস্ত বিষয়ের তদারক ও তর্কবিতর্ক করিত। শেষে কথাগুলি সকলেরই একপ্রকার মুখস্থ হইয়াছিল, এবং পড়া শেষ হইলে ঐ কথাটা প্রায় সকলে একসঙ্গে একবার বলিত।’
‘এই-সকল সভায় রাখাল, কৃষক,গির্জার ছোট পাদরি প্রভৃতি অনেকেই আসিতেন। গ্রামের মুচি ররীও আসিত। ররী ভয়ানক নাছোড়বান্দা লোক। একটি কথা উঠিলে তাহাকে একবার আচ্ছা করিয়া না ঘাঁটিলে সহজে ছাড়িবে না।’
‘ডনাল্ড ম্যাকলীনের ঐ ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পরে একদিন সকলে এইরূপ সভা করিয়া বসিয়াছে, মাস্টারমহাশয় চেঁচাইয়া তর্জমা করিতেছেন, এমন সময়একজন আসিয়া বলিল যে, এল্যান্ ক্যামেরনের ছায়া আবার দেখা গিয়াছে। এবারে একজন স্ত্রীলোক দেখিয়াছে। এ রাখাল যে স্থানে যেভাবে উহাকে দেখিয়াছির, এও ঠিক সেইরকমদেখিয়াছে।’
‘এরপর আর পড়া চলে কি করিয়া! মাস্টারমহাশয় চটিয়া গেলেন এবং ঠাট্টা করিতে লাগিলেন। ররী তৎক্ষাণাৎ তাহার প্রতিবাদ করিল। ররী কোন কথাই ঠিক মানে না। এবারেওমাস্টারমহাশয়ের কথাগুলি মানিতে পারিল না। প্রচণ্ড তর্ক উপস্থিত। ভূতের কথা লইয়া সাধারণভাবে এবং ক্যামেরনের ভূতের বিষয় বিশেষভাবে বিচার চলিতে লাগিল। আর সকলে বেশ মজা পাইতে লাগিলেন। কিন্তু রীরর মেজাজ গরম হইয়া উঠিল। সে বলিল-’
‘দেখ মস্টারের পো, যতই কেন বল না, আমি এক জোড়া নতুন বুট হারব, তোমার সাধ্যি নেই আজ দুপুর রেতেওখান থেকে গিয়ে দেখে এস।’
‘সকলে করতালি দিয়া উঠিল। মাস্টারমহাশয় হাসিয়া উড়াইয়া দিতে চাহিলেন, কিন্তু ররী ছাড়িবে কেন? সে সকলের উপর বিচারের ভারদিল। তাহারা এই মত দিল যে, মাস্টারমহাশয় যখন গল্পগুলি মানিতেছেন না, সে স্থলে তাঁহার যে নিদেনপক্ষে তিনি যে এ মানেন নাতা প্রমাণ করিয়া দেন।’
‘মাস্টারমহাশয় দেখিলে, অস্বীকার করিলে যশের হানি হয়। তিনি বলিলেন, “যাব বই কি? কিন্তু আমি ফিরে এলেও এর চাইতে আর তোমাদের জ্ঞান বাড়বে না।” মাস্টারমহাশয়-‘ভাল, ওখানেগিয়ে আমি কি কর্ব?’
ররী-‘ওখানে গিয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তিনবার বলবে-এল্যান্ ক্যামেরন আছে গো!’ কান জবাব না পাওফিরে এস, আমি আর ভূত মানবো না।
মাস্টারমহাশয় হাসিয়া বলিলেন, ‘এটা ঠিক জেনো যে, এল্যান, সেখানে থাকলে আমার কথার উত্তর দিবেই। আমাদের বড় ভাব ছিল।’
একজন বলিল, ‘তাকে যদি দেখতে পাও, তা হলে মুচির কাছে যে ও টাকা পেতে, সে কথাটা তুল না।’ এ কথায় সকলে হাসিয়া ফেলিল, ররী একটু অপ্রস্তুত হইল।
‘এইরূপে হাসি-তামাশা চলিতে বলিল-‘বারটা বাজতে কুড়ি মিনিট বাকি। তুমি এখন গেলে ভাল হয়; তাহলেই ঠিক ভূতের সময়টাতে পৌঁছতে পারবে।’
‘বেশ করিয়া কাপড়-চোপড় জড়াইযা মাস্টারমহাশয় যষ্টি হস্তে সেই বাড়ির দিকে চলিলেন। মাস্টারের যাইবার সময়ে সকলেই দু-একটি খোঁচা দিয়া দিল এবং স্থির করিল, ফলটা কি হয় দেখিয়া যাইবে।’
‘রাত্রি অন্ধকার। এতক্ষণ বেশ জ্যোৎস্না ছিল, কিন্তু এক্ষণে কাল কাল মেঘে আসিয়া চাঁদকে ঢাকিয়া ফেলিতেছে। মাস্টার চলিয়া গেলে সকলে আরম্ভ করিল যে, সমস্ত রাস্তাটা সাহস করিয়া যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব কি না। ছোট পাদরি বলিল যে তিনি হয়ত অর্ধেক পথ গিয়াই ফিরিয়া আসিয়া যাহা ইচ্ছা বলিবেন, তখন আর কাহারো কিছু বলিবার থাকিবে না। ইহা শুনিয়া মুচির মনে ভয় হইল, জুতা জোড়াটা নেহাত ফাঁকি দিয়া নেয়, এটা তাহার ভাল লাগিল না। তখন একজন প্রস্তাব করিল যে, ররী যাইয়া দেখিয়া আসুক।’
‘প্রথমে ররী ইহাতে আপত্তিকরিল। কিন্তু উহার বক্তৃতায় পরে রাজি হইল। সকলে তাহাকে সাবধান করিয়া দিল যেন মাস্টার তাহাকে দেখিতে না পায়, তারপর সে বাহির হইল। খুব চলিতে পারিত এই গুণে শীঘ্রই সে মাস্টারকে দেখিতে পাইল। ররী একটু দূরে দূরে থাকিতে লাগিল। রাস্তাটা একটা জলা জায়গার মধ্যে দিয়া। একটি গাছপালা নাই যে মাস্টার ফিরিয়া চাহিলে তাহার আড়ালে থাকিয়া বাঁচিবে।’
‘পরে মাস্টারমহাশয় যখন ঐ বাড়িতে পৌঁছিলেন, তখন ররী একটু বুদ্ধি খাটাইয়া খানিকটা ঘুরিয়া বাড়ির সম্মুখে আসিল। সেখানে একটু নিচু বেড়া ছিল, তাহার আড়ালে শুইয়া পড়িল।’
‘সে অবস্থায় দূতের কার্য করিতে যাইয়া তাহার অন্তরটা গুর গুর করিতে লাগিল। মাস্টারমহাশয় ছিলেন বলিয়া, নইলে সে এতক্ষণ চেঁচাইয়া ফেলিত। কষ্টে সৃষ্টে কোন মতে প্রাণটা হাতে করিয়া দেখিতেছে কি হয়। মনে করিয়াছে, মাস্টারমহাশয় যেরূপ ব্যবহার করেন, তাহাদেখা হইয়া গেলেই সে বাহিরহইবে।’
‘গ্রামের গির্জার ঘড়িতে বারটা বাজিল। সে বেড়ার ছিদ্র চাহিয়া দেখিল যে মাস্টারমহাশয় নির্ভয়ে দরজার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়াছেন।’
‘মাস্টারমহাশয় গলা পরিষ্কার করিলেন এবং একটু শুষ্ক স্বরে বলিলেন-‘এল্যান্ ক্যামেরন আছে গো!’-কোন উত্তর নাই।
‘দু-এক পা পশ্চাৎ সরিয়া একটু আস্তে আবার বলিলেন, ‘এল্যান্ ক্যামেরন আছ গো!’-কোন উত্তর নাই।
‘তারপর বাড়িতে আসিবার রাস্তাটি মাথা পর্যন্ত হাঁটিয়া গিয়া থতমত স্বরে অর্থচিৎকার অর্থ আহ্বানের মত করিয়া তৃতীয়বার বলিলেন, ‘এল-ক্যামেরন-আছ-।’ তারপরআর উত্তরের অপেক্ষা নাই।-সটান চম্পট।
‘কি সর্বনাশ! কোথায় মাস্টারের সঙ্গে বাড়ি যাইবে, মাস্টার যে এ কি করিয়া ফেলিলেন মুচি বেচারীর আর আতঙ্কের সীমা নাই।তবে বুঝি ভূত এল! আর থাকিতে পারিল না। এই সময়েতার মনে যে ভয় হইয়াছিল, তারই উপযুক্ত ভয়ানক গোঁ গোঁ শব্দ করিতে করিতে সেমাস্টারমহাময়ের পেছনে ছুটিতে লাগিল।
সেই ভয়ানক চিৎকার শব্দ মাস্টারমহাশয় শুনিতে পাইলেন। পশ্চাতে একপ্রকার শব্দও শুনিতে পাইলেন। আর কি? ঐ এল্যান্ ক্যামেরন! ভয়ে আরো দশগুণ দৌড়িতে লাগিলেন। ররী বেচারা দেখিল বড় বিপদ! ফেলিয়াই বুঝি গেল। কি করে, তারও প্রাণপণ চেষ্টা। মাস্টারমহাশয় দেখিলেন, পাছেরটা আসিয়া ধরিয়াই ফেলিল। তাঁহার যে আর রক্ষা নাই, তখন তিনি সাহসভর করিলেন এর খুব শক্ত করিয়া লাঠি ধরিয়া সেই কল্পিত ভূতের মস্তকে ‘সপাট’-সাংঘাতিক এক ঘা! তারপর সেটাও যেন কোথায় অন্ধকারে অদৃশ্য হইল।’
‘ভূতটা যাওয়াতে এখন একটু সাহস আসিল, কিন্তু তথাপি যতক্ষণ গ্রামের আলোক না দেখা গেল, ততক্ষণ থামিলেননা। গ্রামে প্রবেশ করিবার পূর্বে সাবধানে ঘাম মুছিয়া ঠাণ্ডা হইয়া লইলেন। মনটা যখন নির্ভয় হইল, তখন ঘরে গেলেন-যেন বিশেষ একটা কিছু হয় নাই। অনেক কথা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করা হইল, তিন সকলগুলিরই উত্তরে বলিলেন’-
‘ঐ আমি যা বলেছিলাম, ভূতটুত কিছুই ত দেখতে পেলাম না!’
‘এরপর মুচির জন্য সকলে অপেক্ষা করিতে লাগিল। মাস্টারকে তাহারা বলিল যে, সে স্থানান্তরে গিয়াছে, শীঘ্রই ফিরিয়া আসিবে।’
‘আধ ঘণ্টা হইয়া গেল, তবু মুচি আসে না। সকলে মুখ চাওয়া চাওয়ি করিতে লাগিল। চিন্তা বাড়িতে লাগিল, ক্রমে একটা বাজিল।তারপর আর থাকিতে পারিল না, মুচির অনুপস্থিতির কারণ তাহারা মাস্টারমহাশয়কে বলিয়া ফেলিল। মাস্টারমহাশয় শুনিয়া চিৎকার করিয়া উঠিলেন। লাফাইয়া উঠিয়া লণ্ঠন হাতে করিয়া দৌড়িয়া বাহির হইলেন এবং সকলকে পশ্চাৎ আসিতে বলিয়া দৌড়িয়া চলিলেন।’
সকলেরই বিশ্বাস হইর, মাস্টারমহাময়ের বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পাইয়াছে। হৈ চৈ কাণ্ড! সকলেই জিজ্ঞাসা করে, ব্যাপারটি কি? তাড়াতাড়ি ঘরের বাহির আসিয়া তাহারা মাস্টারকে দাঁড়াইতে বলিতে লাগিল। তাঁহাদের শব্দ শুনিয়া কুকুরগুলি ঘেউ ঘেউ করিয়া উঠিল। কুকুরে গোলমালে গাঁয়ের লোক জাগির। সকলেই জিজ্ঞাসা করে, ব্যাপারখানা কি?’
‘এই সময়ে মাস্টারমহাশয় জলার মধ্য দিয়ে দৌড়িতেছেন। মাথা ঘুরিয়াগিয়াছে- কেবল পুলিস-ম্যাজিস্ট্রট-জুরী-ইত্যাদি ভয়ানক বিষয়মনে হইতেছে। তাঁহার লণ্ঠনের আলো দেখিয়া অন্যেরা তাঁহার পশ্চাৎ আসিতেছে।’
‘সকলে তাঁহার কাছে আসিয়া তাঁহাকে ধরিল এবং ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল। মাস্টারমহাশয়ের উত্তর দিবার পূর্বেই সেই মাঠের মধ্য হইতে গালি এবংকোঁকানি মিশ্রিত একপ্রকার শব্দ শুনা যাইতে লাগিল। কতদূর গিয়া দেখা গেল, একটা লোক জলারধারে বসিয়া আছে। লণ্ঠনের সাহায্যে নির্ধারিত হইল যে এ আর কেহ নহে, আমাদের সেই মুচি। সেইখানে বেচারা দুই হাতে মাথা চাপিয়া বসিয়া আছে আর তাহাদের মাস্টারমারের উদ্দেশে গালাগালি দিতেছে। তাহার নিকট হইতে সকলে সমস্ত শুনিল।’ ‘শেষে অনুসন্ধানে জানা গেল যে ঐ বাড়ির জানালার ঠিক সম্মুখে একটা ছোট গাছ ছিল। তাহারই ছায়া চন্দ্রের আলোকে দেয়ালে পড়িত। আশ্চর্যের বিষয় এই যে সেই ছায়ার আকৃতি দেখিতে ঠিক ক্যামেরনের মুখের মত। সেদিন চন্দ্র ছিল না, মাস্টারমহাশয় সেইছায়া দেখিতে পান নাই।’ || মুখহীন || >>শাপলা<< কেউ আপনারা টোকিওর আসাকাসাতে এলেই দেখতে পাবেন, আসাকাসা রোডের ধারে "কি-নো-কুনি-যাকা' নামে একটা ঢাল আছে। এটার মানে হল 'কি' প্রদেশের ঢাল। আমি জানি না, এটার নাম কেন 'কি' প্রদেশের ঢালহল। সেই ঢালের এক ধারে দেখতে পাবেন একটি পুরোনো মোটেল। অনেক বড় আর প্রশস্ত। মোটেলের চারপাশের খালি জায়গাটুকুর কোথাও কোথাওঘন এবং লম্বা সবুজ ঝোপঝাড়ে ঢাকা। রাস্তার আরেক পাশে সম্রাটদের প্রাসাদের সুউচ্চ দেয়াললম্বা হয়ে রাস্তার সাথে সাথে চলে গেছে।
অনেক অনেক আগে, টোকিওতে যখন রাস্তায় বিজলী বাতি আসেনি অথবা মানুষে টানা রিক্সা গাড়ি চলা শুরু করেনি, তখন আসাকাসার এই ঢালটা ছিল ভীষন ভয়ঙ্কর আর নির্জন। মানুষ পারতঃপক্ষে সূর্য ডোবার পরে এ রাস্তা দিয়ে কখনই যেত না । কখনও কোন পথচারীর সূর্যডোবার পরে বাড়ি ফিরতে হলে "কি-নো-কুনি-যাকা' অনেক লম্বা পাহাড়ি পথ ঘুরে বাড়ি ফিরত, তবুও এ পথ দিয়ে যেত না।
কারণ তখন রাত হলেই"মুজিনারা" পথে নেমে আসত।
সব শেষ যে মানুষটি এক মুজিনাকে দেখেছিলেন, তিনি ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তিনি কাছেই কোবায়েশী কোয়ার্টারএ থাকতেন। বছর তিরিশেক আগেই তিনি মারা যান।
একদিন রাতে তিনি কি ভাবে মুজিনা দেখেছিলেন, তার গল্পই আজ বলবো।
একদিন রাতে সেই ব্যবসায়ী তাড়াহুড়ো করে "কি-নো-কুনি-যাকা'র ঢাল পার হচ্ছিলেন। তখন বেশ রাত হয়ে গেছে। হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন, মোটেলের ধারে, গুটিসুটি মেরে হাঁটুতে মুখ গুঁজে এক মেয়ে ভয়ঙ্কর ভাবে কাঁদছে। তিনি ভয় পেলেন এই ভেবে যে, এই অন্ধকারে, এই নির্জন রাস্তায় মেয়েটা কি ভাবে এল? আর কেনই বা কাঁদছে? ডুবে টুবে মরবে না তো!
তিনি কোন শব্দ না করে, মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে,মেয়েটার পাশে এসে দাঁড়ালেন। "মেয়েটাকে দেখে ভদ্রঘরের মেয়ে বলেই মনে হচ্ছে। পরনে দামী পোশাক। চুল বাঁধার ধরণ দেখে মনে হচ্ছে, কুমারী মেয়ে।" তিনি ভাবলেন।
কিছুটা বিষ্ময় নিয়ে তিনি মেয়েটার আরও কাছে এগিয়ে এলেন, তারপর বললেন, "ও-জোচু" তুমি কাঁদছ কেন? কেঁদ না। তোমার কি হয়েছে আমাকে খুলে বল, দেখি তোমাকে কোনসাহায্য করতে পারি কিনা? তোমাকে সাহায্য করতে পারলে আমার খুব ভালো লাগবে।
ভদ্র লোক প্রকৃতই বেশ দয়ালু ছিলেন। তাই তিনি কথা গুলো মন থেকেই বলছিলেন।
কিন্তু মেয়েটা তার লম্বা হাতায় মুখ ঢেকে কেঁদে যাচ্ছে তো কেঁদেই যাচ্ছে। একবারও মুখ তুলে তাকাচ্ছে না।
ভদ্রলোক আবার বললেন,"ও-জোচু" তুমি কেঁদ না। লক্ষী মেয়ে আমার, কথা শোন প্লীজ! জায়গাটা মোটেও ভালো নয়। আর তোমারমত একটা যুবতী মেয়ের এখানে থাকা একেবারেই নিরাপদ নয়।
আমি তোমাকে অনুরোধ করছি, কি হয়েছে আমাকে খুলে বল?দেখি তোমার জন্য আমি কিছুকরতে পারি কিনা?
ভদ্রলোকের অনুরোধে তাকে পেছনে রেখে, মেয়েটা আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো । তখনও সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। হাত দিয়ে মুখ ঢাকা। ভদ্রলোক চেষ্টা করে যেতেই লাগলেন, তিনি বললেন, "ও-জোচু, আর কেঁদ না প্লীজ। আমর কথা শোন, লক্ষী বোন আমার! বলে, তিনি মেয়েটার কাঁধে আলতো করে হাত রাখলেন। মেয়েটা এবার তার দিকে মুখ করে ঘুরে দাঁড়ালো। তার মুখ থেকে যেন খসে পড়ল, লম্ব হাতাটা। মেয়েটা তার অব্য়বে হাত বুলিয়ে, সেই ব্যবসায়ীর দিকে এগিয়ে এল। আবছা অন্ধকারে তিনি দেখলেন। একটা ভয়ঙ্কর অবয়ব- যেখানে চোখ, নাক,কান, মুখ কিছু নেই।
আর তখুনি চারিদিকটা কেমন অন্ধকার আর শূণ্য হয়ে গেল। তিনি দিগ্বিদিকশূণ্য হয়ে ভয়ে দৌঁড়াতে শুরু করলেন। একবারও পেছন ফিরে তাকালেন না। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে কতক্ষণ মনে নেই,তিনি দূরে একট বাতির আলো দেখতে পেলেন। দূর থেকে টিমটিমে আলোটুকুকে জ্বোনকির আলোর মত লাগছিল।
তিনি ভাবছিলেন, এ আলো নিশ্চই "সোবা" দোকানীর কাছে থেকে আসছে কারণ যেখানে তিনি আলোটা দেখলেন, সেখানে রাস্তার ধারে তার এক চেনা দোকনী"সোবা" বিক্রী করেন। যেই থাক না কেন? তিনি ঐ আলো লক্ষ্য করে দৌঁড়াতে শুরু করলেন।
তারপর হুড়মুড় করে এসে তিনি সোবার দোকানে ঢুকে ধপাস করে বসে, শব্দ করে কেঁদে উঠলেন।
এখানে, এখানে, সোবার দোকনী রুক্ষ স্বরে লোকটিকে কাছে ডাকল। "কেউ মেরেছে নাকি আপনাকে? ব্যাথা পেয়েছেন?
না না, ব্যাথা পাইনি- শুধু---------
শুধু কি? ভয় দেখিয়েছে? লোকটার গলা খসখসে, কোন সহানুভূতি নেই। ডাকাত নাকি?
না না! ডাকাত নয়। ভীত সন্ত্রস্ত লোকটা একটা ঢোক গিলে, কাঁপতে কাঁপতে বললেন, আমি ----আমি এক মেয়েকে দেখলাম মোটেলের পাশে------ তার মুখটা দেখে------ওহ! আমি বলতে পারবো না, কি দেখলাম।
সোব দোকানী চেঁচিয়ে বলল,সে কি তোমাকে খুব ভ্য় দেখিয়েছে? ঠিক এরকম একটা মুখ দেখিয়েছে? ঠিক আমার মত---- মুখের ওপরেরটা ডিমের মত সমান?
লোকটা সোবার দোকানীর দিকে তাকিয়ে দেখলেন, একটা অবয়ব তাতে কোন নাক,মুখ আর চোখ নেই। ঠিক তখুনি আলোটা নিবে চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল। ||বাচ্চা ভূতের কান্ড|| সংগ্রহেঃ উমর খাঁন মানুষের ছোট ছেলেপুলেদেরআমরা বাচ্চা বলে থাকি। ভূতদের মধ্যেও বাচ্চা ভূতেরা রয়েছ,তারা সুযোগ সুবিধা পেলে নানা কান্ডকারখানা করে। আর ভূত তো-ইচ্ছা করলে কখন-সখন তুলকালাম কান্ডওকরতে পারে। ঘোষবাবুর ছেলে গবু দু’বার ক্লাশ ফাইভে ফেল করল। অংকতে শূ্ন্য, ইংরেজীতে সাত, এমনি তার পরীক্ষার নম্বর- অথচ রেজাল্ট বেরুবার দিন এবার গবু দিব্যি সেজেগুজেই ইসকুলেহাজির হয়েছিল। ইসকুলে যাওয়ার পথে গম্ভীরা সাধুবাবার পায়ের কাছে টাকাও রেখেছিল। গম্ভীরাবাবা তান্ত্রিক সাধু, গবুর ভক্তি লক্ষ্য করে তিনি অত্যন্ত প্রীত হয়ে গবুর কপালে সিঁদুরের টিপ পরিয়ে আশীর্বাদও করলেন। গম্ভীরাবাবা কথা বলেন না, সর্বদা গম্ভীর হয়ে থাকেন। তাঁরচেলা ফটকরামই গম্ভীরাবাবার পায়ের কাছে টাকা পয়সা পড়লে টক করে তুলে ট্যাকে গোঁজে।ফল-ফলাদি পড়লে তুলে নিয়ে আশ্রমের ভাঁড়ার ঘরে রেখে আসে। এটাই নিয়ম এবং এই নিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চালু আছে। গবু তাই ফটকরামকে জিঞ্জাসা করল, সাধুবাবা তো আর্শীর্বাদ করলেন, এবার পাশ করবো চেলাজী?
- জরুর- বাবা যখন তোমার মাথায় টিপ টিপ পরিয়ে দিয়েছে তখন তোমায় আটকায় কে ? ফাস্ট সেকেন্ডও হয়ে যেতে পারো।
- বলেন কি চেলাজী ?
- ঠিকই বলছি, বাবার আর্শীর্বাদ পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়, বাচ্চা !
অতএব গবু বেশ আন্দের সাথেই ইস্কুলে গেল। গবুর বন্ধু তোন বলল, গবু, এবার পাশ করতে পারবি তো ? গবু হেসে বলল, শুধু পাশ নয়রে, এবার সকল কে চমকে দিয়ে একথেকে দশের মধ্যেও চলে আসতে পারি।
- বলিস কী রে ?
- ঠিকই বলছি।
তোতন বলল, আমি বোধ হয় ফেল করে যাবোরে, আর ফেল করলেই বড়দা আমায় মেরে তক্তা বানিয়ে দেবে। গবু বলল, ভাগ্যিস আমি গম্ভীরাবাবার আশীর্বাদ নিয়ে এসেছি- নইলে এবারও ফেল করলে- আমায় বড়দা, মেজদা তো বেদম মারতোই, বাবা পর্যন্ত ধাক্কা দিয়ে বের করে দিত।
- তুই আগে বললি নে কেন ? আমিও গম্ভীরাবাবার আশীর্বাদ নিয়ে আসতাম।
- তোকে একথাটা বলার কথা মনে আসেনি। নইলে ঠিকই বলতাম।কিছু মনে করিসনে ভাই।
কিন্ত প্রথম লিস্ট বেরুতেই গবুর নাম খুজেঁ পাওয়াগেল না। দ্বিতীয় লিস্টেও গবুর নাম নেই, কিন্ত তোতনের নাম শেষের দিকে রয়েছে।
তোন হাসতে হাসতে বলেল, তোর নাম যে কোন লিস্টেই নেইরে গবু।
গবু গোঁ গোঁ করতে করতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।
তোতন আর ঘোতন জল-টল ঢেলে কোন রকমে গবুর জ্ঞানফিরিয়ে আনল।কিন্তু মূর্ছা ভঙ্গ হলেও গবু রেহাই পেলনা, পিয়ন এসে বলল,- এইযে গবুবাবা, আপনাকে আকবার এখুনি হেডস্যার দেখা করতে বলেছেন।
অতএব গবু প্রায় কাঁপতে কাঁপতে হেডস্যারের ঘরে হাজির হলো। হেডস্যার হাতে গবুর প্রোগ্রেস রিপোর্ট খানা ধরা ছিল, তিনি বলেলন, গবু, তুমি কোন্ বিষয়ে কতো পেয়েছ- তোমার জানা দরকার। আমি একএক করে তোমার বিভিন্ন বিষয়ের প্রাপ্তনম্বর গুলো বলে যাচ্ছি।
গবু মাধা নিচুকরে রইল।
হেডস্যার বলতে লাগলেন, অংকতে শূন্য, ইংরেজীতে সাত, ভূগোলে আঠ, ইতিহাসে নয় এবং বাংলায় তেরো।--- এই প্রগ্রেস রিপোর্ট বাড়ী গিয়ে তোমার বাবাকে দেখাবে- আর বলবে আগামী বছরো ফেল করলে- তোমার মতোএমন রত্নকে আর আমাদের ইসকুলে রাখা হবে না। এই প্রোগ্রেস রিপোর্টটা সঙ্গে নাও, অবশ্য একে প্রোগ্রেস রিপোর্ট না বলে ডিগ্রেডেশান রিপোর্টবলাই ভালো।
গবু হাত পেতে প্রোগ্রেস রিপোর্টটা সঙ্গে নিল, তারপরই কোন কথা না বলে হেডস্যারের রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে এল।
ইসকুল থেকে বাইরে বেরিয়েই পাকা পীচঢালা পথ দিয়ে সে চলতে লাগল, অবশ্যবাড়ীর দিকে নয়- উল্টো দিকের পথে, অর্থ্যৎ অজানাপথে।
বাড়ী ফেরার কথা গবু ভাবতেও পারল না, কারণ বাড়ী ফিরলেই বড়দা আর মেজদা প্রোগ্রেস রিপোর্টচাইব্, বকবে, তারপর ঝড়ের বেগে বকবে, তারপর ঝড়ের বেগে কিল চড় লাথি মারবে দমাদম। তারপর যে কি হবে, সে-কথা ভেবেই সে শিউরে উঠতে লাগল।
অতএব বাড়ী যাওয়ার কথা সে ভাবতেই পারল না, উল্টো পথধরল।
বেশ কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর পথে চুন্নু মিঞার সঙ্গে দেখা। চুন্নু মিঞার গবুদের বাড়ির বারই পরিচিত, কারণ মাঝে মাঝেই হাসের ডিম, মুরগীর ডিম ইত্যাদি নিয়ে গবুদের বাড়ী যায়।
গবুকে দেখতে য়ে চুন্নু মিঞা জিজ্ঞাস করল, একি গবুবাবু ইদিকে কোথায় চললেন?
গবুর মন মেজাজ এমনিতেই খারাপ ছিল, চুন্নু মিঞার মতন কোনো চেনা লোকের সঙ্গে যে তার দেখ হবে, তা সে ভাবতেই পারেনি। সে বিরক্ত হয়ে বলল, জাহান্নামে যাচ্ছি।
-জাহান্নামে ? হাজান্নামে বলে কোন গাঁ তো ইদিকে নেই, আপনি ভূল পথে আসছেন, আর যিদিকেই যাননা কেন বাবু জাহানপুর বিলের কাছে কখোনও ভরদুপুরে আর সন্ধ্যেবেলায বেড়াতে যাবেন না।
- কেন ?
- জাহানপুর বিলের কাছের গাছগুলিতে বলতে গেলে ছোট-বড়ো নানান ভূতদের আড্ডাখানা। ভূতেরা একবারে গিজগিজ করে শিখানটাতে!
- সেই জাহানপুর বিলটা কোথায় ?
- সোজা এগিয়ে তারপর পাকারাস্তা থেকে ডান দিকে মেঠো পথ ধরে ক্রোশ খানেক পথ গেলেই জাহানপুর বিল। ভুলেও ওদিকে যাবেন না গবুবাবু, জেলেরা পযর্ন্ত মাছ ধরেতে ওদিকে যায়না- যেতে ভয় পায়।
- কেন?
- যে জেলে জাহানপুর বিলেতে একরার মাছ ধরতে গেছে সে আর ফিরে আসেনি। আমরা দিনের বেলাতেও ওদিকে যাইনা।
- ঠিক আছে। আমি এদিকে সোজাসুজি একবালপুর যাব, ওখান থেকে বাসে চড়ে মামাবাড়ি ঘসেটি যাব।
- তা এই অসময়ে মামাবাড়ি যাবেন কেনে? ইবারেও বুঝি পরীক্ষাতে ফেল করেছেন ?
গবু গম্ভীর হয়ে বলল, তা নয়, একটা বিশেষ দরকারে মামার বাড়ি যাচ্ছি।
গবু কিন্ত একবালপুবে গেলনা, আর মামার বাড়িতেও যাবে না, করণ গতবার সে ফেল করার পর মামাবাড়িতে গিয়েছিল, মেজদা পরের মাসেই মামাবাড়ি গিয়ে তাকে কান ধরে টানতে টানতেবাড়ি ফিরিয়ে এনেছিল। চুড়ান্ত অপমানিত হয়েছিল গবু। সেই থেকে মামা-মামীর কাছে মুখ দেখানোর কোনো উপায় গবুর নেই। বরং মামাতো ভাই গবুকে এসময়ে মামা বাড়িতে দেখলে হাসাহাসি করবে। বলবে, ওরেগবু আবার বুঝি ফেল করেছিস?
অতএব আমার বাড়ি যাওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা, মামাবাড়ী বড়দা বা মেজদার নাগালের বাইরে নয় মোটেই।
মনে মনে গবু ঠিক করে ফেলল, সে জাহানপুরের বিলেই যাবে, ভূতদের মুখোমুখি হবে, ভূতেরা যদিতার ঘাড় মটকে দেয় - তবে আরকোন ভাবনাই ধাকে না। বড়দা, মেজদা মারার সুযোগ পাবে না, বকতেও পারবে না, - এমনকি উগ্র মেজাজী বাবার খপ্পরেও পড়তে হবে না তাকে আর।
অতএব সে কিছুটা এগিয়ে জাহানপুরের বিলের পথই ধরল।পথে একটাও জনমণিষ্যিনেই- গাছগুলোর দিকে তাকালেই গা ছমছম করে ওঠে।
একটু এগুতেই কারা যেন খিলখিল করে হেসে উঠল।
গবু চিৎকার করে উঠল, কে হাসে ? কে হাসে ? জবাব দাও।
কিন্তু করো কাছ থেকে কোন সাড়া-শব্দ পাওয়া গেল না, অর্থ্যাৎ কেউ জবাব দিলনা। আরও কিছুটা এগিয়ে যেতেই একটা পেঁচা বিশ্রীভাবে ডেকে উঠল।
গবু আর কোথায় যাবে? আ বেশি দূর এগুবার বোধহয় প্রয়োজনও ছিলনা- কারণ সামনেই জাহানপুরের বিল- বিলের জল টল্ টল্ করছে।দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে মাঝে মাঝে দু’একটাবড় মাছ মাথা তুলে যাই মারছে।
গবু আর একটু এগিয়ে বিলের প্রায় কাছাকাছি একটা চালতা গাছতলায় বসল। ওখানথেকে সে দেখতে পেল দু’একটা বেশ বড় মাছ মাথা তুলে তাকিয়ে, আবার ভুস করে বিলের জলে ডুব মারছে।আবার মখি তলে তাকাচ্ছে।, আবার ডুব মারছে।
গবু ভাবল মাছগুলো হয়তোবা সাধারণ মাছ নয়, ওগুলো নিশ্চই মেছো ভূত। মানুষ যেমন অপঘাতে মরে গিলে ভূতহয়, তেমনি হয়তোবা মাছেরা অপঘাতে মরে গিয়ে মেছো ভূতহয়ে থাকে। মানুষ অপঘাতে মরলে যে সচরাচর ভূত হয়, একথা গবু দিদার কাছে শুনেছে। অপঘাতে মরা মানে আত্মহত্যা করে মরা বা দুর্ঘটনায় মরা। ঐ ভাবে অপঘাতে মরার পর যদি তার বংশের কেউ গয়ায় পিন্ডি নাদেয়- তবে তারা নকি ভূত হয়ে ঘুরে বেড়ায়।
আর মাছেরা তো সবসময়ই অপঘাতে মারা যাচ্ছে।, তাদের হয়ে কেউতো আর গয়ায় পিন্ডি দিতে যায় না। তাইতো মেছো ভূতেরা এসে জাহানপুরের বিলে জমা হয়েছে।
মাছদের গোত্তরই হয় না, আরগোত্তর না জানা থাকলে গয়ায় গিয়ে পিন্ডি দিয়ে কোন লাভ হয়না। অবশ্য মাছদের গোত্তর থাকতে পারে তা মানুষের পক্ষে অজানা, মাছদের গোত্তর মাছেরাই কেবল জানে, কিন্তু মাছদের বংশের করো পক্ষেই তো আর গয়ায় যাওয়া সম্ভব নয় রেলে চেপে। তাই ওদের মেছো ভূত হয়েই জাহানপুরের বিলে চিরটা কাল থাকেত হবে। সত্যি ভূতের গল্প ,আসলেই। ঘটনাটা আমার এক বড় ভাইয়ের মুখ থেকে শুনা। সত্যি বলতেছি এজন্যে যে,কারণ আমি বিশ্বাস করি,উনি একজন শক্ত মনের মানুষ।
এবং উনি যা দেখেছেন ,তা ঠিক দেখেছেন। ঘটনাটা এরকম, উনার এস,এস,সি পরীক্ষা শেষ হয়েছে । পরীক্ষার পর ছুটিতে উনি উনার মামাবাড়ি খুলনায় যাবেন।উনি সিলেট থেকে রওয়ানা দিয়ে রাত সাড়েনটায় খুলনা পৌচ্ছান। শহর উনার মামাবাড়ি যাওয়ার রাস্তায় যাওয়ার পথে প্রায় ১০ মিনিটের মত টিলার মাঝখান দিয়ে যেতে হ্য়।
রাতে তিনি কোন রিকশা না পেয়ে একাই হেটে রওয়ানা হন,একটু জায়গা যাওয়ার পর উনি উনার একটু সামনে একজন বৃদ্ধ লোককে দেখতে পান।
সামনে একজন লোক দেখায় উনি ভাবেন যে উনার সাথে কথা বলে বলে উনার মামাবাড়ি পরযন্ত চলে যাবেন। তাই উনি উনার হাটার গতি বাড়িয়ে দিয়েলোকটিকে ধরতে চান।কিন্তু লোকটিও ওর হাটার গতি বাড়িয়ে দেয়,এবং একটু পর রাস্তার একটি মোড় পার হয়ে যায়।
তখন তিনি ঐ মোড়ের কাছে এসে দেখেন যে, সামনে ঐ লোকটি নেই,এবং সামনে অনেকটা সরু রাস্তা যা একজন বৃদ্ধ লোকের পক্ষে এত তাড়াতাড়ি পেরোনো সম্ভব নয়। তাই উনি এদিক ওদিক তাকিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখেন লোকটি উনারঠিক পেছনে এবং উনার দিকে তাকিয়ে হাসতেছে। লোকটি কিছুটা ভাসমান অবস্হায় ছিল, আর চোখটা খুবই ভীতিকরছিল। উনার পিছনে লোকটিকে এভাবে দেখে উনি অজ্ঞান হয়ে ঐখানেই পড়ে যান।
কিছুক্ষন পর একদল লোক এ রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথেউনাকে এভাব পেয়ে উনার মামার বাড়ি পৌচ্ছে দেয়।
ঘটনাটা এমনিতেই আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম।
(বি:দ্র: আমি খুলনা শহর সম্পকে তেমন কোন তথ্য জানিনা) আমার ভূত দেখা (যারা ভূতে বিশ্বাস করেন না তাদের জন্য)…
পৃথিবীতে অনেক কিছুই আছে যা আমরা নিজ চোখে না দেখলেবিশ্বাস করি না। সবার মত আমি নিজেও এক সময় ভূতের অস্তিত্ব বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু কিছুদিন আগে আমার জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটলে যে, আমাকে ভূতের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেই হল।
ঘটনাটা বলার আগে একটা তথ্য দেই, এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে আমেরিকার ৬৫% মানুষ ভূতে বিশ্বাস করে এবং ভূত দেখার সৌভাগ্য হয়ছে।
এবার আসা যাক আসল কথায়…….
আমি তখন ভার্সিটির দ্বিতীয় সেমিষ্টার পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি যাই। স্বাভাবিক ভাবেই আমিগুম থেক একটু আগেই উঠি। আমার মেঝ চাচা তিনি ব্যাবসা করেন, সেদিন একটু রাত করেই বাড়ি ফিরেছিলেন। তাই তার গুম থেক উঠতে দেরি হচ্ছিল। সকাল তখন ৬টা বাজে। আমি গুম থেকে উঠে ব্রাশ নিয়ে বাহিরে যাই। কিন্তু পুকুরঘাঁটে আসতেই আমি চমকে উঠি। কোথায়ও কোন মানুষ নেই। শুধু পুকুর ঘাঁটে যাপসা…যাপসা একজন মানুষ দেখলাম। আমি ভয় পেয়ে যাই, মানুষটিকে আমার মেঝে চাচার মত মনে হচ্ছিল। কিন্তু মেঝ চাচাকেতো বিছানায় দেখে এলাম।…
কাছা কাছি যেতেই দেখি ঠিকইতো….? মেঝ চাচাইতো…!!!!
আমি জানতে চাইলাম “কাকা আপনাকেতো গুমোতে দেখে এলাম”। তিনি আমার দিকে একটু তাকালেন। কোন কথা না বলে ব্রাশ করতে লাগলেন। আমি ভাবলাম হয়তো আমি বিছানায় ভুল দেখেছি। মেঝচাচা হয়তো আমার আগেই গুম থেকে ওঠে গেছেন। তা ছাড়া অনেক রাতে গুমিয়ছেন তাও আবার তারা তারি উঠলেন তই হয়তো ভালো লাগতেছিলনা তার সে জন্য আমার সাথে কথাবলেননি।
আমি ঘরে পিরে এসে ঠিক মেঝ চাচার বিছানায় যাই। কিন্তু একি…. মেঝ চাচা এখোনো গুমেই অচেতন…..
আমি তাকে অনেক ড়াকা ড়াকি করে গুম থকে তুললাম। তিনি আমাকে একটা ধমকি দিলেন এত তার তারি তাকে কেন গুম থকে জাগালাম। পরে আমি তাকে পুরো ঘটনা খুলে বললাম। তিনি নিজেই অবাক হয় যান।
বি:দ্র: কারো যদি জীবনে এরকম কোন ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে বলতে পারেন। ///ফোঁড়া /////// রহস্য- রোমাঞ্চ- ভৌতিক গল্প অনেক ক্ষন ধরে সামনে বসা মানুষ টার দিকে তাকিয়ে আছেন ডঃ তাহসিনা। মাথাটা নিচু করে বসেই আছে সেই লোক। অনেকক্ষণ ধরে বসে থেকে থেকে শেষে বলতে শুরু করল-
“আমার যে সমস্যা সেটা হল আমার পেটে একটা ফোঁড়া ঊঠেছে।”
বলেই শুন্য দৃষ্টিতে ডঃ তাহসিনার দিকে তাকিয়ে থাকল। ডঃ তাহসিনা অনেক ভাল একজন সাইকায়াট্রিষ্ট। উনি এর আগে ও অনেক মেন্টাল রুগীকে ভাল করেছেন। কিন্তু আজকের এই রুগি এসে বসেছে তো বসেছে কথা বলার কোন নাম গন্ধ নাই। অনেক ক্ষন মাথা নিচু করে চুপ করে থেকে শেষে বলতে শুরু করল।
” আমার সমস্যার শুরু যখন আমি আমার স্ত্রি মাহমুদা কে খুন করি। আমার স্ত্রি কে নিয়ে আমি খুব সুখে ছিলাম। কিন্তু আমার একটা এক্সিডেন্টের কারনে ডাক্তার আমাকে বলেন যে আমি আর কোন দিন বাবা হতে পারবোনা। এর পর মাহমুদা আমাকে প্রথম প্রথম মেনে নিয়েছিল। আমাদের বিয়ে হবার পর ঠিক করেছিলাম ৩ বছর পর বাচ্চা নেব। এর মাঝেই ঘটে যায় সেই এক্সিডেন্ট। এরপর মাস ছয়েক ঠিক ছিল। কিন্তু একদিন আমি জানতে পারি মাহমুদার সাথে আমার এক আত্মীয়র অবৈধ সম্পর্ক হয়েছে। এটা শোনার পর আমার মাথা ঠিক ছিলনা। আমি দুইবার আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি। এর মাঝেই আমাকে মাহমুদা ওর অবৈধ সম্পর্কের কথা জানায়। আমিবিমূঢ় ছিলাম বেশ কিছু দিন। কিন্তু এর মাঝেই জানতে পারি মাহমুদা কনসিভকরেছে। এটা শুনে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি।ওর পেটে বাচ্চা যখন ৮ মাস – তখন আমি একদিন মাহমুদা কে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলি। মেরে ফেলি পেটের বাচ্চা টাকে ও। আমি একজন পুলিশ অফিসার ছিলাম সেই সময়। এখন আমি রিটায়ার্ড। সেই সময় আমার ক্ষমতা বলে মাহমুদা কে আমি আমার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়েকোন রকমে দাফন করে আসি। এরপর আমি অনেক দিন দেশের বাইরে ছিলাম।” বলেই একবারদম নিল লোকটা। তারপর টেবিল থেকে পানির জগটা নিয়ে অদ্ভুত ভাবে পানি গ্লাসে না ঢেলে জগ থেকেই ঢকঢক করে খেয়ে ফেলল অর্ধেক পানি।
তারপর আরেকটা দম নিয়ে আবার বলা শুরু করল সে -
” এর পরের বছর আমি দেশে ফিরে আসি। চাকরি থেকে ছুটি নিয়েছিলাম। সেখানে আবার জয়েন করি। কিন্তু দুই মাস আগে আমি ঈদের ছুটিতে গ্রামে যাই। সেখানে ঈদের দিন রাতে আমি একাকী বসে ছিলাম আমার বাড়ির পেছনের বারান্দায়। তখন দেখি মাহমুদার কবর থেকে একটা বাচ্চা ছেলে বাবা বাবা করে ডেকে আমার দিকে দৌড়ে এসে আমার মাঝে ঢুকে গেছে।
সেদিন রাতে আমি খানিকটা নেশা করেছিলাম। তাই সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে সব আজগুবি মনে করে ভুলে যাই। কিন্তু পরদিন আমার পেটে নাভীর গোড়ায় একটা ফোঁড়া ঊঠে। প্রথমে এটা ফোঁড়ার মতই ছিল কিন্তু আস্তে আস্তে এটা বড় হতে থাকে। আমি এই কয়দিন প্রায় সময় স্বপ্নে দেখছি একটা বাচ্চা ছেলে আমাকে বাবা বাবা করে ডাকছে আর বলছে আমার পেট থেকে নাকি তার জন্ম হবে। এই যে দেখেন আমার পেটের মাঝে এটা কি”- বলে শার্টের ভাজ খুলে দেখায় ডঃ তাহসিনাকে।
তাহসিনা কিছুক্ষন দেখেন ফোঁড়া টা। বেশ বড় আকারের একটা ফোঁড়া। লালচে ভাব ধরেছে। তারপর হেসে লোকটাকে বললেন-
“দেখুন মি.”- বলে নামটা জানার জন্য তাকালেন উতসুকদৃষ্টিতে লোকটার দিকে।
উনি বললেন “ রাকিব- মোঃ রাকিব”।
“হুম – দেখুন রাকিব সাহেব- আপনার হ্যালুসিনেশন হয়েছিল- সেইদিন রাতে। আপনি আপনার স্ত্রীকে অনেক ভালবাসতেন। সেই ভালবাসা আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে।তাই আপনি উনাকে এবং উনার সন্তান কে মেরে ফেলে অনেক কষ্ট পাচ্ছিলেন। সেইদিন আপনার পিতৃসত্ত্বা আপনার মাঝে আপনার মৃত সন্তান কে ঢুকে যেতে দেখিয়েছে। এটা নিছক ই কল্পনা। আর বেশি কিছু না”। বলে মিষ্টি করে হেসে রাকিব সাহেবের দিকে তাকালেন।
“ কিন্তু আমার পেটের এই ফোঁড়া কিভাবে আসল?” এবার ক্ষেপে গেলেন রাকিব সাহেব।
“এটা কো- ইন্সিডেন্স মাত্র। এটার সাথে আপনার স্বপ্ন কিনবা হ্যালুসিনেশন কে মেলালে তো চলবেনা”-বললেন ডঃ তাহসিনা।
“ দেখেন আমি মেলাচ্ছিনা। কিন্তু ইদানিন আমার পেটেরভেতর কিছু একটা লাথি মারে। কিছু একটা হচ্ছে আমার পেটের ভেতর”- বলেই প্রায় কেঁদে ফেলে রাকিব সাহেব।
“ দেখুন আপনাকে আমি কিছু ঔষধ লিখে দিচ্ছি।এগুলো খান। আশা করি আপনার ভাল ঘুম হবে। এবং আপনার এই বিশাল ফোঁড়া ও কমে যাবে” বলেই খস খস করে কিছু ঔষধ লিখে প্যাড থেকে কাগজ ছিড়ে দেন রাকিব সাহেব কে।
তারপর বললেন-“ আপনার যে কোন সমস্যা হলে আমি নিজে গিয়ে আপনাকে দেখে আসব। আপনার এখানে আসার আর দরকার নেই। এইখানে আমার ফোন নাম্বার দেয়া আছে। সেখান থেকে আমাকে ফোনে জানাবেন কি হয়েছে”- বলেই ঊঠে পড়লেন ডঃ তাহসিনা।
“আমার একটা সেমিনার আছে- আমাকে এখন সেখানে যেতে হবে” বলে বের হয়ে গেলেন ডঃতাহসিনা।
…………..
তিন মাস পর রাত ১টায় ফোনেরশব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল ডঃ তাহসিনার। উনি ফোনটা ধরেইআরেক পাশ থেকে শুনতে পেলেন- রাকিব সাহেবের কন্ঠ-
“ আপা একটু আসবেন আমার বাসায়? প্লিজ আপা আসেন।প্লিজ আসেন। আমার পেটে প্রচন্ড ব্যাথা করছে” বলেই বাসার ঠিকানা দিলেন ডঃ তাহসিনাকে।
সারাদিন মেডিক্যাল এ সেমিনারে ছিলেন তিনি। তাইবাসায় এসে মাত্র শুয়েছেন।কিন্তু এই রকম কল এলে প্রায় সময় তিনি ঘুম রেখেই দৌড় মারেন রূগীর বাসায়। নিজের জীবনের চেয়ে রোগীকেঅনেক গুরুত্ব দেন তিনি। আর এই রাকিব সাহেবের ব্যাপারটা নিয়ে তিনি অনেকপড়াশুনা করেছেন ইদানিন। তাই তিনি এত রাতে ফোন পেয়েকোন রকমে পোশাক পাল্টে গাড়ি নিয়ে বের হলেন।
রাকিব সাহেবের বাসায় বাসাগুলশানে। সেখানে পৌছে একটা সাদা রঙ এর বাড়ির সামনে গিয়ে গাড়ি থামিয়ে নিজেই ঢুকে পড়লেন ভেতরে। বাড়িতে গিয়ে বেল টেপার পর খুলে দিল একজন বৃদ্ধা মহিলা। তিনি রাকিব সাহেব কোথায় জিজ্ঞাসা করতেই মহিলা তাহসিনাকে নিয়ে গেলেন একটা ঘরে। সেখানে শুয়ে আছেন রাকিব সাহেব। কিন্তু রাকিব সাহেব কে দেখেই ভয় পেয়ে যান তিনি।রাকিব সাহেবের পেটটা অস্বাভাবিক ভাবে ফোলা। ঠিক যেন সন্তান সম্ভবা মায়ের মত। আর ঠিক সেই সময় রাকিব সাহেব চিৎকার করে ঊঠে অজ্ঞান হয়ে যান। এবং সেই সময় তাহসিনার চোখের সামনে ঘটলএক বিষ্ম্য় কর ব্যাপার। রাকিব সাহেবের নাভির উপরের ফোঁড়া থেকে একটা লালচে পিণ্ড বের হতে লাগল। আস্তে আস্তে পিন্ড টার কিছু অংশ বের হয়ে চোখ আর মুখে অস্তিত্ব জানান দিল। এর পর তাহসিনা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না।তাড়াতাড়ি করে দরজা খুলে দেয়া মহিলা কে গামছা আর কুসুম গরম পানি আনতে বলে নিজে কোন রকম টান দিয়ে বেরকরেন বাচ্চা টাকে। অদ্ভুতসুন্দর সেই সন্তান টাকে কোলে নিয়ে হতভম্ভ হয়ে যান তিনি। বাচ্চা টা যেন ঘুমাচ্ছে।
এর মাঝে তোয়ালে নিয়ে সেই মহিলা আসলে তিনি তোয়ালে দিয়ে কোন রকম বাচ্চা টাকে মুছিয়ে দেন। তারপর খেয়াল করেন বাচ্চা টা কাঁদছে না। তিনি অনেক চেষ্টা করছেন। কিন্তু কোনভাবেই বাচ্চাটাকে কাঁদাতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত দেখলেন বাচ্চাটা মারা গেছে।
বাচ্চাটা মারা যাবার পর তিনি রাকিব সাহেবের দিকে খেয়াল দিলেন। এতক্ষন তিনিযেন ঘোরের মাঝে ছিলেন। মেডিক্যাল সায়েন্স কে বোকা বানিয়ে এই মাত্র এই লোকটা একটা বাচ্চা জন্ম দিল। কিন্তু বাচ্চাটাকে তিনি বাঁচাতে পারলেন না। আগে জানলে তিনি ঠিক ই রাকিব সাহেবের ব্যাবস্থা করতেন। তিনি তাড়াতাড়ি রাকিব সাহেব এর নার্ভ দেখলেন। কিন্তু হতাশ হলেন। তিনি ভেবেছিলেন রাকিব সাহেব অজ্ঞান হয়েছেন। আসলে তিনি মারা গেছেন সেই চিৎকার দিয়েই। এবার কিছু টা মুষড়ে পড়লেন তাহসিনা। তিনি লোকটাকে বিশ্বাস করলে দুইজন কেই হয়ত বাচানো যেত।
এরপর তাহসিনা সেই বাচ্চাটাকে গোপনে সরিয়ে ফেলার ব্যাবস্থা করেন। সেই বৃদ্ধা মহিলা কে দিয়েই বাচ্চাটাকে সেই বাড়ির এক কোনায় কবর দেবার ব্যাবস্থা করেন। আর রাকিবসাহেব কে কবর দেয়া হয় তার গ্রামের বাড়িতে। এই সব ব্যাপার ভাল মত সারতে সারতে উনার কয়েকদিন লেগে যায়।
এর তিন দিন পর রাতে ক্লান্ত ডঃ তাহসিনা মাত্রহাসপাতাল থেকে এসে বাসায় খেয়ে দেয়ে শুয়েছেন।এমন সময় উনার ঘরের বারান্দায় একটা আলতো টোকা দেয় কেউ একজন। তখন ও ঘুমান নি তাহসিনা। আস্তে করে ডিম লাইট জ্বালিয়ে ঊঠে বারান্দার দরজা খুলেই দেখেন একটা বাচ্চা ছেলে দাড়িয়ে আছে দরজার ওপাশে।মুখে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে আন্টি আন্টি বলে ঝাপিয়ে পরে তাহসিনার শরীরের সাথে মিশে যায়। ব্যাপারটা এতই তাড়াতাড়ি হয়েছে যে তাহসিনা বেশ কিছুক্ষন নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর অজ্ঞান হয়ে পড়লেন তিনি সেখানেই।
পরদিন জ্ঞান ফিরে নিজেকে মাটিতে দেখে প্রথমে ভয় পেয়ে যান তিনি।তারপর রাতের ঘটনা কে নিছক স্বপ্ন ভেবে হেসে ঊড়িয়ে দিলেন তিনি। তারপর ফ্রেশ হবার জন্য বাথরুমে গেলেন।হাত মুখ ধুয়ে বের হতে যাবেন তখন পেটে চিনচিনে একটা ব্যাথা টের পেলেন। তাড়াতাড়ি নাইট গাঊনটা সরিয়ে পেটে হাত বুলালেন তিনি। এবং দিনের আলোতেই পরিষ্কার টের পেলেন তিনি – উনার পেটের যেখানে নাভি- ঠিক তার উপরেই একটা ফোঁড়া ঊঠেছে। লালচে ফোঁড়াটা দেখতে ঠিক রাকিব সাহেবের সেই ফোঁড়াটার মত।সাদৃশ্য টা টের পেতেই আবার জ্ঞান হারালেন সাইকিয়াট্রিষ্ট ডঃ তাহসিনা……
||জোকার ভূত|| …একটা এক-পা ওয়ালা ভূত গাছের উপর ঘুমাচ্ছিলো। হঠাৎ ধপাস শব্দে তার ঘুম ভেঙ্গে চুরমার। শব্দটা কিসের?
ভেবে কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছে না। হঠাৎ আবিস্কারকরলো, সে গাছের নিচে। কী ব্যাপার সে তো গাছের ওপরেই শুয়েছিলো।
এতোক্ষণে ঘটনাটা বুঝতে পেরেছে।
সে গাছের ডালে চিৎ হয়ে ঘুমাচ্ছিলো। ডালটা ছিলো চিকন। ঘুমের ঘোরে যেমনি একটু কাত হলো, অমনি ধপাস করে সোজা নিচে। আর এই ধপাস শব্দেই তার ঘুম”
” গেলো ভেঙ্গে।
যাই হোক। সে এখন দেখছে কোথাও ব্যাথা পেয়েছে কিনা। কিছুক্ষণ হাত-পা-মাথা নেড়েচেড়ে বুঝলো। নাহ্ ব্যাথা পায় নি। আর যা-ও পেয়েছে, তাও একটু।
এবার সে উঠে দাঁড়ালো। একপায়ে লাফাতে লাফাতে এগুতো লাগলো। কিছুদূর যেতেই দেখে এক বাঘ গাছের নিচে বসে আছে। বাঘটা কিন্তু সত্যি বাঘ না। ভূতবাঘ। বাঘটা তাকে দেখেই এমনভাবে হাসলো যেন সে তারকতদিনের চেনা।
ভূতটা বলেই ফেলল, “তুমি আমাকে চেনো নাকি?”
“হ্যাঁ। এই যে কিছুক্ষন আগে থেকে। এই যখন তুমি ধুপ করে গাছ থেকে পড়লে। তা তুমি হাঁদার মতো কাত হতে গেলে কেনো?”
ভূতটার তো লজ্জায় মাথাকাটা যাবার মত অবস্থা।
তারপর বাঘ আবার বললো, ‘ আচ্ছা…বাদ দাও। চলো আমরাবন্ধু হই। আমরা দুজন বন্ধু হলে ভালোই হবে। তোমার হবে একটা বাঘ বন্ধু। আর আমারও হবে একপা-ওয়ালা সুন্দর একটা বন্ধু।”
ভূতটা ভাবলো, তাইতো একটা বাঘ বন্ধু থাকলে ক্ষতি কি? সেও রাজী হয়ে গেলো।
তারপর দু বন্ধুতে গাছের নিচে বসে কত রকম কথা। সুখের কথা, দুখের কথা, বন্ধুদের কথা, খেলাধুলার কথা আরও কত কি!
অনেক কথার পর বাঘ ভুতটা বললো, “আমি কিন্তু তোমাদের এ জঙ্গলের বাঘ না। মনের দুঃখে হাঁটতে হাঁটতে এই বনে চলে এসেছি।এখন আর পথ খুঁজে পাচ্ছি না।”
ভূতটা জিজ্ঞেস করলো, ” কি দুঃখ তোমার?”
বাঘ তখন দুঃখের কথা বলতে লাগলো, “জানো, আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে খুব মজা করে খেলছিলাম।অবশ্যি তখন খেলার সময় ছিলো না। ছিলোপড়ার সময়।লুকিয়ে লুকিয়ে খেলছিলাম। হঠাৎ কোত্থেকে বাবা এসে হাজির।জানোই তো বাঘদের রাগ একটুবেশিই থাকে।আমার বাবার তোআরও বেশি। আমাকে কি করলো জানো। এতোগুলোর বন্ধুর সামনে ঠাস করে এক চর মারলো। বললো, “যা…পড়তে বস…!!!” তখন রাগে-দুঃখে-অপমানে আমি কে৬দে ফেলেছিলাম। আমার বন্ধুরা তো ততক্ষণে চম্পট। তারা আড়ালে থেকে সব দেখছিলো আর হাসছিলো। তাই তো আমি দুচোখ যেদিক যায় সেইদিকেহাঁটতে হাঁটতে এইখানে চলেএসেছি।এখন পথা হারিয়ে বসে আছি। আবার খুব ক্ষিধেও পেয়েছে।”
এই কাহিনী শুনে ভুত বলে উঠলো, “আর যাই হোক বাপু, কাজটা কিন্তু তোমার একদম ঠিকা হয় নি। ছেলেমেয়েরাদোষ করলে বাবা-মা তো বকবেই। তাই বলে অভিমান করতে হবে? একেবারে বাড়ি-ঘর ছেড়ে দিতে হবে? তোমারবাবা না হয় একটা চড়-ই মেরেছে। তাই বলে এই? একদমঠিক হয় নি। একদম না।”
বন্ধুর মুখে বাবার পক্ষে কথা শুনে ভুত বাঘটা ভীষণ ক্ষেপে গেলো।
বললো, ” তুমি বাবার পক্ষ নিলে? আমার এখন ভীষন রাগ হচ্ছে।ইচ্ছে হচ্ছে, তোমাকে ধরে ঘাড় মটকে দেই। কপকপ করে খেয়ে ফেলি।”
এই কথা শুনে ভুত তো ভয়ে পড়িমড়ি করে দিলো ছুট। বেচারা একপেয়ে হলে কি হবে। লাফিয়ে লাফিয়ে ভালোই দৌড়ায়। এদিকে বাঘও তাকে তাড়া করছে। হঠাৎ ভুত দেখলো, তার সামনেনদী। নদীর কাছে যেয়ে থামতে চাইলো। কিন্তু পারলো না। ঝুপ করে পানিতেপড়ে গেলো।বেচারা সাঁতার জানে না। সে কি নাকানি-চুবানি!
…….এতক্ষণে ঘুম ভাংলো ভূতের। তারমানে ঘটনাটা সত্যি না। স্বপ্ন ছিলো?
সে ভাবতে লাগলো, ” যাক বাবা…বাঁচলাম। ভাগ্যিস স্বপ্ন ছিলো। নইলে হাবু-ডুবু খেতে খেতে আজকেপ্রাণটাই বেরিয়ে যেত। কিভয়ংকর!!!”
সে দেখলো সে গাছের ওপরেই আছে। নিচে পড়ে নি। তবে পড়তে কতক্ষণ। যদি সত্যি সত্যিই পড়ে যায়। যদি স্বপ্নটাও সত্যি হয়ে যায় ।
সাত-পাঁচ ভেবে বুদ্ধি বেরকরলো। এখন সে ঘুমানোর সময় দড়ি দিয়ে গাছের ডালে নিজেকে শক্ত করে বেঁধে নেয়, যাতে কখনো পড়ে না যায়। আর যাই হোক পড়ে গেলে যদি সবাই দেখেইফেলে কেমন হবে তখন? ছায়াসঙ্গী >হুমায়ুন আহমেদ< প্রতি বছর শীতের ছুটির সময় ভাবি কিছুদিন গ্রামে কাটিয়ে আসব। দলবল নিয়ে যাব- হৈচৈ করা যাবে। আমার বাচ্চারা কখনও গ্রাম দেখেনি- তারা খুশি হবে। পুকুরে ঝাঁপাঝাঁপি করতে পারবে। শাপলা ফুল শুধু যেমতিঝিলের সামনেই ফোটে না, অন্যান্য জায়গাতেও ফোটে তাও স্বচক্ষে দেখবে।
আমার বেশির ভাগ পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত কাজে লাগাতে পারি না। এটাকেমন করে জানি লেগে গেল। একদিন সত্যি সত্যি রওনা হলাম।
আমাদের গ্রামটাকে অজ পাড়াগাঁ বললেও সম্মান দেখানো হয়। যোগাযোগ-ব্যবস্থার এমন সুন্দর সময়েও সেখানে পৌঁছাতে হয় গরুর গাড়িতে। বর্ষার সময় নৌকা, তবে মাঝখানে একটা হাওর পড়ে বলে সেই যাত্রা অগস্ত্যযাত্রার মতো।
অনেকদিন পর গ্রামে গিয়ে ভালো লাগল। দেখলাম আমার বাচ্চাদের আনন্দবর্ধনের সব ব্যবস্থাই নেওয়া হয়েছে। কোত্থেকে যেন একটাহাড়জিরজিরে বেতো ঘোড়া জোগাড় করা হয়েছে। এই ঘোড়ানড়াচড়া করে না, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। খুব বেশি বিরক্ত হলে দীর্ঘনিশ্বাসের মতো একটা শব্দ করে এবং লেজটা নাড়ে।
বাচ্চারা এতবড় একটা জীবন্ত খেলনা পেয়ে মহাখুশি। দু-তিনজন একসঙ্গে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসে থাকে।
তাদের অসংখ্য বন্ধু-বান্ধবও জুটে গেল। যেখানেই যায় তাদের সঙ্গে গোটা পঞ্চাশেক ছেলেপুলে থাকে। আমার বাচ্চারা যা করে তাতেই তারা চমৎকৃত হয়। আমার বাচ্চারা তাদের বিপুল জনপ্রিয়তায় অভিভূত। তারা তাদের যাবতীয় প্রতিভা দেখাতে শুরু করল-কেউ কবিতা বলছে, কেউ গান, কেউ ছড়া।
আমি একগাদা বই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমার পরিকল্পনা- পুরোপুরি বিশ্রাম নেওয়া। শুয়ে বসে বই পড়া, খুব বেশি ইচ্ছা করলে খাতা-কলম নিয়ে বসা। একটা উপন্যাস অর্ধেকের মতো লিখেছিলাম, বাকিটা কিছুতেই লিখতে ইচ্ছা করছিল না। পান্ডুলিপি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। নতুন পরিবেশে যদি লিখতে ইচ্ছা করে।
প্রথম কিছুদিন বই বা লেখাকোনোটাই নিয়ে বসা গেল না।সারাক্ষণই লোকজন আসছে। তারা অত্যন্ত গম্ভীর গলায়নানান জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনায় উৎসাহী। এসেই বলবে- ‘দেশের অবস্থাডা কী কন দেহি ছোডমিয়া। বড়ই চিন্তাযুক্ত আছি। দেশের হইলডা কী? কী দেশ ছিল আর কী হইল?’
দিন চার-পাঁচেকের পর সবাইবুঝে গেল দেশ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। গল্পগুজবও তেমন করতে পারিনা। তারা আমাকে রেহাই দিল। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। গ্রামের নতুন পরিবেশের কারণেই হোক বা অন্য কোনও কারণেই হোক আমিলেখালেখির প্রবল আগ্রহ বোধ করলাম। অসমাপ্ত পান্ডুলিপি নিয়ে বসলাম। সারাদিন লেখালেখি কাটাকুটি করি, সন্ধ্যায় স্ত্রীকে সঙ্গে করে বেড়াতে বের হই। চমৎকার লাগে। প্রায় রাতেই একজন দুজন করে ‘গাতক’ আসে। এরা জ্যোৎস্নাভেজা উঠোনে বসে চমৎকার গান ধরে-
“ও মনা
এই কথাটা না জানলে প্রাণেবাঁচতাম না।
আর কোনও কথাবার্তা হল না।আমি লেখায় ডুবে গেলাম। ঘুঘুডাকা শ্রান্ত দুপুরে লেখালেখির আনন্দই অন্যরকম। মন্তাজ মিয়ার কথা ভুলে গেলাম।
পরদিন আবার এই ব্যাপার। জানালার ওপাশে মন্তাজ মিয়া। বড় বড় কৌতূহলী চোখেতাকিয়ে আছে। আমি বললাম- কী ব্যাপার মন্তাজ মিয়া? আয় ভেতরে।
সে ভেতরে ঢুকল।
আমি বললাম, থাকিস কোথায়?
উত্তরে পোকা-খাওয়া দাঁত বের করে হাসল।
‘স্কুলে যাস না?’
আবার হাসি। আমি খাতা থেকেএকটা সাদা কাগজ ছিঁড়ে তারহাতে দিলাম। সে তার এই বিরল সৌভাগ্যে অভিভূত হয়েগেল। কী করবে বুঝতে পারছেনা। কাগজটার গন্ধ শুঁকল। গালের উপর খানিকক্ষণ চেপেরেখে উল্কার বেগে বেরিয়ে গেল।
রাতে খেতে খেতে আমার ছোট চাচা বললেন- মন্তাজ হারামজাদা তোমার কাছে নাকি আসে? আসলে একটা চড় দিয়ে বিদায় করবে।
‘কেন?’
‘বিরাট চোর। যা-ই দেখে তুলে নিয়ে যায়। ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দিবে না। দুই দিন পরপর মার খায় তাতেও হুঁশ হয় না। তোমার এখানে এসে করে কী?’
‘কিছু করে না।’
‘চুরির সন্ধানে আছে। কে জানে এর মধ্যে হয়তো তোমারকলম-টলম নিয়ে নিয়েছে।’
‘না, কিছু নেয়নি।’
‘ভালো করে খুঁজে-টুজে দ্যাখো। কিছুই বলা যায় না। ঐ ছেলের ঘটনা আছে।’
‘কী ঘটনা?’
‘আছে অনেক ঘটনা। বলব একসময়।
পরদিন সকালে যথারীতি লেখালিখি শুরু করেছি। হৈচৈ শুনে বের হয়ে এলাম। অবাক হয়ে দেখি মন্তাজ মিয়াকে তিন-চারজন চ্যাংদোলা করে নিয়ে এসেছে। ছেলেটা ফোঁপাচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে প্রচন্ড মার খেয়েছে। ঠোঁটফেটে রক্ত পড়ছে। একদিকের গাল ফুলে আছে।
আমি বললাম, কী ব্যাপার?
শাস্তিদাতাদের একজন বলল, দেখেন তো এই কলমটা আপনের কি না। মন্তাজ হারামজাদারহাতে ছিল।
দেখলাম কলমটা আমারই, চার-পাঁচ টাকা দামের বলপয়েন্ট। এমন কোনও মহার্ঘ বস্তু নয়। আমার কাছে চাইলেই দিয়ে দিতাম। চুরি করার প্রয়োজন ছিল না। মনটা একটু খারাপই হল।বাচ্চা বয়সে ছেলেটা এমন চুরি শিখল কেন? বড় হয়ে এ করবে কী?
‘ভাইসাব, কলমটা আপনার?’
‘হ্যাঁ। তবে আমি এটা ওকে দিয়ে দিয়েছি। ছেড়ে দিন। বাচ্চা ছেলে এত মারধর করেছেন কেন? মারধর করার আগে আমাকে জিজ্ঞেস করে নেবেন না?’
শাস্তিদাতা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, এই মাইরে ওর কিছু হয় না। এইডা এর কাছে পানিভাত। মাইর না খাইলে এর ভাত হজম হয় না।
মন্তাজ মিয়া বিস্মিত চোখেআমাকে দেখছে। তাকে দেখেই মনে হল সে তার ক্ষুদ্র জীবনে এই প্রথম একজনকে দেখছে যে চুরি করার পরও তাকে চোর বলেনি। মন্তাজ মিয়া নিঃশব্দে বাকি দিনটাজানালার ওপাশে বসে রইল। অন্যদিন তার সঙ্গে দুএকটাকথাবার্তা বলি, আজ একটা কথাও বলা হল না। মেজাজ খারাপ হয়েছিল। এই বয়সে একটা ছেলে চুরি শিখবে কেন?
মন্তাজ মিয়ার যে একটা বিশেষ ঘটনা আছে তা জানলামআমার ছোট চাচির কাছে। চুরির ঘটনারও দুদিন পর। গ্রামের মানুষদের এই একটাঅদ্ভুত ব্যাপার। কোন ঘটনাযে গুরুত্বপূর্ণ, কোনটা তুচ্ছ তা এরা বুঝতে পারে না। মন্তাজ মিয়ার জীবনের এত বড় একটা ব্যাপার কেউ আমাকে এতদিন বলেনি, অথচ তুচ্ছ সব বিষয় অনেকবার করে শোনা হয়ে গেছে। মন্তাজ মিয়ার ঘটনাটা এই-
তিন বছর আগে কার্তিক মাসের মাঝামাঝি মন্তাজ মিয়া দুপুরে প্রবল জ্বর নিয়ে বাড়ি ফেরে। সেই জ্বরের প্রকোপ এতই বেশি যে শেষ পর্যন্ত মন্তাজ মিয়ার হতদরিদ্র বাবা একজনডাক্তারও নিয়ে এলেন। ডাক্তার আনার কিছুক্ষণের মধ্যেই মন্তাজ মিয়া মারা গেল। গ্রামে জন্ম এবং মৃত্যু দুটোই বেশ স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা হয়। মন্তাজ মিয়ার মা কিছুক্ষণ চিৎকার করে কাঁদল। তার বাবাও খানিকক্ষণ ‘আমার পুত কই গেলরে’ বলে চেঁচিয়ে স্বাভাবিক হয়ে গেল। । বেঁচেথাকার প্রবল সংগ্রামে তাদের লেগে থাকতে হয়। পুত্রশোকে কাতর হলে চলে না।
মরা মানুষ যত তাড়াতাড়ি কবর দিয়ে দেওয়া হয় ততই নাকি সোয়াব এবং কবর দিতে হয় দিনের আলো থাকতে থাকতে। কাজেই জুম্মাঘরের পাশে বাদ আছর মন্তাজ মিয়ার কবর হয়ে গেল। সবকিছুই খুব স্বাভাবিকভাবে।
অস্বাভাবিক ব্যাপারটা শুরু হল দুপুর রাতের পর, যখন মন্তাজ মিয়ার বড় বোন রহিমা কলমাকান্দা থেকে উপস্থিত হল। কলমাকান্দা এখান থেকে একুশ মাইল। এই দীর্ঘ পথ একটি গর্ভবতী মহিলা পায়ে হেঁটে চলে এল এবং বাড়িতে পা দিয়েই চেঁচিয়ে বলল, তোমরা করছ কী? মন্তাজ বাঁইচ্যা আছে।কবর খুঁইড়া তারে বাইর কর।দিরং কবরা না।
বলাই বাহুল্য, কেউ তাকে পাত্তা দিল না। শোকে-দুঃখে মানুষের মাথা খারাপ হয়ে যায়। কবর দিয়ে দেওয়ার পর নিকট আত্মীয়-স্বজনরা সবসময় বলে-“ও মরেনাই।” কিন্তু মন্তাজ মিয়ার বোন রহিমা এই ব্যাপারটা নিয়ে এতই হৈচৈ শুরু করল যে সবাই বাধ্য হল মৌলানা সাহেবকেডেকে আনতে।
রহিমা মৌলানা সাহেবের পায়ে গিয়ে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, মন্তাজ বাঁইচ্যা আছে- আপনে এরে বাঁচান। আপনে না বললে কবরখুঁড়ত না। আপনে রাজি না হওয়া পর্যন্ত আমি পাও ছাড়তাম না। মৌলানা সাহেব অনেক চেষ্টা করেও রহিমাকেঝেড়ে ফেলতে পারলেন না। রহিমা বজ্রআঁটুনিতে পা ধরে বসে রইল।
মৌলানা সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন- বাঁইচা আছে বুঝলা ক্যামনে? রহিমা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, আমি জানি।
গ্রামের মৌলানারা অতি কঠিনহৃদয়ের হয় বলে আমাদেরএকটা ধারণা আছে। এই ধারণাসত্যি নয়। মৌলানা সাহেব বললেন- প্রয়োজনে কবর দ্বিতীয়বার খোঁড়া জায়েজ আছে। এই মেয়ের মনের শান্তির জন্যে এটা করা যায়। হাদিস শরীফে আছে…
কবর খোঁড়া হল।
ভয়াবহ দৃশ্য!
মন্তাজ মিয়া কবরের গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে। পিটপিট করে তাকাচ্ছে। হঠাৎ চোখে প্রবল আলো পড়ায়চোখ মেলতে পারছে না। কাফনের কাপড়ের একখ- লুঙ্গির মতো পেঁচিয়ে পরা।অন্য দুটি খন্ড সুন্দর করে ভাঁজ করা।
অসংখ্য মানুষ জমা হয়ে আছে। এই অবিশ্বাস্য দৃশ্যদেখে কারো মুখে কোনও কথা সরল না। মৌলানা সাহেব বললেন- কীরে মন্তাজ?
মন্তাজ মৃদুস্বরে বলল, পানির পিয়াস লাগছে।
মৌলানা সাহেব হাত বাড়িয়ে তাকে কবর থেকে তুললেন।
এই হচ্ছে মন্তাজ মিয়ার গল্প। আমি আমার এই জীবনে অদ্ভুত গল্প অনেক শুনেছি, এ রকম কখনো শুনিনি।
ছোট চাচাকে বললাম, মন্তাজ তারপর কিছু বলেনি? অন্ধকার কবরে জ্ঞান ফিরবার পর কী দেখল না-দেখল এইসব?
ছোট চাচা বললেন- না। কিচ্ছু কয় না। হারামজাদা বিরাট বজ্জাত।
‘জিজ্ঞেস করেননি কিছু?’
‘কত জনে কত জিজ্ঞেস করছে। এক সাংবাদিকও আসছিল। ছবি তুলল। কত কথা জিজ্ঞেস করল-একটা শব্দ করে না। হারামজাদা বদের হাড্ডি।’
আমি বললাম, কবর থেকে ফিরে এসেছে-লোকজন তাকে ভয়-টয় পেত না?
‘প্রথম প্রথম পাইত। তারপর আর না। আল্লাহ্তায়ালার কুদরত। আল্লাহ্তায়ালার কেরামতি আমরা সামান্য মানুষ কী
বুঝব কও?’
‘তা তো বটেই। আপনারা তার বোন রহিমাকে জিজ্ঞেস করেননি সে কী করে বুঝতে পারল মনত্মাজ বেঁচে আছে?’
‘জিজ্ঞেস করার কিছু নাই। এইটাও তোমার আল্লাহ্র কুদরত। উনার কেরামতি।’
ধর্মকর্ম করুক বা না-করুকগ্রামের মানুষদের আল্লাতায়ালার ‘কুদরত’ এবং কেরামতির’ উপর অসীম ভক্তি। গ্রামের মানুষদের চরিত্রে চমৎকার সব দিক আছে। অতি তুচ্ছ ঘটনা নিয়েএরা প্রচুর মাতামাতি করে, আবার অনেক বড় বড় ঘটনা হজম করে। দার্শনিকের মতো গলায়বলে ‘আল্লাহ্র কুদরত’।
আমি ছোট চাচাকে বললাম, রহিমাকে একটু খবর দিয়ে আনানো যায় না? ছোট চাচা বিস্মিত হয়ে বললেন, কেন?
‘কথা বলতাম।’
‘খবর দেওয়ার দরকার নাই। এম্নেই আসব।’
‘এম্নিতেই আসবে কেন?’
ছোট চাচা বললেন- তুমি পুলাপান নিয়া আসছ। চাইরদিকে খবর গেছে। এই গেরামের যত মেয়ের বিয়া হইছে সব অখন নাইওর আসব। এইটাই নিয়ম।
আমি অবাকই হলাম। সত্যি সত্যি এটাই নাকি নিয়ম। গ্রামের কোনো বিশিষ্ট মানুষ আসা উপলক্ষে গ্রামের সব মেয়েনাইওর আসবে। বাপের দেশের আসার এটা তাদের একটা সুযোগ। এইসুযোগ তারা নষ্ট করবে না।
আমি আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেউ কি এসেছে?
‘আসব না মানে? গেরামের একটা নিয়ম-শৃঙ্খলা আছে না?’
আমি ছোট চাচাকে বললাম, আমাদের উপলক্ষে যেসব মেয়েনাইওর আসবে তাদের প্রত্যেককে যেন একটা করে দামি শাড়ি উপহার হিসেবে দেওয়া হয়, একদিন খুব যত্ন করে দাওয়াত খাওয়ানো হয়।
ছোট চাচা এটা পছন্দ করলেননা। তবে তাঁর রাজি না হয়েও কোনও উপায় ছিল না। আমাদের জমিজমা তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করছেন। গ্রামের নিয়মমতো একসময় রহিমাও এল। সঙ্গে চারটি ছোট ছেলেমেয়ে। হতদরিদ্র অবস্থা। স্বামীর বাড়ি থেকে সে আমার জন্যে দুটা ডালিম নিয়ে এসেছে।
আমার স্ত্রী তাকে খুব যত্ন করে খাওয়াল। খাওয়ার শেষে তাকে শাড়িটি দেওয়া হলো। মেয়েটি অভিভূত হয়ে গেল। এ রকম একটা উপহার বোধহয় তার কল্পনাতেও ছিল না। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। আমি তাকে আমার ঘরে ডেকে নিলাম। কোমল গলায় বললাম, কেমন আছ রহিমা?
রহিমা ফিসফিস করে বলল, ভালো আছি ভাইজান।
‘শাড়ি পছন্দ হয়েছে?’
‘পছন্দ হইব না! কী কন ভাইজান! অত দামি জিনিস কি আমরা কোনোদিন চউক্ষে দেখছি!’
‘তোমার ভাইয়ের ব্যাপারটা জানতে চাচ্ছিলাম। তুমি কীকরে বুঝলে ভাই বেঁচে আছে?’
রহিমা অনেকটা সময় চুপ করেথেকে বলল, কী কইরা বুঝলাম আমি নিজেও জানি না ভাইজান। মৃত্যুর খবর শুইন্যা দৌড়াইতে দৌড়াইতে আসছি। বাড়ির উঠানে পাও দিতেই মনে হইল মন্তাজ বাঁইচ্যা আছে।
‘কীজন্যে মনে হল?’
‘জানি না ভাইজান। মনে হইল।’
‘এইরকম কি তোমার আগেও হয়েছে? মানে কোনও ঘটনা আগে থেকেই কি তুমি বলতে পার?’
‘জ্বি না।’
‘মন্তাজ তোমাকে কিছু বলেনি? জ্ঞান ফিরলে সে কীদেখল বা তার কী মনে হল?’
‘জ্বি না।’
‘জিজ্ঞেস করনি?’
‘করছি। হারামজাদা কথা কয় না।’
রহিমা আরও খানিকক্ষণ বসে পানটান খেয়ে চলে গেল।
আমার টানা লেখালেখিতে ছেদপড়ল। কিছুতেই আর লিখতে পারি না। সবসময় মনে হয় বাচ্চা একটি ছেলে কবরের বিকট অন্ধকারে জেগে উঠে কী ভাবল? কী সে দেখল? তখন তার মনের অনুভূতি কেমন ছিল? মন্তাজ মিয়াকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করে, আমার মনে হয় জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হবে না। সবসময় মনে হয় বাচ্চা একটি ছেলেকে ভয়স্মৃতি মনে করিয়ে দেওয়াটা অন্যায় কাজ। এই ছেলে নিশ্চয়ই প্রাণপণে এটা ভুলতে চেষ্টা করছে। ভুলতে চেষ্টা করছে বলেই কাউকে কিছু বলতে চায়
না। তবু একদিন কৌতূহলের হাতে পরাজিত হলাম।
দুপুরবেলা।
গল্পের বই নিয়ে বসেছি। পাড়াগাঁর ঝিম-ধরা দুপুর। একটু যেন ঘুম-ঘুম আসছে। জানালার বাইরে খুট করে শব্দ হল। তাকিয়ে দেখি মন্তাজ। আমি বললাম- কী খবররে মন্তাজ?
‘ভালো।’
‘বোন আছে না চলে গেছে?’
‘গেছেগা।’
‘আয় ভেতরে আয়।’
মন্তাজ ভেতরে চলে এল। আমার সঙ্গে তার ব্যবহার এখন বেশ স্বাভাবিক। প্রায়ই খানিকটা গল্পগুজব হয়। মনে হয় আমাকে সে খানিকটা পছন্দও করে। এইসবছেলে ভালোবাসার খুব কাঙালহয়। অল্পকিছু মিষ্টি কথা, সামান্য একটু আদর এতেই তারা অভভূত হয়ে যায়। এই ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে বলেআমার ধারণা।
মন্তাজ এসে খাটের এক প্রান্তে বসল। আড়ে আড়ে তোমাকে দেখতে লাগল। আমি বললাম, তোর সঙ্গে কয়েকটা কথা
বলি, কেমন?
‘আইচ্ছা।’
‘ঠিকমতো জবাব দিবি তো?’
‘হুঁ।’
‘আচ্ছা মন্তাজ, কবরে তুই জেগে উঠেছিলি, মনে আছে?’
‘আছে।’
‘যখন জেগে উঠলি তখন ভয় পেয়েছিলি?’
‘না।’
‘না কেন?’
মন্তাজ চুপ করে রইল। আমারদিক থেকে অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে নিল। আমি বললাম, কীদেখলি- চারদিক অন্ধকার?
‘হ।’
‘কেমন অন্ধকার?’
মন্তাজ এবারও জবাব দিল না। মনে হচ্ছে সে বিরক্ত হচ্ছে।
আমি বলালম, কবর তো খুব অন্ধকার তবু ভয় লাগল না?
মন্তাজ নিচুস্বরে বলল, আরেকজন আমার সাথে আছিল সেইজন্য ভয় লাগে নাই।
আমি চমকে উঠে বললাম, আরেকজন ছিল মানে? আরেকজন কে ছিল?
‘চিনি না। আন্ধাইরে কিচ্ছু দেখা যায় না।’
‘ছেলে না মেয়ে?’
‘জানি না।’
‘সে কী করল?
‘আমারে আদর করল। আর কইল, কোনও ভয় নাই।’
‘কীভাবে আদর করল?’
‘মনে নাই।’
‘কী কী কথা সে বলল?’
‘মজার মজার কথা-খালি হাসি আসে।’
বলতে বলতে মন্তাজ মিয়া ফিক করে হেসে ফেলল।
আমি বললাম, কীরকম মজার কথা? দুএকটা বল তো শুনি?
‘মনে নাই।’
‘কিছুই মনে নাই? সে কে এটাকি বলেছে?’
‘জ্বি না।’
‘ভালো করে ভেবেটেবে বল তো-কোনোকিছু কি মনে পড়ে?’
‘উনার গায়ে শ্যাওলার মতো গন্ধ ছিল।’
‘আর কিছু?’
মন্তাজ মিয়া চুপ করে রইল।
আমি বললাম, ভালো করে ভেবেটেবে বল তো! কিছুই মনে নেই?
মন্তাজ মিয়া অনেকক্ষণ চুপকরে থেকে বলল, একটা কথা মনে আসছে।
‘সেটা কী?’
‘বলতাম না। কথাডা গোপন।’
‘বলবি না কেন?’
মন্তাজ জবাব দিল না।
আমি আবার বললাম, বল মন্তাজ, আমার খুব শুনতে ইচ্ছা করছে।
মন্তাজ উঠে চলে গেল।
এই তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা।বাকি যে-ক’দিন গ্রামে ছিলাম, সে কোনোদিন আমার কাছে আসেনি। লোক পাঠিয়ে খবর দিয়েছি তবু আসেনি। কয়েকবার নিজেই গেলাম। দূর থেকে দেখতে পেয়ে সে পালিয়ে গেল। আমি আর চেষ্টা করলাম না।
কিছু রহস্য সে তার নিজের কাছে রাখতে চায়। রাখুক। এটা তার অধিকার। এই অধিকার অনেক কষ্টে সে অর্জন করেছে।
শ্যাওলাগন্ধী সেই ছায়াসঙ্গীর কথা আমরা যদি কিছু নাও জানি তাতেও কিছুযাবে আসবে না। ভয়ঙ্কর এক ভূত সংগ্রহেঃ আসাদুল্লাহ্ অন্ধকার রাত, অমাবস্যা রাতের এই ঘুটঘুটে কালো অন্ধকারেই একাকী হেঁটে যাচ্ছে বিপুল। তার হাতে কোন আলো নেই এমনকি আলো জ্বালাবার কোন উপকরণও নেই। তবুও সে হাঁটছে নির্ভীক নিশাচরের মত। মধ্যরাতের এই নিঃস্তব্ধতাকে ভেদ করে কেবল তার হেঁটে চলার শব্দভেসে আসছে। গাছের ঝরা শুকনো পাতা মাড়িয়ে যাওয়ার শব্দ অন্ধকারটাকে যেন আরও ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। অথচ তার আচরণে ভয়ের বিন্দুমাত্র চিহ্নটি নেই। সে এগিয়ে যাচ্ছে গোরস্থানের দিকে, তার হাতে একটি মরা বেড়াল। তার সম্মুখে ঘন গাছের সারি, তার পরে আরও আধ মাইলের মত রাস্তা, তারপর গোরস্থান।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমেপড়ে বিপুল। তার পাতা মাড়ানোর শব্দ থেমে গেল কিন্তু আরও একটা প্রাণীর হেঁটে আসার শব্দ তখনও স্পষ্ট। পিছন ফিরে তাকালো বিপুল, ঘুটঘুটে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না তার, তবে শব্দটা থেমে যায়। পৃথিবী এখন নীরব, নিজের শ্বাস প্রশ্বাস এমনকি চোখের পলক ফেলার শব্দটুকুও বুঝি শোনা যাবে কান পাতলেই। কিছুটা সময় তাকিয়ে থেকে ফের চলতে শুরু করে বিপুল, তারহাতে ঝুলছে মরা বেড়ালটা। ঘন গাছের সারি পার হয়ে খোলা মাঠে হাঁটছে বিপুল। এমন খোলা মাঠেও আকাশে ফুটে থাকা তারা ব্যতিত আর কোন আলো চোখে পড়ে না। শ্মশানের মত নীরব মাঠে একাকী হেঁটেযায় বিপুল গোরস্থানের উদ্দেশ্যে।
অবশেষে এসে পৌঁছায় গোরস্থানে। ছুঁড়ে ফেলে দেয় নিজের হাতে করে বয়েআনা বেড়ালটা। দূরে বেড়ালটার পতনের শব্দ হয় ঝপাৎ করে, সাথে যোগ হয় আরো কতগুলো শব্দ। একদল ভক্ষকের মাংস ছিড়ে খাওয়ার শব্দ। বেড়ালটা পড়ার সাথে সাথে যেন কারাতাকে ছিঁড়ে খুড়ে খেয়ে ফেলে। অন্ধকারে সে দৃশ্য দেখা যায় না, কিন্তু একদল মাংসাশীর খাদ্য গ্রহণের শব্দগুলো পরিষ্কার ফুটে উঠে নিঃশব্দ অন্ধকারকে ভেদ করে। এবার বিপুল ভীত হয়,দ্রুত পদে পিছিয়ে আসতে চায়। অন্ধকারের বুকে নিজের পথটা খুঁজে নিতে পিছন ফিরে সে। কিন্তু পথ খুঁজে পায়না, কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা লাগে। পিছনহতে কারো পদধ্বনি শুনতে পায়, যেন সদলবলে কারা এগিয়ে আসছে তার দিকে বিপুল বেগে। শব্দেরা ক্রমশ নিকটবর্তী হতে থাকে, একসময় বিপুলের কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ অনুভূত হয়, ফিরে তাকায় বিপুল.... । বিদ্যুৎটা চলে গেল, ভূতের যে নাটকটা উৎসাহ নিয়ে দেখছিলাম কিন্তু সেটি আর শেষ করা হলো না। ছায়া জোবায়ের বিন ইসলাম ‘মাসিক হরর’ পত্রিকার সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমানএর হাতে একটি চিঠি। চিঠিটি এ পর্যন্ত তিনি পাঁচবার পড়েছেন। এখন চিঠির সত্যতা যাচাই এর পালা। চিঠির সাথে প্রেরকের ফোন নাম্বার দেয়া আছে। ফোন করে যদি তাকে পাওয়া যায় তাহলে তাঁর সাথে কথা বলে তিনি ঘটনার ব্যাখ্যা দাড় করানোর চেষ্টা করবেন আর সেই ব্যাখ্যা সহ মূল লেখাটি এ মাসের চিঠি পত্রবিভাগে ছাপানো হবে। ফোন করার আগে চিঠিটি শেষবারের মত পড়ে নেবার কথা ভাবলেন তিনিঃ
আমি তখন মেডিকেল কলেজের ফিফ্থ ইয়ার এর ছাত্রী। ঢাকায় বাসা হবার কারনে অন্য সব ছাত্রীদের মত আমাকেও মেডিকেল কলেজের হলেই থাকতে হত। সেদিন ইভিনিং শিফ্ট সেরে হলে ফিরতে অনেক রাত হয়েছিল বলে তাড়াহূড়ো করে বিছানায় শুয়ে পড়লাম আর প্রায় সাথে সাথেই ঘুম এসেগেল। ঘুমের মাঝে স্বপ্নে দেখলাম কলেজের মর্গে লাশ কাঁটার বিছানায় আমি শুয়ে আছি আর ফরেনসিক বিভাগের এক ডাক্তার একে একে আমার পড়নের সমস্ত পোশাক খুলে ফেলছেন। বুঝলাম আমি তখনও জীবিত, কিন্তু সবাই ভাবছেআমি মরে গেছি আর তাই পোস্টমর্টেমের জন্য আমাকে এখানে রাখা হয়েছে। আমি তখন হাত পা নাড়তে কিংবা কোন শব্দ করতে পারছিলাম না, শুধু বুঝতে পারছিলাম ডাক্তার এখন আমার পোস্টমর্টেম না করে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন। আমাকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে কাপড় গুলা দূরে একটি বিছানায় সরিয়ে রাখলেন তিনি। তারপর ডাক্তার আমার দিকে এগুতেই হঠাৎ আমার মোবাইলের পরিচিত রিং-টোন শুনতে পেলাম। বুঝলাম বিছানায় রাখা আমার কাপড়ের ভিতর থেকে মোবাইল ফোন বাঁজছে। রিং এর আওয়াজ ক্রমেই বেড়ে চলেছে আর ডাক্তার ক্রমশ এগিয়ে আসছেন আমার দিকে। হঠাত মনে হল এটা একটা দুঃস্বপ্ন। তাই প্রাণপনেঘুম ভাংগার চেষ্টা করলাম আর এক সময় ঘুম ভেংগে গেল।ঘুম ভাংগার পর দেখলাম সত্যি আমার মোবাইলে রিং হচ্ছে। মনে মনে কলার কে ধন্যবাদ দিলাম, কারন তিনিফোন না করলে ঘুমের মাঝে আরো কত কি হত কে জানে!
-হ্যালো
-ভাল আছ এষা?
-হ্যাঁ। কে বলছেন?
-কেন চিনতে পারছ না?
-না। কে হাসান ভাই নাকি?
-না হাসান না।
-তাহলে কে?
-তুমি এখন কি পড়ে আছ এষা? স্কার্ট না সালোয়ার কামিজ?
-থাপড়ায় গালের দাঁত ফেলে দিব হারামীর বাচ্চা।
এই বলে ফোন রেখে দিয়ে কলারের নাম্বার চেক করলাম। অপরিচিত নাম্বার, মোবাইলে সেইভ করা ছিল না।ব্যাটা জানত যে আমি ঘুমাচ্ছি, তাই ফোন ধরার আগে নাম্বার চেক করব না। তাই পরিচিত মানুষের মত কথা বলার চেষ্টা করছিল। হঠাত মনে হল আমিই বা হাসান ভাই নাকি জিজ্ঞেস করলাম কেন? হাসান ভাই ত মারা গেছেন অনেকদিন হল। রাগ নামিয়ে আবার ঘুমাবার চেষ্টা করলাম। রাত তখন ক’টা বাজে জানতে ইচ্ছা হচ্ছিল, কিন্তু মোবাইলের আলো চোখে লাগবে বলে আর সময় দেখলাম না। এর কিছুক্ষন পর আবার ফোন বেঁজে উঠল। বুঝতে পারলাম ওই বদমাশ্ লোকটা আবার ফোনকরেছে। তাই কল রিসিভ করলাম না। ফোন বন্ধ করে ঘুমাবার চেষ্টা করলাম আর হঠাত লোড শেডিং শুরু হল। এখন যে আর গরমে ঘুম আসবে না তা পুরোপুরি নিশ্চিত। তবু গরমে হাসফাস করতে করতে ঘুমাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোন কাজ হলনা। পাশের খাঁটের দুই রুমমেট তখন রুমে ছিল না। বোধহয় ওদের আজ নাইট ডিউটি। থাকলে নাহয় ওদের সাথে গল্প করে সময় পার করা যেত।
অনেক্ষন অপেক্ষার পরও ইলেকট্রিসিটি না আসায় মনে হল এভাবে কষ্ট করে শুয়ে থাকার কোন মানে হয় না। ছাঁদে গিয়ে বসে থাকি,তাতে গরম কিছুটা হলেও কম লাগবে। মোবাইল অন করে মোবাইলের আলোয় পথ দেখে ছাঁদে চলে এলাম। ছাঁদে আসার পর আবার মোবাইল বাঁজতে শুরু করল। এবার কলনা কেঁটে বদমাশটা কে কিছুশক্ত কথা শুনিয়ে দেবার কথা ভাবলাম। তা না হলে ব্যাটা হয়ত কালও আবার ফোনকরবে। তাই ফোন ধরে ধমকের সুরে বললাম,
-হ্যালো কে আপনি?
-আমি অনেক দূর থেকে তোমারসাথে দেখা করতে এসেছি এষা। প্লিজ আমায় ভুল বুঝোনা।
-আপনি কে সেটা কি বলবেন? নাহলে আমি ফোন রেখে দিব।
-আমি হাসান।
-আপনি হাসান ভাই না আমি জানি। কারন হাসান ভাই মারা গেছেন। আপনি কে সত্যি করে বলুন।
-সত্যি এষা আমি হাসান। আমি এখন ছাঁদে তোমার কাছেএলে কি তুমি আমায় বিশ্বাসকরবে?
একথা শুনার পর আর কথা বাড়ানোর সাহস রইল না। বুঝতে পারলাম লোকটা আশে পাশের কোন বিল্ডিং থেকে আমাকে দেখতে পাচ্ছে। তাই কল কেটে দিলাম। প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হল। কিছুদিন আগেই মোবাইলের সিম্ পাল্টেছি। এরই মাঝে হয়ত ক্লাসের কারো কাছ থেকে নাম্বারটা কেউ পেয়ে গেছে। অথবা ক্লাসের কেউই আমাকে ফোন করে পরীক্ষা করছে। আমি তাঁর কথায় সাড়াদিলে হয়ত কথা রেকর্ড করে ক্লাসের সবার কাছে তা কোনভাবে পৌছে দিবে আর আমাকে খারাপ সাজাবার চেষ্টা করবে। এ অবস্থায় আর ছাঁদে দাঁড়িয়ে থাকার কোন মানে হয় না, কারন লোকটা আমায় ঘুমাবার পোশাকে দেখতে পাচ্ছে। তবে অন্ধকার থাকায় তা নিয়ে আমি খুব একটা শঙ্কিতহলাম না। আমি তখন ঘুটঘুটেঅন্ধকারের ভিতর আশে পাশের বিল্ডিং গুলার দিকে তাকিয়ে কিছু বের করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোন লাভ হলো না। তাই রুমে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। মোবাইলের আলো জ্বেলে ছাঁদের দরজার দিকে এগুতে যাব আর ঠিক তখন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম কে যেন আমার কানের কাছে ফিস্ফিস্ করে বলে উঠল, এষা যেয়োনা দাঁড়াও। আমি আসছি।
একথা শুনার পর প্রচন্ড ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে যাবার মত অবস্থা হল। মনে হল যেন ছাঁদে আমি ছাড়া আরঅন্য কেউও আছে। ভয়ে আমি তখন মারা যাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম ছাঁদে যে আছে সেযদি মানুষ হয় তাহলে হয়ত আমার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। আর যদি সেটা অন্য কিছু হয় তাহলে যেন সেটা আমার চোখের সামনে নাআসে, কারন আমি সেই ভংকর দৃশ্য সহ্য করতে পারব না।কিছু বুঝে উঠবার আগেই আরোএকটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। হঠাত কোথা থেকে যেন একটা আলোর ঝলকানি এসে ছাঁদের মেঝেতে পড়ল আর আমি দেখতে পেলাম মেঝেতে একটা কালো ছাঁয়া মূর্তি বসে আসে। কিছু বুঝে উঠবার আগেই আরোএকটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। হঠাত কোথা থেকে যেন একটা আলোর ঝলকানি এসে ছাঁদের মেঝেতে পড়ল আর আমি দেখতে পেলাম মেঝেতে একটা কালো ছাঁয়া মূর্তি বসে আসে।ছায়ামূর্তিটার মানুষের মত হাত পা আছে কিন্তু শরীরের গঠন মানুষের মত নয়। আমায় দেখতে পেয়ে ছায়ামূর্তিটাদ্রুত পানির ট্যাংকির দিকে হামাগুড়ি দিয়ে চলে গেল আর ধীরে ধীরে পানির ট্যাংকির দেয়ালে মিশে যেতে শুরু করল। এর পরে কিহয়েছিল আমি ঠিক মনে করতে পারছি না। সম্ভবত আমি সেখানেই জ্ঞান হারাই। জ্ঞান ফিরে পাবার পর জানতে পারি আমি প্রচন্ড ভয় পেয়েছিলাম আর চিৎকার করে মা’কে ডাকছিলাম। আমারচিৎকার শুনে নিচ থেকে ছাত্রীরা ছুটে এসে আমাকে রুমে নিয়ে যায়।
মেডিকেলের ছাত্রী হিসেবেভূত প্রেতে বিশ্বাস করাটা আমার মোটেই শোভা পায় না। তবুও আমি পরবর্তীতে এই ঘটনার কোন ব্যাখ্যা দাড় করাতে পারিনি। জানিনা হাসান ভাই কি সত্যি সত্যি সেদিনআমাকে স্বপ্নের ওই ডাক্তারের হাত থেকে বাঁচাতে এসেছিলেন কিনা। কারন সেই স্বপ্ন আমি এর আগেও বেশ কয়েকবার দেখেছিলাম। এই স্বপ্নের পিছনে একটা কারনও আছে, তবে সেই কারনের সাথে এই ঘটনার কোন সম্পর্ক নেই বলে তা উল্লেখ করছি না।
এষা
ময়মনসিংহ
চিঠিটি পড়ার পর এষাকে ফোনকরলেন সিদ্দিকুর রহমান।
-হ্যালো স্লামালাইকুম
-মিস্ এষা বলছেন?
-জ্বী। কে বলছেন প্লিজ?
-আমি মাসিক হরর পত্রিকার সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান।
-ও আচ্ছা। আমার লেখাটা কিছাঁপানো হচ্ছে?
-জ্বী। তবে তাঁর আগে আপনার আরো সাহায্যের প্রয়োজন।
-বলুন আমি কি করতে পারি?
-আপনি বোধহয় জানেন আমাদের চিঠিপত্র বিভাগে এধরনের লেখার সাথে সম্পাদকের দাড় করানো একটা ব্যাখ্যা থাকে। আর সেটার জন্য আপনার সাহায্যের প্রয়োজন।
-আমাকে কি আপনাদের অফিসে আসতে হবে?
-যদি আসতে পারেন তাহলে খুবই ভাল হয়। আর নাহলে ফোনেই কাজটা সেরে নেয়া যাবে। কখন ফোন করলে আপনারসাথে সময় নিয়ে কথা বলা যাবে?
-আমি আসলে এখন একটু ব্যাস্ত আছি। আপনি চাইলে আমি নিজেই কাল আপনাকে ফোনকরব অথবা আপনাদের অফিসে এসে দেখা করে যাব।
-আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
-আপনাকেও। ভাল থাকবেন।
ফোন রাখার পর সিদ্দিকুর রহমান তাঁর রহস্য ডায়েরীর একটি খালি পাতা খুলে বসলেন। সেখানে দ্রুত কিছু নোট লিখে ফেললেনঃ
১) হাসান সাহেব কে? প্রথমে যেই লোকটি টেলিফোন করেছিল তাঁর গলার স্বর কি হাসান সাহেবের মত ছিল? ধরে নেয়াযাক হ্যাঁ। আর সে কারনেই এষা তাকে প্রথমে হাসান সাহেব মনে করেছিল। কিন্তু এষা কেন ফোনে হঠাতএকজন মৃত মানুষের কথা স্মরণ করবে? তাহলে কি হাসান সাহেব এষার খুব কাছের কেউ ছিলেন যাকে এষাএখনো প্রত্যাশা করে? সেই তীব্র প্রত্যাশা থেকে কি এষা মনে করে হাসান ভাই তাঁর কাছে এসেছিল তাঁকে সেই ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তারের হাঁত থেকে রক্ষা করার জন্যে? আর তাইসে সাধারন একটা ব্ল্যাংক কল কে হাসান সাহেবের কল মনে করে অনেক কিছু ভেবে বসে? হতে পারে হাসান সাহেবের মৃত্যুর সময় এষা তাঁর কাছে ছিল না, তাই তাঁর অবচেতন মন সব সময় চাইত হাসান সাহেবের সাথে শেষ আরেকটিবার দেখা করতে? কিন্তু মৃত মানুষের কোনভাবেই ফিরে আসা সম্ভব না বলে তাঁর অবচেতন মন সেই ইচ্ছা নিয়েহতাশায় ভুগছিল। তাই সেদিন সেই স্বপ্ন আর ব্ল্যাংকল এর সাথে কোন সংযোগ ঘটিয়ে তাঁর অবচেতন মন সাধারন কোন ছাঁয়া কে হাসান সাহেবের ছাঁয়ামূর্তিতে রুপান্তর করে? যদি তাই হয় তাহলে এইঘটনার প্রভাবক হিসেবে অন্য কোন ঘটনা কাজ করেছে যা এষা তখন খেয়াল করেনি। সেই না জানা ঘটনা কে বের করতে পারলেই অনেক রহস্য বেরিয়ে আসবে।
২) এষা লিখেছে কেউ তাঁর কানের কাছে ফিসফিস করে কথা বলেছিল এবং সে তা স্পষ্ট শুনতে পেয়েছিল। এই স্পষ্ট শুনতে পাবার ঘটনাই হাসান সাহেবের ছাঁয়ামূর্তির ঘটনার প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। এছাড়াও আরেকটি কারন এই ছাঁয়ামূর্তির অস্তিত্বকে জোড়ালো করতে পারে। এষা লিখেছে তাঁর তখন দুই ধরনের ভয় হচ্ছিল।প্রথমত ছাঁদে যা ছিল তা যদি মানুষ হয় তাহলে তাঁর বড় কোন ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত সেটা যদি মানুষ না হয় তাহলে সে প্রচন্ড ভয় পাবে। একজন মেডিকেলের ছাত্রী হিসবে এষা কখনো ভূত প্রেত বিশ্বাস করত না। তাই লোকলজ্জার ভয়ে তাঁর জাগ্রত মন চাচ্ছিল এটা যেন কোন মানুষ না হয়, কারন এষা জানে ভূত বলে কিছু নেই, আর এটা মানুষ না হলে ভূত হবারও সম্ভাবনা নেই, হয়ত মনের ভুল হতে পারে যা ভাল করে লক্ষ্য করলে বুঝা যাবে। অপরদিকে এষার অবচেতন মন প্রচন্ডভাবে হাসান ভাই কে প্রত্যাশা করছিল। সেই ভয়ংকর মূহুর্তে এষার চেতন ও অবচেতন দু’টা মনেরইচ্ছাই এক হবার কারনে এষাছাঁয়ামূর্তির অস্তিত্বকে বিশ্বাস করেছিল।
তাই ছাঁয়ামূর্তির অস্তিত্ব সত্যি কি মিথ্যা তা মোবাইলে ফিস্ ফিস্ কন্ঠ শুনবার মত সহজে প্রমাণ করা গেল না।
৪) ফরেনসিক বিভাগের সেই ডাক্তার কে? এষা কেনই বা এধরনের স্বপ্ন আগে দেখত? তা একমাত্র এষার সাথে কথাবলেই জানা যাবে।
৫) উপরের কোন যুক্তিই কাজকরবে না যদি হাসান সাহেব এষার খুব কাছের মানুষ না হয়ে থাকেন। অর্থাৎ এষার অবচেতন মন যদি হাসান সাহেব এর দেখা পেতে না চায়। কিন্তু তা হবার সম্ভাবনা কম কারন এষা চিঠির শেষে লিখেছে যে হাসান সাহেব কি সত্যি এষাকে ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তার এর হাত থেকে রক্ষা করতে এসেছিল কিনা তা সে জানে না। খুব কাছেরমানুষ না হলে দূরের কাউকেএভাবে ছুটে আসার কথা এষা কখনো চিন্তা করবে না। আর এসব কারনেই এষার সাথে কথাবলে আরো কিছু তথ্য জানতে হবে, যা রহস্য সমাধানে সাহায্য করবে। আপাতত শুধু একটা বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে যে এষা আসলে মোবাইলে সেই কলারের ফিস্ ফিস্ কন্ঠ শুনেছিল। এই সূত্র ধরেই সামনে এগুতে হবে। এখন এষাকে যে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করতে হবে তা হলঃ
১) হাসান সাহেব কে ছিলেন?
২) জ্ঞান ফিরে পাবার পর এষা মোবাইলে সেই কলারের কল কতবার রিসিভ করেছিল সেটা কি চেক্ করেছিল ? দু’বার না তিনবার?
৩) সেই কলারের নাম্বার নিশ্চয়ই এষা মোবাইল থেকে সংগ্রহ করে রেখেছিল? সেই নাম্বারে কি পরে কখনো ফোনকরা হয়েছিল কলারের সন্ধান জানতে? ৪) ছায়াঁমূর্তির শরীরের গঠন তাঁর কাছে মানুষের মতমনে হয়নি কেন?
৫) ফরেনসিক বিভাগের সেই ডাক্তার কে?
এর পরদিন সিদ্দিকুর রহমান এষার সাথে ফোনে কথোপকথোন সেরে নিলেন এবং মূল পাঁচটি প্রশ্নের জবাব তাঁর ডায়েরীতে লিখে রাখলেনঃ
১) হাসান সাহেব এষার মেডিকেল কলেজের সিনিয়র স্টুডেন্ট ছিলেন। এষার সাথে তাঁর বিয়ে হবার কথা ছিল। হাসান সাহেব এম,বি,বি,এস শেষ করে লন্ডনে চলে যান লেখাপড়ার জন্য কিন্তু লন্ডনে একটা রোড এক্সিডেন্টে তিনি মারা যান দু’বছর আগে। হাসান সাহেবের সাথে এষার সম্পর্ক খুব বেশিদিনের ছিল না বলে এষা হাসান সাহেবের পরিবার এর ঠিকানা জানত না। তাই হাসান সাহেবের মৃত্যুর সংবাদটি পায় হাসান সাহেবের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কাছে।
২) কল কতবার রিসিভ করা হয়েছিল কিংবা কলারের নাম্বার কি ছিল তা এষা জানতে পারেনি,কারন তাঁর মোবাইল ফোনটি চুরি হয়ে গিয়েছিল। সে যখন চিৎকার করে জ্ঞান হারায় তখন তাঁরচিৎকার শুনে হলের ছাত্রীরা ছুটে এসে তাকে রুমে নিয়ে যায়, আর পরবর্তীতে কেউ তাঁর ফোনটি সরিয়ে ফেলে।
৩) তিন নম্বর মন্তব্য অনুযায়ী -জানা যায় নি।
৪) এষা বলতে চাচ্ছে ছাঁয়ামূর্তির বুক থেকে কোমরের দিকটা ছিল অস্বাভাবিক রকমের চওড়া অর্থাৎ তাঁর শরীরের অনুপাত কখনোই মানুষের মত ছিল না। আর সবচেয়ে অদ্ভুতব্যাপার ছিল যে ছাঁয়ামূর্তির দুপাশে দু’টি পাখা ছিল। এই পাখারকারনেই সে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছিল যে এটা কোন মানুষের ছাঁয়া নয়।
৫) ফরেনসিক বিভাগের সেই ডাক্তার এষা কে পছন্দ করতেন। হাসান সাহেবের মৃত্যুর পর এষার সাথে তাঁর কিছুটা সম্পর্ক গড়ে উঠে। পরবর্তীতে অনেক রোগীর অভিযোগে সেই ডাক্তারের নামে একটা স্ক্যান্ডাল ছড়িয়ে পড়লে এষা সেই সম্পর্ক কে আর এগুতে দেয়না। কিন্তু ডাক্তার তারপরও এষাকে বিয়ের জন্য চাপ দিয়ে যায়।
এর প্রায় পনের দিন পর ‘মাসিক হরর’ পত্রিকায় সম্পাদকের ব্যাখ্যা সহ এষার চিঠিটি ছাঁপা হয়। সম্পাদকের ব্যাখ্যার খানিকটা অংশঃ
…………লন্ডনে হাসান সাহেবের একটা রোড এক্সিডেন্ট হয় ঠিকই কিন্তু তিনি তাতে মারা যান না। বেঁচে গেলেও তিনিশারীরিকভাবে পংগু হয়ে যান এবং হুইল চেয়ার ব্যাবহার করতে শুরু করেন। এমতাবস্থায় তিনি এষা ও তাঁর পরিবারের কথা চিন্তা করে এষা কে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেন।কারন এই পংগুত্বকে এষা সহজভাবে নিলেও এষার পরিবার হয়ত সার্বিকভাবে এই বিয়েতে খুশী থাকবে না,তাছাড়া তিনিও চান না তাঁরভালবাসার মানুষটি সারাজীবন একজন হুইলচেয়ারে বসে থাকা মানুষের সাথে ঘর করুক। তাই তিনি তাঁর বন্ধুর মাধ্যমে এষাকে তাঁর মৃত্যুর খবরটি পৌছে দিয়েছিলেন। হাসান সাহেবের বাবা মা গ্রামে থাকতেন বলে এষাও পরে আর তাঁর বাবা মা’র সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি। লন্ডন থেকে ডিগ্রী নিয়ে হাসান সাহেব তখন দেশে ফিরে এসেছিলেন। সম্ভবত অল্প কিছুদিন পর তিনি আবার লন্ডন ফিরে যেতেন কারন ফোনে তিনি বলেছিলেন তিনি অনেক দূর থেকে এষার সাথে দেখা করতেএসেছেন। এষা যেন জানতে নাপারে তাই তিনি এষার হোস্টেলের পাশের একটি বাড়িতে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন কিছুদিনের জন্যে। হাসান সাহেব যেহেতু একই মেডিকেলের ছাত্র ছিলেন তাই তাঁর জন্য এ কাজটি করা খুব একটা অসুবিধের কিছু ছিল না। তিনি কিছুদিন এষা কে লুকিয়ে লুকিয়ে সেই বাড়ী থেকে দেখে চোখ জুড়াতেন। কখনো ভাবেন নি এষার সামনে তিনিযাবেন। এষা সাধারনত বিকেলের মধ্যে হলে ফিরে আসে, কিন্তু সেদিন এসেছিলঅনেক রাত করে। তাই তিনি এষাকে দেখতে পাননি। আর এইনা দেখার কষ্ট তাকে এষাকেফোন করতে বাধ্য করে, কারনহয়ত পরদিনই তিনি দেশে ছেড়ে চলে যাবার কথা ভাবছিলেন। ফোন ধরার পর এষা যখন জিজ্ঞেস করে কে ফোন করেছে তখন তিনি ভুল করে বলে ফেলেন ‘কেন চিনতেপারছ না?’ এর জবাবে এষা হাসান সাহেবের কন্ঠ চিনে ফেললে তিনি তা অস্বীকার করেন আর তাঁর মিথ্যা কে আরো জোড়ালো করার জন্য তিনি ইচ্ছে করে এষাকে অশ্লীল একটা প্রশ্ন করেন বসেন, যেন এষা এটা কে একটা ব্ল্যাংক কল হিসেবে মনে করে। এষার অবচেতন মন সব সময়………………… এষাকে ছাঁদে দেখে হাসান সাহেব প্রচন্ডভাবে এষার সাথে কথা বলতে ইচ্ছাপোষন করেন।তখন ছিল গভীর রাত। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকলে মানুষের আবেগ অনেক সময় প্রবণ হয়ে উঠে এবং তাঅনেক কিছু মানতে চায় না। তাই এই পর্যায়ে তিনি এষারসাথে দেখা করে সব কিছু খুলে বলতে চেয়েছিলেন। সেই সময় হঠাত ইলেকট্রিসিটি চলে আসে আর এষা হুইল চেয়ারে বসা হাসান সাহেবের ছাঁয়া ছাঁদের মেঝেতে দেখতে পায়। এষা যে হাসান সাহেবের ছাঁয়া দেখতে পেয়েছে তা তিনি বুঝতে পারেন এবং সেকারনে দ্রুত তিনি জানালা থেকে সরে যান। এখন প্রশ্ন থাকতে পারে হাসান সাহেব ত এষার সাথে দেখা করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাহলে তিনি কেন দ্রুত সরেগেলেন? হতে পারে ইলেকট্রিসিটি চলে আসার পর তিনি এষাকে ছাঁদে আলোয়স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন আর তখন তিনি মত পাল্টান।চারদিকের আলো তাঁর আবেগ কে দমন করতে সাহায্য করে। অথবা এমনো হতে পারে এষাকে শোবার পোষাকে দেখে ফেলায় এষা লজ্জিত হতে পারে বলে তিনিপাশের বাড়িতে থাকবার বিষয়টি গোপন করতে চেয়েছিলেন। এষাকে ফোন করা থেকে শুরু করে এষার জ্ঞান হারানো পর্যন্ত যা কিছু হয়েছিল তার সব কিছুরমূলে রয়েছে হাসান সাহেবের অনিয়ন্ত্রিত আবেগ। আর সেই আবেগ হাসান সাহেবকে অনেক যুক্তিহীন সিদ্ধান্ত নিতে কিংবা দ্রূত সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করেছিল। তিনি যখন হুইল চেয়ারে করে জানালা থেকে দ্রুত সরে যাচ্ছিলেন তখন এষা তাঁর হুইল চেয়ারের ছাঁয়াকে ছাঁয়ামূর্তিটির পাখা ভেবে ভুল করে। আর তখনই এষা নিশ্চিত হয়ে যায় এটা কোন মানুষের ছাঁয়া নয়। হাসান সাহেবের হুইল চেয়ারে করে দ্রুত সরে যাবার ঘটনা কে এষা ছাঁয়ামূর্তির হামাগুড়ি দিয়ে দূরে সরে যাওয়া মনে করে………… ফরেনসিক বিভাগের সেই ডাক্তারের সাথে এষার কিছুটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল আর পরবর্তীতে তা এগুতে পারেনি ডাক্তারের স্ক্যান্ডালের কারনে ( সম্ভবত স্ক্যান্ডালটি নারীঘটিত কোন ব্যাপার ছিল )। তাই সেই সব মিলিয়ে এষা প্রায় সেই ডাক্তার কেনিয়ে এধরনের স্বপ্ন দেখত। সেদিন হাসান সাহেবের ফোনের রিং এ এষারকাঁচা ঘুম ভেংগে যায় আর ফোন ধরে সে হাসান সাহেবেরকন্ঠ শুনতে পায়। হাসান সাহেবের পরিচিত কন্ঠ ও সেই স্বপ্ন এষার অবচেতন মনকে হাসান সাহেবের ছাঁয়ামূর্তির অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে সাহায্য করে আর এষা তখন ভয়ে জ্ঞানহারায়।
আমার এই ব্যাখ্যা শুধুমাত্র এষার সাথে কথোপকথোনের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। ব্যাখ্যা তখনই গ্রহনযোগ্য হবে যদি হাসান সাহেব মারা না যান।তা জানা সম্ভব নয় কারন হাসান সাহেবের একমাত্র বন্ধু যাকে এষা চিনত তিনিকিছুদিন আগে মারা যান। এছাড়াও মেডিকেল কলেজের রেজিস্ট্রি অফিস থেকে হাসান সাহেবের গ্রামের ঠিকানা সংগ্রহ করতে চাইলে খুবই অদ্ভুতভাবে হাসান সাহেবের ঠিকানার পাতাটি ছেঁড়া পাওয়া যায়। তবে এষার বর্ণিত ছাঁয়ামূর্তির সাথে প্রাচীন গ্রীক পৌরাণিক কাহিনীর পাখাওয়ালা শয়তানের মিল পাওয়া যায়। কাহিনীর বর্ণনা অনুযায়ী শয়তান অমাবশ্যার রাতে প্রজননের জন্য মৃত আত্মার উপর ভর করে কুমারীমায়েদের সাথে মিলনের মাধ্যমে নতুন শয়তানের জন্ম দেয়। আর তার জন্য অবশ্যই পরিচিত মানুষের বেশ ধরা প্রয়োজন। হতে পারে এষার গর্ভে তখন ওই ডাক্তারের সন্তান ছিল যা সে সবসময় গোপন করে চলেছে এবং তাই সে লেখাতেও স্বপ্নের কারন উল্লেখ করেনি। হয়ত আমার কাছে সেইপৌরাণিক কাহিনীর শয়তানেরকথা শুনে এষা নিজেই রেজিস্ট্রি অফিসে যোগাযোগ করে হাসান সাহেবের ঠিকানার পাতাটি ছিঁড়ে ফেলে, কেননা হাসান সাহেবের মৃত্যুর রহস্য উদঘাটিত হলে হয়ত নতুন কোনঅজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে যা এষা কাউকে জানতে দিতে চায়না।
ডঃ সিদ্দিকুর রহমান।
সম্পাদক
মাসিক হরর পত্রিকা || সমাপ্ত ||