<মোস্তফা মামুন এর উপন্যাস>
প্রচ্ছদ
|||কিং মিঠু|||
মিঠু একটু তাড়াতাড়ি বাসায়ফিরে যেতে চাইছিল। আজ বাসায় মাংস রান্না হয়েছে।যেদিন বাসায় ভালো খাবার থাকে সেদিন তার খুব তাড়াতাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে। বাসায় অনেক লোক, দেরিকরে গেলে বিশেষ কিছু পাওয়া যায় না। হাড়-গোড় চিবাতে চিবাতে দাঁতের বারোটা। মিঠু শেষ ক্লাসের ঘণ্টা বাজার আগেই বইপত্র গুছিয়েফেলল। ঘণ্টা বাজলেই দৌড় দেবে। আর রফিকের চোখে ধুলো দিতে হবে। তার আর রফিকের ফেরার পথ একইদিকে।কিন্তু রফিক বড় আস্তে আস্তে হাঁটে। তাছাড়া ফেরার পথে তার এক বা একাধিকবার প্রস্রাব করতে হয়। মাংসের দিনে এসব ঝামেলা সহ্য করা যায় না। শেষ ক্লাসটা ছিল ইতিহাসেরমাজহার স্যারের। আজ বোধহয়মাজহার স্যারের বাসায়ও ভালো রান্না। স্যারও মিনিট পনের আগেই পড়ানো শেষ করে বারবার ঘড়ি দেখতেথাকলেন। এই সময়ই হাজির দপ্তরী রহমত মিয়া। মাজহারস্যার ভূত দেখার মতো চমকেউঠলেন। এ সময় দপ্তরীর উপস্থিতি মানেই কোনো বিড়ম্বনা। বিশেষ কোনো সভাবা সে জাতীয় বিরক্তিকর কোনো কাজ। স্যার বিরক্ত হয়ে বললেন, এখন আবার কী? হেডস্যার পাঠালেন। বুঝলাম, কিন্তু বিষয়টা কি? এই ক্লাসের মিঠুকে হেডস্যার একটু থাকতে বলেছেন। মানে ক্লাসের পর স্যারের সঙ্গে দেখা করে যেতে হবে! ক্লাস সেভেনের ছাত্রকে হেডস্যারের ঘরে ডাক পেতে হলে বড় কোনো অপরাধ করতে হয়। সবাই নিশ্চিত মিঠু তেমন কিছুই করেছে। রবি বলল, ঘটনা কী রে? সেটাই তো বুঝতে পারছি না। কোনো স্যারকে সালাম দিতে ভুল করিসনি তো? মনে তো হয় না। গার্লস স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে ছিলি না তো? প্রশ্নই ওঠে না। তাহলে তো মনে হচ্ছে এরচেয়েও খারাপ কিছু করেছিস। এর চেয়েও খারাপ! মিঠু ভেবে পাচ্ছে না সে কী করল!কখন করল? তাও আজকের দিনে। মাজহার স্যার মহাখুশি। একে নিজে নিস্তার পেয়েছেন, তার ওপর ক্লাস সেভেনের একটা ছেলে হেডস্যারের ঘরে ডাক পাওয়ার মতো গুরুতর অপরাধ করেছে। ছেলেরা বড় কোনো অপরাধ করলে বেশিরভাগই স্যারই কেন যেন খুশি হন। খুশি খুশি গলায় বললেন, কীরে বদমাশ? খুব বেড়েছিস না! স্যার আমি... জ্বি মহাশয়। আমি আপনাকেই বলছি। স্যার আমি তো ঠিক বুঝতে পারছি না। পারবি। পারবি। পিঠে কয়েক ঘা পড়লেই পারবি। তোরা হচ্ছিস কিলের কাঁঠাল। কিলনা খেলে তোদের তো ভাত হজম হয় না। ভাত! মিঠুর আবার মনে পড়ল আজ মাংস রান্না হয়েছে। জিভে পানি এল। অবশ্য এখন এই পানির চেয়েও চোখের পানি বিষয়ে তাকে বেশি ভাবতে হচ্ছে। মিঠু স্কুলের হেডস্যারের নাম বদরুল আলম। ছাত্রদের কাছে তার পরিচিতি চার ফুটি হেডমাস্টার। উচ্চতা পাঁচ ফুটের কাছাকাছিই হবেহয়ত, কিন্তু সেটাও তো আর খুব উল্লেখযোগ্য উচ্চতা নয়। কাজেই তাকে চার ফুটি হেডমাস্টার ডাকাটা খুব দোষের কিছু নয় বোধহয়। আর বদরুল আলমও বিশেষ কিছু মনে করেন না। একবার স্কুলের এক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে ক্লাস টেনের বিদায়ী ছাত্ররা তাকে ধরেছিল তার উচ্চতা নিয়ে কিছু একটা বলতে। সবাই ভেবেছিল স্যারশুনে ক্ষেপে আগুন হবেন এবং সেটাই হবে একটা বলার মতো ঘটনা। বাস্তবে বলার মতো ঘটনা তার চেয়েও অনেক বেশি ঘটল। কারণ, স্যার তাদের দাবি শুনে বললেন, অবশ্যই বলব। তোমরা বিদায়ীছাত্ররা সামান্য একটা অনুরোধ করেছ আর আমি সেটা রাখব না! অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার জমিরউদ্দিন বললেন, স্যার এসব কী বলছেনআপনি! বুঝতে পারছেন না এগুলো হচ্ছে বদমাইশি। আপনি যেটা বুঝতে পারছেন সেটা আমি বুঝব না? তাহলে স্যার আপনি রাজি হচ্ছেন কেন? এরা তো আপনাকে যাত্রার সং বানিয়েছাড়বে! হলাম না হয় একবার যাত্রারসং। জমির স্যার তবু চেষ্টা-চরিত্র করলেন। ক্লাস টেনের ছাত্রদের সঙ্গে গোপনে দেখা করে হুমকি দিলেন। প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় সবগুলোকে ফেল করিয়ে দেবেন। কিন্তু হেডস্যার যে প্রস্তাবে রাজি তাতে জমির স্যার বাধা হতে পারলেন না। বদরুল আলম তার উচ্চতা নিয়ে সত্যিই একটা বক্তৃতাদিয়ে ফেললেন। রসালো বক্তৃতা। এবং বক্তৃতা শেষে দেখা গেল কেউ হাসছে না। কারো কারো চোখে পানি।বদরুল আলম সাহেবের বক্তৃতায় এটাও জানা গেল যে তিনি চিরকুমার কারণ এইউচ্চতার জন্যই তার বিয়ে হয়নি। বিয়ে ঠিক হয়েছিল, তিনি বর সেজে গিয়ে বসে আছেন, খাওয়া-দাওয়াও চলছে, কিন্তু শ্বশুরপক্ষের লোকজন কেন যেন খুব উদ্বিগ্ন। রাত গড়িয়ে যাচ্ছে তবু বিয়ে পড়ানো হচ্ছে না। তার বাবা শ্বশুরকে ডেকে বললেন, ভাইজান কোনো সমস্যা। শ্বশুর বললেন, সামান্য একটু সমস্যা আছে। কিন্তু সেটা কোনো ব্যাপার না। সমস্যা যেমন আছে তেমনি সমাধানও আছে। সমস্যাটা কি যদি একটু বলতেন! আমরা খুব টেনশনের মধ্যে আছি। একটুও টেনশন করবেন না। আপনারা মেহমান। মেহমানদের কাজ খাওয়া-দাওয়া করা, গৃহকর্তার কাজ টেনশন করা। কিন্তু সমস্যাটা যদি একটুবলতেন। বললে আরও বিপদে পড়বেন ভাই। আমি তবু কিছু করার চেষ্টা করতে পারব। আপনি সেটাও পারবেন না। যা করারআমিই করব। তিনিও কিছু করতে পারলেন না। রাত ১১টার দিকে জানা গেল মেয়েটি বিষ খাওয়ার চেষ্টা করেছে। এমন বেঁটে লোকের সঙ্গে তার বিয়ে দেয়ার চেষ্টার প্রতিবাদে। হেডস্যারের গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে গেল। কেউ একজন ক্ষীণকণ্ঠে জানতে চেয়েছিল, স্যার তারপর কি হল? তারপর এই যে আমি তোমাদের চার-ফুটি হেডমাস্টার। মানে সেই মেয়েটা কি.... আমি আর বাকিটুকু জানি না। এই ঘটনার পর কিছুদিন আর তাকে চারফুটি হেডমাস্টার ডাকেনি কেউ। বরং তার বিয়েনা করা, একাকীত্বের দুঃখ, সেই মেয়েটির প্রতি ঘৃণা এসবই বেশি আলোচিত হত। আস্তে আস্তে আবার চার ফুটে ফিরে এসেছেন। আসলে হেডস্যার বা এই জাতীয় শাসক শ্রেণীর লোকদের শত্রুতা না করলে কেমন যেনঠিক জমে না। ক্লাস শেষের ঘণ্টা বাজলে মাজহার স্যার মিঠুর দিকে আবার চোখ পাকিয়ে তাকালেন।হাসলেনও একটু, যার মানে হল, আজ তোর রক্ষা নেই রে হতচ্ছাড়া। স্যাররা কেন এমন নিষ্ঠুর হন সেটা ভেবেপায় না মিঠু। তার বাবার বয়সী লোক, তারও ছেলে-মেয়ে আছে, কিন্তু স্কুলে সব স্যারেরই এমন ভাব যেন এই ছেলেগুলোই দেশটাকে গোল্লায় নিয়ে যাচ্ছে। তারা বেত হাতে গোল্লাযাত্রা ঠেকানোর চেষ্টা করছেন এবং পারছেন না।
হেডস্যারও বেত হাতে তৈরি আছেন। বাইরে লম্বা লাইন। নিয়ম হচ্ছে স্যার একেকজনকে ডাকবেন, বাইরে থেকে চিৎকার শোনা যাবে এবং তারপর একসময় কেঁদে-কেটে একেকজন বেরোবে। দুজনইতিমধ্যেই নিলডাউন হয়ে গেছে। এদের অপরাধ বোধহয় একটু বেশি। তাই এই প্রাক শাস্তি। মিঠু দেখল সে লাইনের ছয় নাম্বার। একেকজনকে ৫ মিনিট করে ধরলেও তার লাইনআসতে আসতে চলে যাবে আধঘণ্টা। তারপর মার খাওয়ার ব্যাপার আছে, সেটা সামলে বাড়ি যেতে যেতে এক ঘণ্টা। না আজকের দিনে এমননা হলেই হত। হঠাৎ পাশ থেকে কে যেন বলল,সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজজোয়ালেমিন পড়। মিঠু দেখে রফিক। তাদের বন্ধুদের কেউ কেউ এই ঘটনাটা আদ্যন্ত দেখে যেতেচায়। পরদিন ক্লাসে খুব জমিয়ে গল্প বলা যায়। কিন্তু রফিককে দেখে মনে হলো তার মধ্যে সহানুভুতিরমাত্রাটা বেশি। আজ অবশ্য জনিটা আসেনি। সেটাই একটা সুবিধার কথা। জনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকত।তারপর কাল সে এসেই দেখত সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে। জনি অভিনয় করে দেখাচ্ছে, মিঠু কেমন বাবাগো-মাগো বলেছে। অতি অভিনয় হয়, সত্যের চেয়ে মিথ্যা বেশি, কিন্তু সেটাই সবাই শোনে। রফিক আবার বলল, পড়ছিস তো? কী? ঐ যে বললাম। যা এখান থেকে। যাচ্ছি। তবে বাসায় ফিরব একসঙ্গে। তুই মারটা খেয়ে নে। আমি এই ফাঁকে একটু বাথরুমটা সেরে আসি। রাস্তাঘাটে এসব করা বুঝলিতো খারাপ দেখায়। তোর এখন দশবার করলেও রাস্তায় আবার দাঁড়াতে হবে। আমার একটা অসুখ আছে, সেটা নিয়ে তুই ফাজলামি করিস! বেশি বেশি প্রস্রাব করা আবার কিসের অসুখ রে? অসুখটার নাম হচ্ছে ডায়বেটিস। এটা খুব বড় বড় মানুষদের হয়। তুই তাহলে বেশি-বেশি প্রস্রাব করে বড় মানুষ হচ্ছিস। এর উত্তরে রফিক কী বলে সেটা জানার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু তখনই ভেতরের ঘর থেকে একটা আর্তনাদ। স্যারগো, স্যার, আপনে আমার বাবাস্যার। হেডস্যার ধমকটা দেন খুব আস্তে। তাই ইচ্ছে থাকলেও তার কথাটা শোনা যায় না। তিনি কী বলছেন সেটা বোঝারজন্য আর্তনাদের ভাষাটাকে খুব মন দিয়ে খেয়াল করতে হয়। একটু পরে তার নিজেরও এই অবস্থা হবে, তবু রতন বিষয়টাতে খুব মজা পেয়ে গেল। একজনের কথা শুনে আরেকজন কী বলছে সেটা বের করা। দেখা যাক, এই অসংলগ্নচিৎকার থেকে সে বুঝতে পারে কি-না হেডস্যার কী বলছেন। স্যার গো, আমি আর কোনোদিন নকল করব না স্যার। আল্লারকসম স্যার। এটা শুনে বোঝা গেল পরীক্ষায় নকল করার জন্য এই মারধরের আয়োজন। আবার স্তব্ধতা। মানে হেডস্যারের বাণী। জবাবটা শুনতে কান পেতে আছে, কিন্তু আর কিছু শোনা যায় না। সবাই নড়ে-চড়ে বসে। তার মানে কী মার খেয়ে অজ্ঞান! কে যেন ফিসফিস করে বলল, মেরে ফেলল নাকি? আরেকজন বলল, তাহলে তো আমাদের রক্ষা। একজনকে মেরে ফেললে নিশ্চয়ই হেডস্যারকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে। তাহলে... দেখা গেল হেডস্যারকে পুলিশে ধরার কোনো ব্যাপারহয়নি। চোখ মুছতে মুছতে পরীক্ষায় নকল করা ক্লাস এইটের আরিফ বেরিয়ে এল। বেরিয়ে এসে হাসতে থাকল। যেন কিচ্ছু হয়নি এমন ভঙ্গিতে বলল, একটু বেশি চিৎকার করবি। তাতেই কাজ হবে। লাইনের পরের জন তার চেয়ে আরও বেশি চিৎকার করার প্রস্তুতি নিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু দেখা গেল হেডস্যার নিজেই বেরিয়ে এসেছেন। মাঝে-মধ্যে এমন হয়, হাতে সময় কম থাকলে তিনি এলোপাতাড়ি বেত চালিয়ে শর্টকাটে কাজ সেরেনেন। কিন্তু তার হাতে যে বেত নেই। স্যার কড়া চোখে সবাইকে একনজর দেখলেন। তারপর বললেন, সবাই কাল স্কুল শুরুর আগেআমার সঙ্গে দেখা করবে। যাও। বিপদ পুরো কাটল না, তবু আজতাড়াতাড়ি যেতে পারা যাচ্ছে। মিঠু পা বাড়াতেই শুনল, স্যার বলছেন, শুধু ক্লাস সেভেনের মিঠু ছাড়া। স্যার আমি? হ্যাঁ। তুমি আমার সঙ্গে অফিস রুমে এসো। অফিস রুম ঠিক মারধরের জায়গা নয়। তাহলে ওখানে তাকে নিয়ে যাওয়া কেন? মিঠূ ঠিক বুঝতে পারছে না কী থেকে কী হলো যে! স্যারের পিছু পিছু হাটতে হাটতে মিঠু তার সারাদিনেরকর্মকাণ্ড আবার মনে করার চেষ্টা করল। না আজ তো সে এমন কিছু করেনি। স্যার ঘরে ঢুকে ঠাণ্ডা গলায় বললেন, বসো। হেডস্যার কাউকে বসতে বলছেন এটা গৌরবের ব্যাপারবটে, কিন্তু বিষয়টা খোলাসা না হওয়াতে গর্বটাওঠিক করা যাচ্ছে না। আর বিষয়টার কোনো সাক্ষীও নেই। আহ কেউ একজন দেখলে হত! রফিকটা যদি বাথরুম থেকে বেরিয়ে এদিকে এসে দাঁড়াত। একজন লোক অবশ্য অফিস রুমেবসে আছে। খুবই সুন্দর পোষাক, মিঠু এতক্ষণে বুঝল অফিস ঘরের সামনে যে গাড়িটা রাখা সেটা বোধহয় এই ভদ্রলোকের। দেখেই মনে হচ্ছে, গাড়ি ছাড়া ইনি চলাচল করতে পারেন না। তারশরীর থেকে একটা দারুণ সুগন্ধ আসছে। হেডস্যার বললেন, মিঠু উনাকে সালাম করো। তাই তো এমন লোককে তো অবশ্যই সালাম করা উচিত। মিঠু ঠিক করল তার পা ধরেই সালাম করে। সে উঠে তার পা ছুঁতে গেলেই লোকটি অদ্ভুতভঙ্গিতে তার দু হাত ধরে তাকে দাঁড় করিয়ে বলল, সালাম করতে হবে না বাবা! সালাম করতে হবে না। আচ্ছা লোকটার গলা এমন কাঁপছে কেন? হেডস্যারে দিকে তাকিয়ে লোকটি বলল, এই আমার... হেডস্যার বললেন, ওর নাম মিঠু। মিঠু। মিঠু। লোকটি তার নাম উচ্চারণ করল দুবার। এত সুন্দর করেমিঠুর নাম এর আগে কেউ কখনও উচ্চারণ করেনি। ইশ, এই লোকটি যদি তার আত্মীয় হত! বাইরে রাখা গাড়িটা কী সুন্দর। নিশ্চয়ই গাড়িটা চড়তে দিত তাকে! হেডস্যার বললেন, মিঠু ইনি এসেছেন তোমার খোঁজে! আমার খোঁজে! হেডস্যার কেমন যেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলেন, তোমার খোঁজে মানে তোমাদেরবাসায় যেতে চান আর কী! আমাদের বাসায়! আমাদের বাসায় যাবেন? হ্যাঁ। তোমার বাবার সঙ্গেতার একটু দরকার আছে। তুমিতাকে তোমাদের বাসায় নিয়ে যাবে। অবশ্যই যাব। চলুন। লোকটি উঠে দাঁড়ায়। হেডস্যার বলেন, একটু চা খেয়ে যান। থাক। আরেকদিন এসে খাব। আরেকদিন কি আর আসা হবে? মিঠু একটু অবাক হয়! হেডস্যারের গলাটা এমন অচেনা লাগছে কেন! অবশ্য তারা সবসময় তার চিৎকার আরচেচাঁমেচি শুনে অভ্যস্ত, এমন লোকের স্বাভাবিক গলারকথাও অচেনা লাগে। লোকটি হেডস্যারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বলল, আসব। অবশ্যই আসব। আপনি আমাকে যেভাবে বিশ্বাস করলেন, যে সহযোগিতা করলেন সেটা কি ভোলা যাবে!
হেডস্যার কোনো জবাব না দিয়ে বললেন, মিঠু উনি খুব সম্মানিত লোক। দেখো তার যেন কোনো অসুবিধা না হয়। এতক্ষণ উত্তেজনায় মিঠু খেয়াল করেনি, হেডস্যার তাকে তুমি করে বলছেন। এমনঘটনা তো ঘটে না। এই লোকের কারণে হেডস্যারের কাছেও তার দামএতখানি বেড়ে গেছে। লোকটি কে?
যারা গাড়ি চালায় তাদের ড্রাইভার বলে। আর ড্রাইভার শ্রেণীর লোকেরা বিশেষ সুবিধার হয় না। তারা মদ্যপান করে, তাদের মুখে থাকে অকথ্য গালাগাল।এই সেদিন ওদের কারণে হার্ডব্রেক কষতে হল বলে এক ড্রাইভার মুখ বাড়িয়ে বলল, এই শুয়োরের দল। অথচ এই লোককে গাড়ি চালাতেদেখে কী অসাধারণ লাগছে! মিঠুর কাছে এতদিন বীরত্বের প্রতীক ছিল সিনেমার নায়ক সোহেল রানা, যে পিসিম-ডিসিম ফাইট করে দশ-বারোজনকে কাত করে ফেলে। আজ মনে হল সুন্দর গাড়ি চালানোটাও একটা বীরত্ব। একজন ড্রাইভার ছিল। ছিল মানে আছে। কিন্তু সে বসেছে পেছনের সিটে। তারা স্কুলঘর থেকে বেরিয়ে গাড়িতে আসার সঙ্গে সঙ্গেইড্রাইভারটি নেমে বলল, স্যার আপনি চালাবেন? লোকটি মাথা নাড়তেই সে গিয়ে বসেছে পেছনের সিটে। আর লোকটি গাড়ি চালাচ্ছে। মিঠু জানত না যে গাড়িতে গানও শোনা যায়। লোকটি একটা কিছুতে টিপ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বেজে উঠল চমৎকার সুরের গান। লোকটি জিজ্ঞেস করল, তোমার গান ভালো লাগে? মিঠু মাথা নাড়ল। তুমি গান শুনো? মিঠুর বলতে লজ্জা লাগল যেতাদের বাসায় গান শোনার কোনো ব্যবস্থা নাই। একটা পুরনো রেডিও ছিল, গত মাসে ব্যাটারি শেষ হয়ে যাওয়ার পর আর নতুন করে ব্যাটারি লাগানো হয়নি। যিনি গান গাইছেন তার নাম জানো? মিঠু মাথা নেড়ে বলল, না। এর নাম হচ্ছে নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী। খুব বড় গায়ক। ও। আচ্ছা মিঠু তোমার কি বেড়াতে ভালো লাগে? খুব ভালো লাগে। দূরে কোথাও বেড়াতে গিয়েছো? মিঠু কি করে বলে, দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ তাদের নেই। তার বাবা বলেছেন, এবার পরীক্ষা শেষ হলে সিলেটে নিয়ে যাবেন। যদিও সে ঠিক জানে না সিলেট দূরে কোথাও’র মধ্যে পড়ে কিনা! তাদের বাসা থেকে ঘণ্টা খানেকের পথ। আমি যদি তোমাকে দূরে কোথাও নিয়ে যেতে চাই তুমিযাবে? অবশ্যই যাব। আজই যাবে। আজ! তুমি চাইলে আজই। না। আজ থাক। মা বকবে। তোমার মা বুঝি তোমাকে খুববকে? মাঝে-মধ্যে। ও। মিঠু লোকটিকে আবার দেখে। তার পরনে কালো জিন্সের প্যান্টের সঙ্গে একটা ফুলহাতা গেঞ্জি। পোষাকের দামসম্পর্কে মিঠুর খুব স্পষ্ট ধারণা নেই, কিন্তু এখন সে নিশ্চিত হয়ে গেল কালো জিন্সের প্যান্টের সঙ্গে ডোরাকাটা ফুল হাতা গেঞ্জিই পৃথিবীর সেরা পোষাক। একটা অদ্ভুত সুন্দর স্বরেমোবাইলটি বেজে উঠল, মিঠু ভেবেছিল কথা বলার জন্য গাড়ি থামাবে, তা-না, এক হাতে স্টিয়ারিংটা ধরে দারুণ কায়দায় লোকটি কথা বলল। পুরোটাই ইংরেজিতে। এত সুন্দর ইংরেজিও মানুষ বলে। মিঠুর গর্বে বুক ভরে যায়।এই লোকটি তার বাসায় যাবে।সে গাড়ি থেকে নেমেই শফিককে ডেকে আনবে। বলবে, দেখ আমি আজ কার সঙ্গে এসেছি। দেখ ভালো করে। পেছন থেকে ড্রাইভার হঠাৎ বলল, স্যার। সোহেল পেছনে। দেখেছি। মিঠু হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা আপনি আমাদের বাসায় যাবেন কেন? বদরুল আলম একটু অপ্রস্তুতহয়ে বলল, মনে করো তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য! আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য! বদরুল আলম হেসে বলল, তোমারসঙ্গে দেখা করতে কেউ আসে না? আমার সঙ্গে কে দেখা করতে আসবে? প্রশ্নটা করার পরই মিঠুর হঠাৎ খেয়াল হল গাড়িটা তাদের শহরের বাইরের রাস্তায় চলে এসেছে। এতক্ষণ মগ্ন থাকায় সে খেয়াল করেনি। এটা তো তাদের বাসায় যাওয়ার রাস্তা নয়। মিঠু বলল, গাড়ি থামান। গাড়ি থামান! বদরুল আলম গাড়ি স্লো করে বলল, কি হয়েছে মিঠু? আমরা ভুল পথে এসে পড়েছি। আমাদের বাসা তো এদিকে না। ও। বলেই সে আবার গাড়ি চালু করল। মিঠুর এখন মনে হল, সামনে-পেছনে আরও দুটো গাড়িও তাদের সঙ্গে। বদরুলআলম গাড়ি স্লো করায় সেই গাড়ি দুটোও থেমে গিয়েছিল প্রায়। তারা আবার চলতে শুরু করায় ওরাও চলছে। কিন্তু যাচ্ছে তো আগের পথেই। মিঠু একটু উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, আমরা যাচ্ছি কোথায়? এটা তো আমাদের বাসায় যাওয়ার রাস্তা না। এটা কোন জায়গায় যাওয়ার রাস্তা? বদরুল আলম স্বাভাবিক গলাতেই বলে। এটা সিলেটের রাস্তা। তুমি তো কখনো সিলেটে যাওনি, তাহলে কি করে জানো! জানি তো! কিন্তু আমরা এদিকে যাচ্ছি কেন? আমরা সিলেটে যাচ্ছি। সিলেটে! হ্যাঁ। কিন্তু স্যারকে না আপনি বললেন, আমাদের বাসায় যাবেন। তোমাদের বাসায় যাবো তো! মিঠুর কাছে বিষয়টা কেমন যেন গোলমেলে লাগে। বলে, আমাদের বাসায় যাবেন আবার বলছেন সিলেটে যাবেন! ভয় পেয়ে গেলে নাকি? আমরা সামনে একটা হোটেল আছে সেখানে যাবো। ওখান থেকে একজন ভদ্রমহিলাকে নিয়ে তারপর তোমাদের বাসায় যাবো। তখন যে বললেন.... তুমি কি ভয় পাচ্ছ আমার দেরি দেখে মা খুব চিন্তা করবে। বেশিক্ষণ দেরি হবে না। তুমি খাবে কিছু? না। এইতো তুমি রাগ করছ? মিঠু কিছু বলে না। সত্যিইএবার তার ভয় লাগে। এরা তাকে নিয়ে যাচ্ছে কোথায়? এখন পুরো ব্যপারটা তার কাছে বোকামি মনে হয়। সে কিছু না জেনে এমন বোকার মতো গাড়িতে উঠে পড়ল। এরা যদি তাকে আর গাড়ি থেকে না নামতে দেয়! যদি দূরে কোথাও নিয়ে চলে যায়! সে কিমাকে আর দেখতে পাবে না। শফিকদের সঙ্গে কাল সিনেমাদেখার কথা! ওরা খুব মজা করে সিনেমা দেখবে আর মিঠুকোথায় পড়ে থাকবে! মিঠু পেছন দিকে তাকায়। ড্রাইভার লোকটাকে এখন আর ড্রাইভার মনে হচ্ছে না। তার পেটানো শরীর, কোমরের কাছে কি ছোরা-পিস্তল কিছুআছে নাকি! একটু নৃশংস চেহারা। দেখে মনে হচ্ছে এই লোক নিশ্চিন্তে যে কাউকে খুন করে হাত মুছে গাড়ি চালাতে শুরু করে। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে রক্তের দাগ লাগতেই দেবে না। পেছনে আরেকটা কালো রংয়ের গাড়ি। সেখানে এরচেয়েও ভীতিকর লোকেরা হয়ত বসে আছে। ভয় হয়, সঙ্গে কৌতুহলও। আচ্ছা এত ছেলে থাকতে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার এই আয়োজন কেন? হঠাৎ গাড়িটি ব্রেক কষে। সামনে-পেছনের দুটো গাড়িও অনুগত সৈনিকের মতো থেমে দাঁড়ায়। নিমিষেই ঐ গাড়ি দুটো থেকে লোক এসে মিঠুর দরজা খুলে দেয়। বদরুল আলমগাড়ির স্টার্ট বন্ধ করতে করতে বলে, মিঠু সাহেব এবারএকটু নামো। আমরা একটু খাওয়া-দাওয়া করব। তারপরই সবাই মিলে তোমার বাসায়। এখন আর করার কিছু নেই দেখে মিঠু নেমে দাঁড়ায়। লোকগুলো মিঠুকে এমনভাবে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে থাকেযেন সে কোনো রাজপুত্র। হোটেলে ঢুকতেই রিসিপশনের লোকজন দাঁড়িয়ে যায়। দুটো লোক সামনের সোফায় বসে গল্প করছিল, তারাও গল্প থামিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
বদরুললোকটি এতই ক্ষমতাধর। মিঠুর একটু গর্ববোধও হয়। যে লোকটি এত ক্ষমতাধর সে মিঠুকে সযত্নে এখানে নিয়েএসেছে। মিঠুদের বাসায়ও যাবে একটু পরে। মিঠুকে নিয়ে বদরুল আলম সিড়ির দিকে না গিয়ে একটা ছোট্ট ঘরে ঢুকেন। ঢুকতেই দরজা বন্ধ হয়ে যায়। মিঠুরভয় হয়। বদরুল আলম বলে, ভয় পাচ্ছো? মিঠু মাথা নাড়ে। লিফটে ওঠোনি আগে? এটার নাম লিফট! আমরা কোথায় যাচ্ছি? চারতলায়। সিড়ি ছাড়াই চারতলায়? হ্যাঁ। সিড়ির কাজটাই করে এই লিফট। বলে সে একটা বোতামে টিপ দেয়, তারপর কী যেন হয়। মিঠু দেখে একটা জায়গায় লেখা উঠছে, এক-দুই-তিন। তারপর দরজা খুলে যায়। মিঠু বলে, ভুল হচ্ছে তো! ভুল! আমরা চারতলায় যাব না! এটাই তো চারতলা। মিঠু লিফটে নাম্বার দেখায়, যেখানে দেখাচ্ছে তিন। বদরুল হেসে বলে, বাহ! বুদ্ধিমান ছেলে। আসো। তোমাকে বুঝিয়ে বলছি। লিফট থেকে নেমে বদরুল আলমবলে, শোনো সবচেয়ে নীচের তলা মানে যেটাকে আমরা বলিএক তলা, লিফট সেটাকে বলে গ্রাউন্ড ফ্লোর। সেই হিসাবে দোতলাকে বলে ফার্স্ট ফ্লোর। এখন আমরা যেখানে নেমেছি সেটা হচ্ছেথার্ড ফ্লোর। মানে কয়তলা? চারতলা। এই তো! বদরুল আলম তাকে নিয়ে যে রুমটার সামনে এসে দাঁড়ায় সেটার নাম্বার ৪০১। বাইরের একটা সুইচে টিপ দিতেই দরজা খুলে দাঁড়ান একজন মহিলা। মিঠু কিছু বুঝে ওঠার আগেইতিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন তার ওপর। ছোঁ মেরে কোলে তুলে বলেন, বাবু আমার বাবু! মিঠু বলে, আমার নাম মিঠু। দেখেছো। আমার বাবু কী সুন্দর কথা বলে। বাবু। আমার সোনা বাবু। মিঠুর লজ্জা লাগছিল। শফিকরা যদি জানে কেউ একজনতাকে কোলে তুলে বাবু বলে ডেকেছে তাহলে কী লজ্জার কথা হবে। ওরা তার নাম দিয়ে দেবে, কোলের বাবু। মিঠু ভয়ে ভয়ে চারদিকে তাকায়। শফিক কোথাও ঘাপটি মেরে নেই তো!
২য় ছবি
মিঠুদের বাসার লোকসংখ্যা বেশি; কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা অনেক ভাই-বোন। আসলে মিঠু সবেধন নীলমনি, একা। তাহলেও বাড়িতে মোট মানুষের সংখ্যা কত সেই হিসাব মুখে মুখে শেষ করারনয়। মিঠুর বাবা শরীফ আহমেদ সাবরেজিস্ট্রার অফিসের দলিল লেখক। এ জাতীয় লোকজনকরে খেতে জানলে অনেক কিছুই করা যায়। মিঠুর বাবা সেটা জানেন না। জানেন না বলে প্রতি বিকালে তার বাসায় বাজার হবে কি হবে না তাই নিয়ে খুব টেনশনে থাকতে হয়। অপরিচিত কেউ আসলেই মিঠুর মা মনে করেন, এই বোধহয় কোনো পাওনাদার এল। অথচ তার ঘাড়েই একগাদা লোক। এরমধ্যে ছোট দুই ভাইয়ের থাকাটা খানিকটা যৌক্তিক। তাদের একজন মাস্তানি করে বেড়ায়, আরেকজন প্রায় সারাদিন ঘুমায়। ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়া এক বোনও একটা বাচ্চা নিয়ে তার সংসারে শরীক। বৃদ্ধ বোধ-বুদ্ধি-বিবেচনা সব হারিয়েও কী করে যেন টিকে আছেন এখনও। আছেন দুর সম্পর্কের এক ফুফুও। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারেরবড় ভাইদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যা হয়, ছোট ভাই-বোনকে মানুষ করতে গিয়ে নিজের কথা ভাবার ফুরসত হয় না, তিনিও তার ব্যতিক্রম নন। হাতের লেখাছিল খুব সুন্দর, তাই দিয়ে রোজগার বাড়াতে পড়াশোনার ফাঁকে শুরু করেছিলেন দলিললেখার কাজ। সংসারে দুটো পয়সা আসছে দেখে বাবাও উৎসাহ দিলেন, সবার কপালে সব হয় না। তুমি বরং এই কাজটাই ভালো করে করো। কিন্তু বাবা আরেকটু যে পড়াশোনার ইচ্ছা ছিল! পড়াশোনা সবাই করতে পারে, কিন্তু বড় ভাই হয়ে বাবার দায়িত্ব পালনের সুযোগ সবাই পায় না। তুমি তোমার ভাই বোনদের পড়াশোনা করাও, তাতে দুনিয়া-আখেরাত দুই জায়গাতেই লাভ। আচ্ছা ঠিক আছে। ওরা মানুষ হলে কী আর তোমাকে ফেলবে? ফেলবে না। দেখবে শেষ বয়সে ওদের রোজগারে তুমি পায়ের ওপর পা তুলে খাবে। তা ভাইয়েরা তাকে ফেলে যায়নি, তার সঙ্গেই আছে, শুধু পায়ের ওপর পা তুলাটাহয়নি। তার এখনও মাথার ঘামপায়ে ফেলতে হচ্ছে। জীবনের লড়াইয়ে ঘায়েল হওয়ালোকজন সাধারণত প্রতিবাদী মানসিকতার হয়। নিজের সব ব্যর্থতার জন্য অন্যদের দায়ী করে পৃথিবীর বিপক্ষেজেহাদে নামে। কিন্তু শরীফআহমেদ সবকিছু খুব সহজে মেনে নিয়েছেন। তার বরং মনে হয় যা হয়েছে তার জন্য তিনি নিজেই দায়ী। তিনি ভাইদের ঠিকমতো শিক্ষা দিতে পারেননি বলেই ওরা অপদার্থ হয়েছে। নিশ্চয়ই তার চেষ্টার মধ্যে কোনো খুত ছিল। আজও বিকালে বাসায় ফিরে চুপচাপ শুয়েছিলেন। মিঠুর মা সালমা এসে চিৎকার করে বললেন, এসেই শুয়ে পড়লে। তুমি পারোও। অকারণ তর্কে আগ্রহ হয় না বলে শরীফ কিছু বলেন না। মিঠুর মা তাতে আরও ক্ষেপেগিয়ে বলেন, ঘরে এসেই ঘুম। বাইরে গিয়ে আড্ডা। আর এদিকে আমি মরছি... আমি কি করতে পারি? কী করতে পারো সেটাও আমাকেবলে দিতে হবে! এর জবাবে ঠিক কি বলা যায় তিনি ভাবছিলেন এই সময়ই তার ছোট ভাই আরিফ এসে বলল,ভাই আমাকে ৫০০টা টাকা দাওতো! ৫০০ টাকা! কী করবি? আমাদের বন্ধুরা সবাই পার্টি দিচ্ছে। পার্টি বুঝোতো! মানে একজন সবাইকেখাওয়াচ্ছে আর কী! কাল আমার দিন। কিন্তু এত টাকা! ৫০০ টাকা এত টাকা! ভাই তুমি যে কোন যুগে পড়ে আছো। এই বাজারে ৫০০ টাকায়একটা বডি-স্প্রেও কেনা যায় না। ঠিক আছে দেখি কাল পারি কিনা! দেখি না। পারতেই হবে। আমরা যে কী বড় ভাই পেলাম, অন্য বড় ভাইরা কথার আগে হাজার-হাজার টাকা বের করেদেয়! শরীফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। অন্য ছোট ভাইরাও বড় ভাইয়ের ঘাড়ে বসে খায় না। কিন্তু তার মুখে কোনোকথাই আসে না। আরিফ চলে গেলে মিঠুর মা আরেক দফা তার ওপর চড়াও হন। ৫০০ টাকা কি দেবে? দেখি! এই সময় এত টাকা কোথায় পাই? পাবে। চুরি করে হলেও দেবে। তোমাকে তো আমার চেনা আছে। বাপ-ভাই করে আমার জীবনটা শেষ করে দিলে। জীবন শেষ করা বলতে ঠিক বুঝানো হচ্ছে সেটা শরীফ বুঝতে পারেন না, কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে জানেন এই সময়ে চুপ থাকাই উচিত। তাতেও লাভ হয় না। মিঠুর মা বলতেই থাকেন, একজন বন্ধুদের খাওয়ানোর জন্য ৫০০ টাকা চাইবে, আরেকজন প্রেম করার জন্য চাইবে হাজার টাকা আর তিনি দাতা মোহাম্মদ শরীফ বসে আছেন টাকার থলে নিয়ে। কথাটা শেষ হওয়ার আগেই তারসবচেয়ে ছোট ভাই তারিফ এসেবলল, তুমি নাকি মেজ ভাইকে ৫০০ টাকা দিচ্ছ? কে বলল? সত্যি কিনা বলো। ও চেয়েছে। ও তো যা চায় তাই পায়, শুধু আমি পাই না। অথচ নিয়ম হলো ছোট ভাই সবসময় সবচেয়ে বেশি আদর পাবে। তুমি কিছুই শিখলে না। তোরও কি টাকা লাগবে? ছি-ছি-ছি এটা আবার জিজ্ঞেস করছ। টাকাটা কখন দিচ্ছ বলো! এত টাকা আমি কোথায় পাবো? এই প্রশ্নও বড় ভাইরা ছোট ভাইদের করে না। কখনও শুনেছ তুমি, বলো কখনও শুনেছো যে কোনো বড় ভাই তার ছোট ভাইয়ের কাছে জানতে চাইছে সে কোথায় টাকা পাবে! রোজই এমন ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক সংক্রান্ত নানান জ্ঞান অর্জন হয় শরীফের। আরেকটা জীবন পেলে এই শিক্ষাটা কাজে লাগানো যেত। এই জীবনে আর তা সম্ভব নয়। শরীফ বুঝলেন আজ আর শুয়ে থাকা হবে না। তার চেয়ে বাইরে কিছুক্ষণ ঘুরে আসা যাক। বেরোনোর উদ্যোগ নিতেই মিঠুর মা বললেন, এখন আবার যাচ্ছ কোথায়? ভাইদের জন্যভিক্ষে করতে বেরিয়ে পড়ছ! না। এই একটু ঘুরে আসি। সারাদিন ঘোরাঘুরি। ঘরে তোতোমার মন টেকে না। বাইরে আবার কোথায় কী করছ কে জানে? ইঙ্গিতটা অচিরেই নোংরা দিকে বাঁক নেবে বুঝে শরীফআর দেরি করেন না। বাইরে বেরিয়ে আসেন। বেরোতেই দেখেন মিঠুর কয়েকজন বন্ধুবাসার ঠিক সামনে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে। তার মানেস্কুল ছুটি হয়ে গেছে। কিন্তু মিঠু কোথায়? মিঠু।এতক্ষণ ভাই-স্ত্রী এদের নানামুখী চাপে মিঠুর কথা তার মনেই ছিল না। ছেলেগুলো সব তাকে এগিয়ে আসতে দেখে একটু থমকে যায়।ওদের মুখগুলো কেমন যেন শুকনা। রফিক এগিয়ে এসে বলল, চাচা মিঠুর কোনো খোঁজ পেলেন? মিঠুর খোঁজ! কী হয়েছে মিঠুর। শফিক বলল, আপনি একটুও চিন্তা করবেন না। ও ছেলেধরার কবলে পড়েছে। কিন্তু চিন্তার কিছু নেই।উদ্ধার হয়ে যাবে।
ছেলেধরার কবলে! বলছ কি। ঠিকই বলছি। কিন্তু এটাও বলছি আপনি এ নিয়ে একটুও চিন্তা করবেন না। শুধুকে মিঠুকে উদ্ধার করলেই হবে না। ছেলেধরাকে ধরতেও হবে।নইলে আজ মিঠু। কাল হয়ত আমি। আমি তোমাদের কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। মিঠু তো স্কুলে গিয়েছিল। স্কুলে গিয়েছিল, সেখান থেকেই ছেলেধরা তাকে পাকড়াও করেছে। এবং আমাদেরকাছে যা তথ্য তাতে চারফুটি হেডমাস্টার এদের সঙ্গে আছে। আমি অবশ্য আগেই সবাইকে বলেছিলাম, এই লোকটা কোনো আন্তর্জাতিক চক্রের সদস্য। মিঠুর বাবা দৌড়ে ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করলে শফিক তাকে আটকায়। বলে, চাচা আপনি এখন বাড়িতে গিয়ে হৈ-চৈ করলেই ঝামেলা হয়ে যাবে। সবাই কান্নাকাটি শুরু করে দেবে। ছেলেধরার দল সতর্ক হয়ে যাবে। আমরা এদের সমূলে বিনাশ করতে চাই। কী করতে চাও! সমূলে বিনাশ। শফিকদের অবাক করে দিয়ে হঠাৎ প্রচণ্ড আর্তনাদ করেমাটিতে লুটিয়ে পড়েন শরীফ।এমন প্রচণ্ড চিৎকার যে ভয়পেয়ে ওদের দলের রতন উল্টাদিকে একটা দৌড় দিল। শফিক বলল, এই দৌড়াস না। মারা যাওয়া দেখে যারা দৌড়ায় তাদেরকেই পুলিশ ধরে। দৌড়াবি না। সবাই দাঁড়িয়ে থাক। সবাই দাঁড়িয়ে ছিল কিন্তু এমন পাথরের মতো যেখেয়ালই করেনি কখন মিঠুর মেজোচাচা আরিফ চলে এসেছে। আরিফ এসেই কলার ধরল শফিকের। ধরে একটা আছাড় মেরে বলল, এত বড় সাহস তোর।এত বড় সাহস। আমার ভাইকে নিয়ে ফাজলামো। ফাজলামো করিনি তো! আমরা ওনাকে একটা খবর বলেছি আর উনি... রফিক খবরটা বলতে গিয়েছিল, কিন্তু এমন একটা চড় খেল যে তার মনে হল দুনিয়া ঘুরছে। এরপর আর দাঁড়িয়ে থাকা বোকার কাজ বুঝে সবাই যে যেদিকে পারে দৌড় দিল। শফিক যেতে যেতে বলল, কাজটাআপনি ভালো করেননি। আমার শার্ট ছিড়ে ফেলেছেন। ওরা পালালে আরিফ ভাইয়ের দিকে মন দেয়। শরীফ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলেন, আমার মিঠু! আমার মিঠু! ওহহো! মিঠু তো তোমারই আছে। ও-তো অন্য কারো হয়ে যায়নি। হয়ে যেতেও পারে। হয়ে যেতেও পারে। এই কথার অর্থ আরিফের বোঝার কথা নয়। কারোই নয়। কারণ অর্থটা শুধু শরীফই জানেন। পৃথিবীতে তিনিই একমাত্র!
মিঠু ঠিক বুঝতে পারছে না সে খুশি হবে না দুঃখ পাবে। একেকবার মনে হয় তারখুবই খুশি হওয়া উচিত, সে হয়ও, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয় হায় হায় তার পুরো জগতটা তাহলে মিথ্যা। তখন মিঠুর বুকটা ফাঁকা হয়ে আসে। শফিকরা এখন সঙ্গে থাকলে খুব কাজে লাগত। বন্ধু-বান্ধবরা সারাক্ষণই তাকে জ্বালায় বলে ওদেরকে বিরক্তিকর মনেহয়, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ওরা সঙ্গে থাকলে তবু পরামর্শ করা যেত। বদরুল আলমের স্ত্রী’র কোল থেকে ছাড়া পেতে মিঠুর লেগেছে প্রায় আধঘণ্টা। ছাড়া পাওয়ার পর মিঠু বিস্মিত হয়ে ভাবল এতক্ষণ সে এই মহিলা তার ভার বইলেন কী করে! মিঠুর বয়স ১৩, শরীরের গড়ন বয়সের তুলনায় যথেষ্ট শক্ত-পোক্ত। শীর্ণকায় এবং আবেগবিধ্বস্ত এই মহিলার গায়ে এমন শক্তি এলকিসের জোরে! এরই নাম কি মাতৃস্নেহ! মিঠু জেনেছে এই মহিলাটিই তার মা! এবং তার বাবার নামবদরুল আলম। মিঠুর যাকে সিনেমার নায়ক মনে হয়েছিল, যার শরীরে স্বর্গীয় সৌরভ, যার হাতে গাড়ির স্টিয়ারিংবীরত্বের প্রতীক হয়ে যায় সেই লোকটি মিঠুর বাবা। বদরুল আলম তাকে বসিয়ে ধরাগলায় বললেন, আমি তোমার বাসায় যাব, কিন্তু মনে হল তার আগে তোমার সঙ্গে একটুকথা বলা দরকার। আমার সঙ্গে কথা? তুমি তোমার মায়ের আবেগ দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ তুমি কার ছেলে! মিঠু কিছু বুঝতে না পেরে হা করে চেয়ে থাকে। মহিলাটি আবার শব্দ করে কাঁদেন। বলেন, আমার মিঠু। কিং মিঠু। কিং মিঠু! কিং মানে রাজা, সে রাজা হলো কবে! বদরুল আলম বলেন, তোমার মারস্বপ্ন ছিল তোমাকে রাজা বানাবেন, তাই তোমাকে ডাকতেন কিং মিঠু। মিঠু একটু সাহস সঞ্চয় করেবলে, আমার তো বাবা-মা দুজনই আছেন। আপনারা কারা? তোমার যে বাবা-মা আছেন তারা তোমার বাবা-মা নন, তোমার প্রকৃত বাবা-মা আমরা। তাহলে! তোমার যখন জন্ম হয় তখন আমি ছিলাম বিদেশে। তোমার মায়ের অবস্থা ছিল খুবই খারাপ, সে অচেতন ছিল দুইদিন। সেই সময় একজন নার্স তোমাকে চুরি করে নেয়। নার্স আমাকে চুরি করবে কেন? সেটা খুব ইন্টারেস্টিং ঘটনা। আমরা পরে খোঁজ নিয়েজানতে পারি এই নার্স অল্পকয়েকদিন আগে এই ক্লিনিকে চাকরি নেয়, কিন্তু আসলে সেনার্স নয়। ঐ মহিলার কোনো বাচ্চা-কাচ্চা ছিল না, সে মূলত একটা নবজাতককে চুরি করার জন্যই ঐ হাসপাতালে চাকরি নিয়েছিল। ঐ নার্সই কি তাহলে আমার মা? কিন্তু আমি যতটুকু জানি... না। ঐ নার্স তোমার মা নয়। তাহলে! চুরি করে পালানোর সময় ক্লিনিকের দারোয়ান বা ঐরকম কেউ একজন তাকে দেখে ফেলে। কিন্তু দারোয়ানটা প্রথমে বুঝতে পারেনি যে সে কারো বাচ্চা চুরি করে পালাচ্ছে। পরে যখন খোঁজাখুঁজি শুরু হয় তখন সে জানায় একজন নার্সকে সেবাচ্চা কোলে নিয়ে রাতের বেলা যেতে দেখেছে। তার খোঁজ শুরু হয়। কিন্তু তাকে তখন আর পাওয়া যায়নি।তার দেয়া ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায় সেটা ভুয়া। পুরো সিনেমার কাহিনীর মতোমনে হয় বিষয়টাকে। কিন্তু কাহিনীতে এখনও সে নার্সেরবাচ্চা হয়ে টিকে আছে, সেখান থেকে এখানে এল কীভাবে? বদরুল আলম যেন তার মনের কথাটা পড়ে ফেলেন। বলেন, তুমি ভাবছ সিনেমার মতো ঘটনা। বাস্তব সাধারণত সিনেমার মতো হয় না। হয় নাটকের মতো। তোমাকে কেউ একজন নিয়ে পালিয়েছে, এই পর্যন্তই থেকে যায়। কিন্তু আমরা হাল ছাড়িনি। গত এক যুগ ধরে তোমাকে খুঁজছি। পেলেন কী করে? সেই দারোয়ানকে চাকরি থেকেছাড়িয়ে আমি আমার নিজের স্টাফ করে নেই। মাসে তাকেএকটা বেতন দেয়া হত, আর তারকাজই ছিল সেই নার্স এবং তোমাকে খোঁজার চেষ্টা করা। গত মাসে শেষে সে নার্সের খোঁজ পায়। সেই মহিলা এখনও বেঁচে? না। সে মারা গেছে। তাহলে? আমাদের ভয়ে সে তখন পালিয়েপালিয়ে বেড়াচ্ছিল। পালাতে গিয়ে একবার ট্রেনেচাপে। সেই ট্রেনে ঘটনাচক্রে ছিলেন তোমাদের স্কুলের হেডমাস্টার। আমাদের হেডমাস্টার স্যার! ট্রেনে মহিলাটি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। তিনি তাকে হাসপাতালেও নিয়ে যান। সেখানেই সে মারা যায়। মারা যাওয়ার আগে সে হেডমাস্টার সাহেবকে পুরো ঘটনা জানিয়ে বলে, সে এই বাচ্চাটিকে চুরি করেছিল তাকে খুব আদরে মানুষ করবেবলে। তিনি যেন বাচ্চাটাকেতেমন যত্নেই মানুষ করেন। হেডমাস্টার স্যার! তুমি বোধহয় জানোই তোমাদেরহেডস্যার বিয়ে-শাদি করেননি। তার পরিবারও নেই।তিনি পড়ে গেলেন মহাবিপদে।অচেনা এক স্টেশনে মৃত্যুপথযাত্রী একজন মাকে আবার কথা দিয়েছেন যেতাকে খুব আদরে মানুষ করবেন। কী করবেন! এই ভেবে তার মনে পড়ে তোমার বাবার কথা। আমার বাবা! হ্যাঁ। শরীফ সাহেব। হেডমাস্টার সাহেব এবং তোমার বাবা বন্ধুস্থানীয়। তার মনে পড়ে মাত্র আগের দিনই তোমার মা দ্বিতীয়বারের মতো একটি মৃত সন্তান প্রসব করেছেন। তোমার মা তখনও অচেতন। তাই তিনি সোজা গিয়ে হাজির হলেন হাসপাতালে। ব্যস, সেই থেকে তুমি হয়ে গেলে তাদেরছেলে।
কিন্তু আমার নাম মিঠু তো আপনারা রাখেননি! তাহলে আপনারা কি করে জানেন যে আমার নাম মিঠু। মিঠু আমরাই রেখেছিলাম। তোমার মা সেই নার্সকে বলেছিলেন ছেলে হলে তার নাম হবে মিঠু। কেন যেন এই নামটা তার পছন্দ ছিল খুব।সে ঠিক করে রেখেছিল তুমি হবে কিং মিঠু। কিন্তু আমিই যে সেই ছেলে তার কি প্রমাণ? কৃতিত্ব সব আমাদের দারোয়ান মহব্বতের। মহব্বত এত বছর খুঁজে কীভাবে কীভাবে যেন সেই নার্সের গ্রামের বাড়ির ঠিকানা বের করে। সেখান থেকে জানতে পারে যে কমলগঞ্জ হাসপাতালে নার্সের মৃত্যু হয়েছিল। সেখানে গিয়ে সে খোঁজে বেরকরে যে সেই হাসপাতালে মৃত্যুর সময় কুলাউড়া হাইস্কুলের তখনকার অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার উপস্থিত ছিলেন। তার চিকিৎসারও কিছু ব্যবস্থা তিনি করেছিলেন। সে তখন খুঁজে বের করে স্কুলের হেডমাস্টারকে। তাকে ঢাকায় নিয়ে যাই আমরা। তারকাছ থেকেই জানতে পারি বিস্তারিত তথ্য। এতক্ষণ মিঠু একটা কৌতূহলের রাজ্যে ছিল। তারমনে হচ্ছিল এটা একটা গল্প,গল্পই তাকে টানছিল, সে যে এর কেন্দ্রবিন্দুতে, এখন যে তার বর্তমান-ভবিষ্যত নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা তৈরিহয়ে গেল সেটা ঠিক তার ভাবনায় ছিল না। গল্প শেষ হয়ে গেলে এখন মিঠু ঠিক বুঝতে পারছে না সে খুশি হবে না দুঃখ পাবে। প্রথমেই সে খুশি হয়ে ওঠে, কারণ আজ থেকে সে শফিক-জনি-রফিকের চেয়ে আলাদা। ওদের কারো এত দামীবাবা নেই। ওদের কারো বাবাদের গাড়ি নেই। বাসায় ফিরেই প্রথম ডাকতে হবে শফিকদের। দেখাতে হবে, দেখ আমি তোদের চেয়ে কত বড়। কত আলাদা। কোনোদিন ওরা তাকে আলাদা করে দেখেনি। শফিক বড় বড় কথা বলে। রফিক খুব ভালো ফুটবলখেলে। জনি ক্লাসে ফার্স্টহয়। মিঠু বিশেষ কিছুই পারে না। বানিয়ে গল্প বলতে পারে না। সে ভালো খেলোয়াড় নয়। তার বাবা গরীব। ইতিহাসের মাজহার স্যার অকারণে তাকে বকাঝকাকরেন। এখন থেকে সব অন্যরকম হবে। সব অন্যরকম। গত মঙ্গলবার স্কুল থেকে ফেরার সময় রফিক বলছিল, তোরা নাকি পুরো সপ্তাহ শুধু পুঁইশাক খাস। কে বলল? খবর পাই। আমরা সব খবরই পাই। মিথ্যা কথা। সপ্তাহে একদিন আমরা পুঁইশাক খাই। এতে স্বাস্থ্য ভালো থাকে। এই সপ্তাহে খেয়েছিস? হুঁ। তাহলে আজ তো আর তোদের বাসায় পুঁইশাক নেই। না। চল তাহলে আজ তোদের বাসায় যাই। গিয়ে দেখি কী দিয়ে খাস! চল। বলল বটে, কিন্তু মিঠুর গলায় সেই জোর আর নেই। কারণ আজও পুঁইশাক। এই পুরো সপ্তাহ ধরেই তারা শাক খাচ্ছে। বাবার হাতে টাকা নেই, বাজার হচ্ছে না,ঘরের পাশে পুঁইশাক আছে, তাই কেটে নিয়মিত রান্না হচ্ছে। আজ সকালেও খেতে চায়নি বলে মা তাকে খুব বকেছে। বলেছে, যেন লাটবাহাদুরের ছেলে। শাক খাবে না! কথাটা মনে হতেই মিঠুর মন ভালো হয়ে যায়। সে তো সত্যিই লাট বাহাদুরের ছেলে! এটা জানার পর মা নিশ্চয়ই লজ্জা পাবেন। তারখুব ভালো লাগে, আবার একটু খারাপও লাগে। মা’র নিশ্চয়ই মন খারাপ হবে। তাকে তো এখন চলে যেতে হবে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে। মিঠু খেয়াল করল ইতিমধ্যে ঘর ভরে গেছে খাবারে। এক বাটিতে বিশাল আকারের মুরগীর মাংসের স্তুপ, আরেক বাটিতে সম্ভবত গরুর মাংস। দুই-তিন রকমের মাছওআছে। এত খাবার কয়জন খাবে মিঠু ঠিক বুঝতে পারে না। বদরুল আলম বললেন, মিঠু তোমার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে। বিশেষ কিছু। মিঠুর বলতে লজ্জা লাগল যেতার পোলাও খেতে ইচ্ছে হচ্ছে। এত মাছ-মাংস আছে তাহলে সঙ্গে সাদা ভাত কেন? পোলাও-ইতো থাকার কথা। বড় লোকরা কি পোলাও খায় না। তাদের বাড়িতে বিশেষ খাবার মানেই তো পোলাও। বদরুল আলম তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, মিলি তোমার ছেলের আরও কিছু খেতে ইচ্ছে করছে কিন্তু বলতে পারছে না। তুমি দেখোতো বলাতে পারে কিনা! মিলি এগিয়ে এসে বলেন, বল না বাবা! বাবা-মায়ের কাছে কিসের লজ্জা! মিঠু বলে, পোলাও। বলার সঙ্গে সঙ্গেই বদরুল আলম চিৎকার করেন, পোলাও। সঙ্গে সঙ্গেই কয়েকজন ছুটেএল। সোহেল নামের লোকটি সম্ভবত তার ম্যানেজার জাতীয় কিছু হবে। সে হোটেলের লোককে ধমক দিয়ে বলল, এই পোলাও কই? পোলাও তো অর্ডার দেননি। অর্ডার দিতে হবে কেন? বুঝতে পারো না কিছু! সে একটু ইতস্তত করে বলল, স্যার আমরা তো বিকালে পোলাও রাখি না। না রাখলে বানাবে। কুইক। সত্যি বোধহয় পোলাও বানানোর আয়োজন শুরু হয়ে গেল। মিলি তার ছেড়া জুতাটার দিকে তাকিয়ে বললেন, হ্যাঁরে তোর বুঝি এক জোড়াই জুতা। মিঠু মাথা নীচু করে। বদরুল আলম আবার চিৎকার করেন, সোহেল! জ্বি স্যার। মিঠুর ভালো পোষাকের ব্যবস্থা করতে হবে। হয়ে যাবে স্যার। বলে সে একটু দাঁড়ায়। তারপর গলা নামিয়ে বলে, স্যার একটু সমস্যা হয়েছে। কী সমস্যা! কিছু লোক হোটেলের সামনে এসে ভীড় করেছে! বলছে এখানে নাকি একটা বাচ্চাকেআটকে রাখা হয়েছে। তবে চিন্তার কিছু নেই। আমি ব্যবস্থা করে ফেলেছি। কী ব্যবস্থা? সবগুলোকে নীচে একটা ঘরে আটকে রেখেছি। একজন বোধহয় স্থানীয় মাস্তান, একটু তেড়ি-বেড়ি করছিল। তাকে কয়েক ঘা দিয়েছি। মারধরে গেলে কেন? দরকার ছিল স্যার। এখন পুরো চুপ।
ও। ঠিক আছে যাও। মিঠু বলে, কারা এসেছে? সেসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমরা খেয়েই তোমারবাসায় রওনা হয়ে যাব। মিঠুর জানতে ইচ্ছে করে নীচে কারা এসেছে, শফিকরা নাকি! কিন্তু ইতিমধ্যে সে বুঝে গেছে বড়লোকের বাচ্চাদের এসব ছোট বিষয়ে মাথা ঘামাতে হয় না। তার জন্য সোহেল জাতীয় লোকেরাই আছে।
ঘুসি খেয়ে নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে। কিন্তু সেটা নিয়ে নয়, শফিকের চিন্তা তার শার্ট নিয়ে। শফিকের বাবারকাছে মানুষের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার কাপড়-চোপর। স্কুল থেকে ফিরে শফিককে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াতে হয়। আজ স্কুলে কী পড়ানো হয়েছে নাহয়েছে এই নিয়ে তিনি কোনো প্রশ্ন করেন না। তার পুরোমনযোগ থাকে কাপড়ের দিকে। যদি কাপড় পরিষ্কার থাকে তাহলে তার কোনো কথা নেই। কিন্তু শার্ট-প্যান্টে একটু এদিক-সেদিক দেখলেই তিনি রেগে আগুন। এই বাবারসামনে ছেড়া শার্ট নিয়ে উপস্থিত হলে কী হতে পারে ভেবে শফিক ভীষণ চিন্তায়। চিন্তা করতে করতেই দেখল রফিক এবং জনিও এসে উপস্থিত হয়েছে। মার খেয়ে ওদের অবস্থা আরও খারাপ, কিন্তু ওদের কারো শার্ট ছেড়েনি। আহারে! এই পৃথিবীতে যার যেটা প্রয়োজন সেটা হয় না। শফিকমার আরেকটু বেশি খেলে কী সমস্যা ছিল! তার বিনিময়ে শার্টটা বাঁচলে হত। জনি এই সমস্যার কথা জানে।আরও জানে যতই কথা বেশি বলুক, শফিক মনমরা হলে কাজের কাজ কিছু আগাবে না।এখন তাদের সামনে কঠিন সমস্যা। মিঠু কিডন্যাপ হয়ে গেছে। মিঠু উদ্ধার কমিটি করতে হবে। জনি তার শার্টটা খুলে বলল,এই নে আমার শার্ট পর। তোর শার্ট আমি পরব কেন? শফিক একটু আপত্তি করে। কথা বলিস না। তাড়াতাড়ি কর। আমাদের হাতে অনেক কাজ। এখন তুই ঠিক না হলে হবে। আমি তো ঠিক আছি। শফিক তুই না আমাদের নেতা।তুই সামনে না থাকলে আমাদের মিঠুকে রক্ষা করবেকে? শফিক খুশি হয়ে বলে, তা যা বলেছিস। সব তো আমাকেই করতে হয়। তবে একটা জিনিস কি জানিস? কী! আমার মনে হয় ওদের কোনো ভুল হয়েছে। কী ভুল! ওরা খুব সম্ভব আমাকে কিডন্যাপ করতে চেয়েছিল। আমাকে না পেয়েই মিঠুকে নিয়ে গেছে। বল তো মিঠুকে কিডন্যাপ করার কী আছে। ও তো অ-আও ঠিকমতো জানে না। রফিক এবং জনিকে স্বীকার করতেই হল মিঠুকে কিডন্যাপকরা খুব বোকামীর কাজ হয়েছে। শফিক বলল, তার মানে ধরতে হবে এরা খুব বোকা শ্রেণীর। আমাকে নিতে এসে যাচাই-বাছাই না করেই ভুল লোককে নিয়ে গেছে। জনি বলল, তাহলে তো উপায় একটা আছে। তুই গিয়ে ধরা দিলেই তো মিঠু উদ্ধার হয়েযায়। রফিক ঠোঁট উল্টিয়ে বলল, তোর যা বুদ্ধি। যদি শফিককে পেয়ে মিঠুকে ছেড়ে দেয় তাহলে আমাদের লাভটা কী হল! তখন আবার শফিককে উদ্ধার করতে হবে। জনি বলল, তাতে অসুবিধা কী!মিঠু উদ্ধার কমিটির কাজ তো হয়ে যাবে। তারপর আমরা আবার শফিক উদ্ধার কমিটি করব। তখন নতুন করে ভাবব। শফিক বলে, তোরা দুজনই কথাগুলো বোকার মতো বলেছিস! তা সেটা তো বলবিই,তোরা হচ্ছিস বোকা। কিন্তুএর মধ্য থেকে আমি একটা বুদ্ধি বের করে ফেলেছি। কী বুদ্ধি? রফিক জানতে চায়। ফাঁদটা পাতা হবে আমাকে দিয়েই। আমি গিয়ে বলব, এই যে আমি শফিক। আমাকে ধরুন।আর মিঠুকে ছেড়ে দিন। ব্যসতারা মিঠুকে ছেড়ে দেবে। মিঠু চলে আসবে। তারপর নিজস্ব বুদ্ধি আর কৌশলে আমি মুক্ত হয়ে আসব। ভেরি গুড আইডিয়া। অপরিচিত গলায় কে যেন বলে।উল্টা ঘুরে চেহারাটা দেখতেই মনে হয়, ওদের আবার দৌড় দেয়া উচিত। দেয়ও। কিন্তু আরিফ এমনভাবে সামনে দাঁড়ায় যে ওরা আর পালানোর পথই খুঁজে পেল না। আরিফ চিৎকার করে বলল, বিচ্ছুর দল। আমার মিঠুকে না পেলে তোদের সবগুলোকে আমি খুন করে ফেলব। ওরা চুপ করে থাকে। মিঠুর এই চাচাটি তাদের অঞ্চলের অন্যতম সেরা মাস্তান, এক-আধটা খুন সে ইতিমধ্যেইকরে ফেলেছে বলে ওরা শুনেছে। এই বল, তোরা কে কী জানিস? শফিক বলল, আমি আজকে টিফিনের সময় চলে এসেছিলাম। আমি থাকলে এমন ঘটনা ঘটতই না। জীবনবাজি রেখে হলেও মিঠুকে রক্ষা করতাম। তাহলে রফিক তুই কেন জীবনবাজি রেখে মিঠুকে রক্ষা করলি না। রফিক বলে, আমি তো করতামই। কিন্তু হঠাৎ আমার এমন প্রস্রাব পেয়ে গেল যে... এখন তারচেয়েও বড়টা পাবে। বল মিঠুর সঙ্গে তোর শেষ দেখা হয়েছিল কখন? স্কুল ছুটির পর ওকে হেডস্যার ডেকেছিলেন। ও হেডস্যারের রুমের বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল, এইসময়ই প্রস্রাব চাপাতে আমিবাথরুমে চলে যাই। ফিরে এসে দেখি মিঠু নেই। তুই খোঁজ করিসনি। আমি দপ্তরী রহমতকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে বলল, একটা লোক নাকি এসেছিলগাড়ি করে। হেডস্যারই মিঠুকে ঐ লোকের হাতে তুলেদিয়েছেন। কী এত বড় কথা! ঐ চারফুটি হেডমাস্টারের এত বড় সাহস।ওর এক ফুট আজ আমি কমিয়ে দেব। বলেই আরিফ আরও কিছু হুংকার দিতে দিতে স্কুলেরদিকে এগোয়। আরিফ চলে গেলে ওরা হাফ ছেড়ে বাঁচে। শফিক বলে, যাক গুন্ডাটা চলে গেছে। এসব জায়গায় গুণ্ডামি করে কাজ হয় না। কাজ হয় বুদ্ধি দিয়ে। কিন্তু বুদ্ধি দিয়ে আমরা কী করব? লোকটা কোথায় গেছেকে জানে। যে বিশাল গাড়ি নিয়ে এসেছিল তাতে মনে হয় এতক্ষণে ঢাকা চলে গেছে। প্রয়োজনে আমরাও ঢাকা যাব।শফিক কথাটা শেষ করতে পারেনা, কারণ আরিফ আবার ফিরে এসেছে। আবার হুংকার। বলল, এই তোরাও চল আমার সঙ্গে। হেডমাস্টার যেন কোনো তেড়ি-বেড়ি না করতে পারে। একে অন্যের দিকে তাকায়। একমত হয় যে এখন এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। রফিক আবার হুংকার দেয়, চল।সবগুলোর সাইজ আজকে এক ফুটকমিয়ে দেব। জনি বলে, আমাকে বাদ দেন চাচা। তাহলে যে আমার আর কিছুই থাকবে না। আরিফ আবারও হুংকার দিতে গেল। কিন্তু এতক্ষণের চিৎকারে গলা ভেঙ্গে গেছে মনে হয়। কেমন যেন একটা ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজ বেরোল। ওরা ভেবেছিল হেডস্যারকে স্কুলে পাওয়া যাবে না। এমন অপকর্মের পর গা ঢাকা দেয়ারই নিয়ম। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হেডস্যার স্কুলের সামনে দিব্যি চেয়ার পেতে বসে। আরিফ বলল, দেখেছিস শালার সাহস। বদমাইশি করলে যে লুকাতে হয় সেটাও জানে না। হেডস্যারকে দেখে মনে হল না এই ঘটনা নিয়ে তার কোনো দুশ্চিন্তা আছে। বললেন, আরে আরিফ যে! কিন্তু তোমার সঙ্গে এরা কেন? এই তোরা এখনও বাসায় যাসনি কেন? সে কথা পরে হবে। আগে বলেন,আপনি এখনও এখানে বসে কেন? আমি বসে কেন? এটা কি ধরনের কথা আরিফ। আমার স্কুলে আমি বসে থাকব কি ঘুমিয়ে থাকব সেটা জিজ্ঞেসকরার তুমি কে? আমি তো আর রোজ-রোজ জিজ্ঞেস করতে আসি না। আজ এসেছি কারণ.... কারণ!
কারণ আপনি একটা বদমাশ! কী এত বড় কথা। তুমি আমার ছাত্র ছিলে এটা ভুলে গেছ। যখন ছাত্র ছিলাম তখন সালাম দিয়েছি, এখন তো আর ছাত্র না। তোমার বড় ভাই আমার বন্ধু, এটাতো এখনও আছে নাকি! না। নাই। নাই মানে! তাহলে বন্ধুর ছেলেকে আপনিকিডন্যাপারদের হাতে তুলে দিতে পারতেন। হেডস্যার অবাক হয়ে বললেন, আমি কিডন্যাপারদের হাতে তুলে দিয়েছি? নয়তো কী! এই রফিক বল না, তোর মুখে কি পিঠা নাকি! রফিক ভয় ভয় গলায় বলল, কী বলব? বলবি যা দেখেছিস? কী যেন দেখেছি? রফিক শফিকআর জনির দিকে তাকায়। নিয়মানুযায়ী এরপর আরিফের হাতে রফিকের চড় খাওয়ার কথা। কিন্তু আরিফ কৌশলগত কারণে সম্ভবত এখন শত্রু বাড়াতে চায় না। বলল, শুনুনএই রফিক নিজের চোখে দেখেছে আপনি গাড়িওয়ালা একটা লোকের হাতে মিঠুকে তুলে দিয়েছেন। গাড়িওয়ালা লোক? মানে বদরুল সাহেব। ঐ বদমাশটার নাম বদরুল নাকি? ওকে সাহেব বলছেন কেন? কিন্তু ও-কি মিঠুকে নিয়ে তোমাদের বাসায় যায় নি। বাসায় যাবে কেন? বুদ্ধি-বিবেচনা সব হারিয়ে বসেছেননাকি? বলছ কি তুমি? কিন্তু এতক্ষণে তো বাসায় চলে যাওয়ার কথা। তিনি ঘড়ি দেখেন। আরিফ আবার চিৎকার করে, ওদের সঙ্গে তাহলে আপনার ভালোই যোগসাজশ আছে। হেডস্যার আপনমনে বলেন, কিন্তু এটা তো কথা ছিল না। কথা ছিল প্রথমে নিরালা হোটেলে যাবে, তারপর সেখান থেকে মহিলাকেনিয়েই তোমাদের বাসায়। এতক্ষণ তো লাগার কথা না! নীরব হোটেল! মহিলা! এর মধ্যেও মহিলাও আছে। তার মানে বড় গ্যাং। আপনি তার সঙ্গে যোগ দিলেন কবে? মাস্টারি করে তো পয়সাপাতিভালোই আয় হচ্ছিল। বাজে কথা বলবে না। একদম চুপ। চলো আমার সঙ্গে। বলেই হেডস্যার উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে বেরিয়ে গেলেন। আরিফ যাব না যাব না করেও তার পিছু নিল। নিরালা হোটেলটা আধঘণ্টার পথ। হাইওয়ের পাশের রেস্টুরেন্ট, এসি বাসগুলোওখানে থামে। তাই বেশ জমকালো একটা ব্যাপার। কিন্তু অন্যদিনের চেয়েও যেন আজ একটু বেশি। বেশ কয়েকটা গাড়ি, তা সবসময়ই থাকে, কিন্তু হোটেলে ঢুকতে গেলে কেউ পরিচয় চায়না। দেখা গেল, গেটে দাঁড়ানো দুজন লোক তাদের কাছে জানতে চাইছে, তারা এখানে কেন এসেছে? হেডস্যার বুঝিয়ে বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আরিফ ধমক দিয়ে বলল, তুমি আমাকে চেনো? লোকটি ঠাণ্ডা মাথায় বলল, না। চিনি না। চিনবে। এক্ষুনি চিনবে। তোমরাও সব তাহলে ঐ দলের। আপনি চিৎকার করবেন না। এইহোটেলে একজন সম্মানিত ভদ্রলোক উঠেছেন। আমরা এর মধ্যে কোনো ঝামেলায় যেতে চাই না। ভদ্রলোক! আমি তো জানি এখানে একজন কিডন্যাপার উঠেছে। কী নাম যেন। বদরুল! ওর কান ছিড়ে আমি কুকুর দিকে খাওয়াব। আমাদের অঞ্চলের কুকুর তো দেখোনি, আজ দেখবে! কথাটা শেষ করার আগেই প্রচণ্ড শব্দে কেউ একজন একটা লাথি বসালো আরিফের পেটে। শহরে আরিফ একজন নামী মাস্তান, তার পেটে লাথি মারার ঘটনা ঘটতে পারে সে ভাবতেই পারেনি। প্রস্তুতি ছিল না বলে ছিটকে পড়ল বেশ খানিকটা দূরে। হেডস্যার কিছু বলতেযাচ্ছিলেন, একজন তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, আপনাকে আমরা চিনি, কিন্তু আপনি এসব আজে-বাজে লোকদের নিয়েএখানে এসেছেন কেন? আরিফ বসে থেকেই বলল, আমি আজে-বাজে লোক না! মজাটা দেখবে। এই যে ভাইকে আমি ফোন করছি। জান নিয়ে এক শালাও আজ পালাতে পারবি না। আরেকটা লাথি। আরও জোরে। এরপর আর কথা বেরোয় না। কেউ একজন বলল, ওর মুখটা বন্ধ করে দাও তো। নইলে খালি বাজে কথা বলবে। মুখ বন্ধ করার কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে যে সত্যিই কেউ তার মুখ রুমাল দিয়ে আটকে দেবে এটা ভাবতেই পারেনি শফিকরা। সত্যিই তার মুখ আটকে দেয়া হল। হাত দুটো বাঁধাও হল। এবং তারপর তাদের সবাইকে নিয়ে যাওয়া হল একটা ঘরে। বাইরে থেকে দরজাটা এমন শব্দ করে আটকে দিল যে মনে হল এই দরজা আর কোনোদিন খুলবে না। রফিক ফিসফিস করে বলল, সবাইতো এইখানে রে! এখন উদ্ধার কমিটি কে করবে? শফিক বলল, চিন্তা করিস না।আমি তো আছিই।
৩নং ছবি
মিঠু যা ভেবেছিল তার কিছুই হল না। ভেবেছিল তারমা চিৎকার করে পুরো দুনিয়া একাকার করবেন, কান্নাকাটিও হবে খুব। দাদা কিছু না বুঝে বিছানাথেকে উঠতে গিয়ে কোমর ভাঙ্গা জাতীয় একটা কিছু করে বসতে পারেন। মেহমান এসেছে, কাজেই পড়তে হবে না ধরে ফুফুর বাচ্চাটা মহানন্দে লাফালাফি করবে। এর কিছুই হল না। তার জায়গায় একটা আশ্চর্য নীরবতা এখন বইছে। নীরবতারও একটা ভাষা আছে বলে বইয়ে পড়েছিল মিঠু, বিশ্বাস করেনি একটুও, আজ মনে হল কথাটা পুরো মিথ্যানয়। কেউ কিছু বলছে না, অথচযেন কত কথা বয়ে চলছে অবিরাম। কথা বলছেন একজনই। মিঠুর ফুফু। তিনি যেন একটু খুশিও। তার বিশ্বাস, মিঠু এখন চলে যাবে। গেলে তার বাচ্চাটাই হবে বাসার একমাত্র বাচ্চা, খাতিরটা বেড়ে যাবে। এবং তখন আর মিঠুর মা তার থাকা নিয়ে খোটা দেবে না। মিঠু শুনতে পেল তিনি বলছেন, ভাই আপনি তাহলে ঢাকায়ই থাকেন। জ্বি। আমিও একসময় ঢাকায় ছিলাম। মানে আমার বিয়ে হয়েছিল ঢাকাতেই। ও। রুমীর বাবা মারা গেল লন্ডনে গিয়ে। ওখানে একটা এক্সিডেন্ট করে। তারপর আমার শ্বশুরপক্ষের লোকজন খুব চেয়েছিল আমি যেন তাদের সঙ্গে থেকে যাই, কিন্তু থাকলাম না। ওখানে থাকলে রুমীর শুধু ওর বাবার কথা মনে পড়বে। তাই চলে এলাম। ও আচ্ছা। এই লাইনে আলোচনায় সুবিধা হবে না দেখে ফুফু এখন গেছেন অন্য লাইনে। আর সত্যি বললে এই আলোচনাতে মিঠুর কৌতুহলও আছে একটু। ফুফু বললেন, বুঝলেন আমার শুরুতেই মনে হচ্ছিল মিঠু কোনো বড় ঘরের ছেলে। আসলে এসব বোঝা যায়! তাই! মিঠুর বাবা এবারও উৎসাহ দেখাচ্ছেন না। চেহারা দেখেই বোঝা যায়! ওর চেহারার মধ্যেই একটা রাজপুত্র-রাজপুত্র ভাব আছে। মিঠুর মনে পড়ল কাল দুপুরেফুফু তাকে ছোটলোকের বাচ্চা বলে গাল দিয়েছেন। আচ্ছা ভাই আপনারা কি আজই ওকে নিয়ে যাবেন? ফুফু এবার নির্দিষ্টভাবে জানতে চান। নিতেই তো এসেছি। তাহলে নিয়ে যান। দেরি করাঠিক হবে না। দেরি করা ঠিক হবে না কেন? এই প্রথম বাবা পাল্টা প্রশ্ন করেন। দেরি করলে ধরেন একটা মায়াতৈরি হবে। ওর বাবা-মায়ের কষ্ট বাড়বে। আমরাও তাই ভাবছি। তাহলে দেরি করা একদম ঠিক হবে না। মিঠুও যেতে চায়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। হোটেলের সেই খাবার খাওয়ার পর থেকেই মিঠু একেবারে সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছে। মিঠু সোহেলের কাছে খোঁজ নিয়ে জেনেছে ওদের বাসায় রোজ মাংস রান্না হয়। ভাবতেই মিঠুর জিভে জল চলেআসে। মিঠুরা এখানে এসেছে ১৫ মিনিট হয়। সঙ্গে হেডস্যার, শফিকরাও এসেছে।আরিফ চাচাকেও অনেক ভেবে সঙ্গে নিয়ে আসা হয়েছে। ওরা নীচে নামার পর সোহেল জানতে চায়, স্যার ওদেরকে কী করা হবে? কাদেরকে? ঐ যে কিছু লোক এখানে এসে ঝামেলা করেছিল। সঙ্গে স্কুলের হেডমাস্টারও আছে। চলো দেখি। বলে বদরুল সাহেব রওনা হন।কিছুদূর গিয়ে বলেন, মিঠু আসো। এসে দেখে যাও তোমার সত্যিকারের বন্ধুদের, যারা তোমাকে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়েই কেমন ব্যাকুল হয়ে গেছে। তবে তুমি কোনো কথা বলবে না। ঠিক আছে। মিঠু গিয়ে যা দেখল তা এককথায় অবিশ্বাস্য। আরিফ চাচার হাত-মুখ বেঁধে রাখাহয়েছে। মাস্তান চাচাকে সবাই ভয় পায়, এতদিন সে তারহম্বিতম্বিই দেখে এসেছে, তাকেও যে বিধ্বস্ত দেখা যেতে পারে এটা মিঠুর ধারণাতেই ছিল না। সবাইকে বাদ দিয়ে হেডস্যারকে সে একটু দেখে।ইনি সব জানতেন। ইনিই আসলেতার উদ্ধারকর্তা। চেনা মানুষের পরিচয় বদলে গেলে তাকে কেমন যেন অচেনা লাগে। বদরুল ইঙ্গিত দিলে আরিফেরবাধন খুলে দেয়া হয়। মিঠু ভেবেছিল বাধনটা খোলার সঙ্গে সঙ্গে আরিফ ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তুতাকে একটু অবাক দেখায়। আরিফ চাচা কি সব জেনে গেছে? বদরুল সাহেব আরিফের দিকে তাকিয়ে বলেন, দুঃখিত। যা হয়েছে তার জন্য আমি দুঃখিত। কিন্তু এজন্য দায়ী হচ্ছেন আসলে হেডস্যার। হেডস্যার অবাক। আমি! জ্বি। আপনি। আপনার দায়িত্ব ছিল ওদেরকে ঠেকিয়ে রাখা। ওরা এখানে চিৎকার-চেচাঁমেচি করলে কি সিনক্রিয়েট হত! আপনি তো সেটা পারেননি। মানে আমি... আপনিও আমাকে সন্দেহ করে বসেছিলেন। তাই না? হেডস্যার মাথা নীচু করে থাকেন। আপনার জন্যই এদের এমন ঝামেলায় পড়তে হল? আরিফ চাচা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। বদরুল সাহেব তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, আপনার যা কথা সেগুলো আপনার বাসায় গিয়ে শুনব। সোহেল তুমি ওদের সবার কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করো। তারপর নিয়ে আসো। আমরা রওনা হচ্ছি। এক পা এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ বললেন, না একসঙ্গেই যাই। নইলে আবার হেডস্যার ভেবে বসবেন আমাদের অন্য কোনো মতলব আছে। আমরা রিসিপশনে বসছি। যাওয়া যাক। দরকার আছে। খুব সাধারণ কথা, চিৎকারও করেননি বদরুল, তবু কথাটার মধ্যে এমন একটা ব্যাপার ছিল যেনএটাই শেষ কথা। এরপর আর কথা থাকে না কোনো! শফিকরা খুব আগ্রহ করে খেলো। খাওয়ার পর শফিক ওর পাশ ঘেঁষে বলল, আমরা এসেছিলাম বলেই তোকে ছাড়ল।তুই কোনো চিন্তা করিস না।তোকে উদ্ধার করেছি, এরপর বদমাশগুলোকে শিক্ষা দেব! বদমাশ কে? এই যে এই লোকটা। মিঠু বলে, উনি তো আমার বাবা। বাবা! শফিকের মুখটা এমন হা হল যে আর বন্ধ না-ও হতেপারত। বাসায় ফিরে ঠিক এমনই হা হয়েছিল মিঠুর মায়ের। হা-টা বন্ধ হলো কিনা সেটা দেখল না মিঠু, কারণ তিনি সেখান থেকে সোজা গিয়ে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। মিঠু একটু অবাক হয়েছিল। বদরুল সাহেবের বক্তব্য অনুযায়ী তার বাবা সব জানেন। মা কিছুই জানেন না। কাজেই তার পাল্টা তর্ক করা উচিত ছিল। সাক্ষ্য প্রমাণ চাওয়ার কথা। অথচ তিনি পুরো নির্বাক। বাবা অবশ্য কিছুই মানতে চাইলেন না। হেডস্যারই প্রথম কথা বললেন। শরীফ ইনিই সেই লোক। কোন লোক? এত লোকজন তার বাড়িতে। এর কারণটাই তার কাছে পরিষ্কার নয় এখনও। মিঠুর বাবা। বাবা!
হুঁ। ওনারা এসেছেন মিঠুকে নিতে। বাবার যা স্বভাব তাতে সহজেই সব কিছু মেনে নিয়ে বলার কথা, ও। আচ্ছা। কখন নেবেন? কিন্তু মিঠু জীবনে প্রথমবারের মতো বাবাকে গর্জন করতে দেখল। বাবা পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে বললেন, বললেই হল। বাবা! ফাজলামো। শরীফ কথাটা শোনো। কিসের কথা? কার কথা? আসলে বিষয়টা হয়েছিল কি... কোনো বিষয়-টিষয় শোনার দরকার নেই আমার। বাড়িতে এসেছেন, এক কাপ চা খেয়ে বিদায় হন। নইলে কিন্তু সমস্যা আছে। সমস্যা আছে। এবার বদরুল সাহেব কথা বলেন। বলেন, শরীফ সাহেব প্রথমে আমি পুরো ঘটনাটা বলি। আমি আমার ছেলেকে ফিরে পেয়েছি, কাজেই কোনো ঝামেলা করতে চাই না। আপনারা এতদিন আমার ছেলের দেখাশোনা করেছেন, কাজেই আপনাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।এমনকি তার পেছনে আপনাদের যা খরচা হয়েছে তার সবই আমি দেব। ডাবল দেব। ইস আমার পয়সা দেনেওয়ালা! টাকা দ্‌িেয় শরীফকে কিনতেচান। শরীফের ছেলেকে টাকা দিয়ে কিনে নেবেন? বদরুল হেডস্যারের দিকে তাকিয়ে বলেন, হেডমাস্টার সাহেব আপনার পরামর্শমতোই কাজ করেছি। এর একশ-একটা বিকল্প আমার হাতে ছিল। এবং এখনও আছে। আপনি ওনাকেবোঝান। নইলে অন্য পথে যেতে হবে আমাকে। এই কথাটা বলার সময় সোহেলকে একটু তৎপর দেখায়। হেডস্যার যেন তাতে একটু ভয় পান। বলেন, আপনি চিন্তাকরবেন না। আমি ওকে বুঝিয়েবলছি। হেডস্যার মিঠুর বাবাকে নিয়ে ও ঘরে চলে যান। শরীফের গলায় তখনও উত্তেজনা। বললেই হলো, প্রমাণ কোথায়-এসব কোথা খুব জোরে-শোরে শোনা যেতে থাকে। ঠিক এই সময়ই দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন মিঠুর মা। এসে সোজা দাঁড়ান মিঠুর সামনে। বলেন, আচ্ছা মিঠু এরা যদি তোর বাবা-মা হন তাহলে কি তুই আমাদের ছেড়েচলে যাবি? মিঠু কিছু বলে না। মা তার জীবনের সবচেয়ে উচ্চস্বরের চিৎকারটা দিয়ে বলেন, বল। মিঠু মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ। যাবো। বদরুল সাহেব হাসেন। মিলি কাঁদেন। আর মিঠুর মা বেরিয়ে গিয়ে শরীফকে বলেন, তুমি আর একটি কথাও বলবে না। কেন? আমার ছেলেকে নিয়ে যাবে আর আমি চুপ করে থাকব। চুপ করে থাকবে কারণ তোমারছেলে যেতে চায়। এরপর আর কিছু শোনা যায় না। একটা অদ্ভুত নীরবতা। মিঠুর আজ মনে হল কবরের নিস্তব্ধতা বলে যে একটা কথা আছে সেটাও ভুল নয়। এমন নীরবতাও পৃথিবীতে আছে।
আজ সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় মিঠুর একজন বাবা ছিল।আর একজন মা। স্কুল থেকে ফেরার পর এখন তার দুজন বাবা। দুজন মা। মিঠু ঠিক বুঝতে পারছে না কাকে এখন তার বাবা বা মা ডাকা উচিত। সত্যিকারের বাবা-মাকেই ডাকা উচিত হয়ত, কিন্তু ঠিক যেন মুখে আসতে চাচ্ছে না। সমস্যাটা তাকে প্রথম ধরিয়ে দিয়েছে তার ছোট কাকা। ফুফুর পর আজকের ঘটনায় যে দারুণ খুশি সে হল ছোট কাকা। কারণ বদরুল আলমের সঙ্গে তার একটু আগেকিছু কাজের কথাবার্তা হয়েছে। বাবা-মাকে যখন ও ঘরে বোঝাচ্ছেন তখন ছোট কাকা এসে বসে বদরুল আলমের পাশে। হাত বাড়িয়ে বলে, আমার নাম তারিফ। আমি মিঠুর ছোট কাকা। মিঠুর ছোট কাকা! বদরুল আলম একটু কৌতুকের ভঙ্গিতেবলেন। ছোট কাকা বিব্রত হয়ে বলে, না। আপনি কিছু মনে করলে আর এভাবে বলব না। অনেক দিনের অভ্যাস তো! না। ঠিক আছে। মিঠুকে তো নিশ্চয়ই আপনারাভালো কোনো স্কুলে ভর্তি করে দেবেন। তা তো বটেই। এই একটা ভালো কাজ হবে। এখানকার স্কুলে বুঝলেন পড়াশোনাটা একদম হয় না। তারপর গলা নামিয়ে বলে, ঐ যে চারফুটি হেডমাস্টার ভুলভাল শেখায়। কিছুই পড়েনি। সর্বোচ্চ পড়াশোনা হচ্ছে সুনীল-শীর্ষেন্দু।এই দিয়ে কী চলে! না চলে না। কিন্তু আপনি কতদূর পড়েছেন? এইসব মূর্খদের পড়াশোনার কথা যদি বলেন তাহলে আমি নিতান্তই অশিক্ষিত। দুইবারের চেষ্টায় ইন্টারমিডিয়েট পার হয়েছি। তাও নকল-টকল করতে হয়েছে। এর বাইরে কী পড়েছেন? অনেক কিছু। অনেক কিছু। যেমন! আপনি জিজ্ঞেস করেন। মার্কেজ পড়েছেন? ছোট কাকা অবাক হয়ে বলে, আমি একটু আশ্চর্য হচ্ছি আপনি মার্কেজের নাম জানেনদেখে। আমার ধারণা ছিল বড়লোকের বইপত্রের ধারে-কাছে যায় না। আপনার ধারণা খুব ভুল নয়। আমি গল্প-উপন্যাস পড়ি না।কিন্তু দেশ-বিদেশ ঘুরি। কিছু লোকের নাম জানতে হয়। আমি মার্কেজ পড়েছি। আরও অনেক কিছু পড়েছি। আরও পড়তে চাই। অনেক অনেক পড়তেচাই। পড়ুন। পড়ার জন্য টাকা লাগে। বাংলাদেশে পাওয়া সম্ভব এমন প্রায় সবকিছুই আমি পড়ে ফেলেছি। এখন লাতিন সাহিত্যটা নিয়ে আরেকটু ডিটেলে যেতে চাই। তার জন্য কত টাকা লাগবে? বদরুল সাহেব ব্যবসায়ী মানুষ, টাকা চাওয়ার ঘটনা এত বেশি দেখেছেন যে তার কাছে খুব খোলাসা করে সব বলতে হয় না। কিছু টাকা তো লাগে। কত? এই হাজার পঞ্চাশেক যদি পাওয়া যেত! পাবেন। তার চেয়েও বেশি পাবেন। পাব! যাক খুশি হলাম। এজন্য নয় যে আপনি আমাকে টাকা দেবেন,খুশি হলাম যে মিঠু যাচ্ছেসত্যিকার একজন সাহিত্যানুরাগীর কাছে। আপনাদের সঙ্গে থাকলে সে পরিণত হবে জ্ঞানের আলোয় ঝলমলে এক মানুষে। মানুষেরবড় অভাব আমাদের সমাজে। ঠিক আছে। আপনি পড়ুন। আমি আপনাকে সবরকম সহায়তা করব। ছোট কাকা খুশিতে সম্ভবত লাফ দিতে যাচ্ছিল। লাফ দেয়ার আগেই মনে হল মিঠুর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাউচিত। মিঠুর পাশে এসে বলল,মিঠু তুই তো দারুণ ভাগ্যবান রে! দারুণ বাবা পাচ্ছিস। মার্কেজের নাম জানে। মার্কেজের নাম জানলেই ভালো বাবা হয়ে যায়। আমার মতে হয়। কিন্তু এই সংসারের কেউ তো আর আমার মতটাকে গুরুত্ব দেয় না। মিঠু চুপ করে থাকে। আরেকটা ব্যাপার দেখ। তোর দুজন বাবা-মা। দুনিয়াতে অনেকে একজন বাবা-মাই ঠিকমতো পায় না, তুই পাচ্ছিস দু-দুজন। দারুণ না! মিঠুর মনে হল তাইতো! তার দুজন বাবা-মা। কিন্তু এটাকি খুব আনন্দের। মিঠু ঠিকবুঝতে পারছে না! ঠিক এই সময়েই শরীফ বেরিয়েআসেন। এখন আর তার চেহারা যুদ্ধংদেহী নয়। বাবা আগেরবাবা হয়ে গেছেন। মলিন, ম্রিয়মান, হারতে সদা প্রস্তুত। অসহায়ের মতো এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলেন, বদরুল সাহেব মাফ করবেন। আমি একটু উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিলাম। হেডমাস্টার আমাকে সব বলেছে। আমার শুধু শেষ একটা অনুরোধ। আজ রাতে আমাদের সঙ্গে মিঠু খেয়ে যাক। বদরুল সাহেব ঘড়ির দিকে তাকান। তারপর বলেন, অবশ্যই। আপনারা আমার ছেলেকে এত বছর আদর-যত্নে মানুষ করেছেন। আর আমি এই অনুরোধ রাখব না। কোনো অসুবিধা নাই। আমাদের সবাইকে খাওয়াবেন তো! শরীফ রসিকতাটা ঠিক বুঝতে না পেরে বলেন, খাওয়াবো। খাওয়াবো। তিনি একটু পরে বাজার ব্যাগ হাতে বেরিয়ে যান। তার খুব ইচ্ছা মিঠু আজ তার সঙ্গে যাক। বাপ-ব্যাটা অনেক দিন বাজার করেছেন একসঙ্গে। বাজারে গিয়ে মিঠু শুধু মাংসের দোকানের সামনে হাঁটাহাঁটি করত। তাকিয়ে বলত, বাবা এই গরুটা বোধহয় খুব ভালো ছিল। দেখছ মাংসটা কেমন টকটকে লাল। শরীফের ইচ্ছা হত, এক কেজি মাংস কিনে ফেলেন। পারতেন না। বলতেন, বাবা যে গরুর মাংস লাল হয় সেটা খেতে ভালো হয় না। সামনের সপ্তাহে ভালো মাংস আসবে বাজারে... আজও যদি গিয়ে মিঠু বায়না ধরত! আজ অবশ্য বলা লাগত না। তিনি মাংস কিনবেন। ছেলেকে শেষবার খুব যত্ন করে খাওয়াবেন। সমস্যা হল তার পকেটে মাত্র ১৫ টাকা আছে। প্রথমে দুয়েক জায়গায়যেতে হবে টাকা ধার করার জন্য। পাবেন আশা করা যায়।না হলে কসাইয়ের পায়ে পড়ে বলবেন, ভাই আমার ছেলেটা আজচলে যাচ্ছে। আর কোনোদিন তাকে খাওয়াতে পারব কিনা জানি না! তুমি আমাকে এক কেজি মাংস দাও। এই ঘড়িটা বন্ধক রাখছি। টাকা পেলে ছাড়িয়ে নিয়ে যাব। বেরোনোর সময় শরীফ আবার মিঠুকে দেখেন। আচ্ছা মিঠুকি একটু কান্নাকটি জুড়ে দিতে পারত না। না আমি যাব না। তাহলে তিনি তাকে যেতেদিতেন না। জীবন দিয়ে আটকাতেন। কিন্তু ছেলেটা যেতে চায়। যাক। ওখানে কত আরামে থাকবে। কত কিছু খাবে। কত পড়াশোনা করবে। বেরোনোর সময় সাহস করে হঠাৎ বলে ফেলেন, যাবি নাকিরে মিঠু বাজারে! কাল পর্যন্ত যা ছিল আদেশ, আজ কযেক ঘণ্টায় ব্যবধানে সেটা মিনতিতে পরিণত হয়েছে। নিজের গলার স্বরটাকেই শরীফের অচেনা মনে হয়। মিঠু কিছু বলার আগেই বদরুল বলেন, না। থাক। ও বরং যাওয়ার প্রস্তুতি নিক।
শরীফ তবু ক্ষীণ আশা করেন, মিঠু বলবে না আমি বাবার সঙ্গে যাব। না। মিঠু কিছুবলে না। বদরুল বলেন, মিঠু তুমি তোমার বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নাও।আমরা খেয়েই রওনা দেব। এতক্ষণে মিঠু খেয়াল করে শফিক-রফিক-জনিরাও বসে আছেবসার ঘরে। কেমন যেন ভীত ভঙ্গি তাদের। মিঠুর সঙ্গেকথা বলার অধিকার রাখে কিনা সেটা নিয়েই যেন দ্বিধান্বিত। বদরুলের এই কথাটায় প্রাণ ফিরে আসে ওদের মধ্যে। একে অন্যের দিকে তাকায়। শফিক বলে, মিঠু চল। বাইরে যাই। মিঠু ওদের সঙ্গে বাইরে আসে। অন্ধকার নেমে এসেছে প্রায়। এই অন্ধকারে আরও অন্ধকার দেখায় ওদের চেহারা। কেউ কিছু বলে না। রফিক বলে, এই শফিক বল না কিছু। এই অনুরোধটা শফিককে করতে হয় না সাধারণত। অথচ আজ শফিকের মুখেও কথা নেই। বলে, আমি কী বলব? তোরা বল না! জনি বলে, মিঠু তোর সঙ্গে আর আমাদের দেখা হবে না। মিঠু একটু ভাবে। জানি না।শুনেছি আমার বাবা আমেরিকাথাকেন। বোধহয় আমরা আমেরিকা চলে যাব। তুই আমেরিকা চলে যাবি। বাবা নিয়ে গেলে তো যেতেই হবে। বাবার কথা শুনতে হবেনা। ও। রফিক বলে, আমাদের কথা মনে পড়বে না তোর। মিঠু একটু ভাবে। সত্যিই কি মনে পড়বে? সে-তো আসলে ভুলতে চায়। বলে, বুঝতেই পারছিস বিদেশে গেলে নতুন অনেক বন্ধু হবে। তাছাড়া শুনেছি ওখানে পড়াশোনার অনেক চাপ। জনি বলে, বলছিস কী! পড়াশোনা আর বন্ধুদের চাপেআমাদের কথা ভুলে যাবি? না। না। আমি মনে রাখার চেষ্টা করব। শফিক মনমরা গলায় বলে, না। থাক কষ্ট হলে মনে রাখার দরকার নেই। সবাই চুপচাপ। দূরে মসজিদের মোয়াজ্জিনকে দেখা যায়; ছুটে আসছে হন্তনন্ত হয়ে। রোজ সন্ধ্যায় তার কী যেন কী একটা কাজ থাকে। আজানের দেরি হয়। এসব সময়ে সাধারণত ওরা মোয়াজ্জিনকে দেরি করানোর জন্য নানা ফন্দি করে। একবার শফিক গিয়ে শুয়ে পড়ল ঠিক তার সামনে। হুজুর বললেন, সর এখান থেকে। আমি আজান দিতে যাব।দেরি হয়ে যাচ্ছে। আজানের আগে তো জান। আমি মরে যাচ্ছি। আমাকে একটা ফু দিয়ে যান। হুজুর খুব দ্রুত ফু দিতে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গেই আগেরপরিকল্পনামতো মিঠু বলল, হুজুর আমারও ফু লাগবে। আমাকেও দেন। হুজুর তাকেও দিতে গেছেন। এই সময়ই পাশের মসজিদ থেকেভেসে এল আজান। হুজুর সঙ্গে সঙ্গেই চিৎকার করে বললেন, আমার চাকরিটা আজ গেলো রে! বলে দিলেন এক দৌড়। আর ওরা দিল হাততালি। আজও তেমন কিছু করার একটা সুযোগ। কিন্তু সেদিকে মন নেই কারো। মোয়াজ্জিন ঠিক সময়মতো পৌঁছে যান আজান দিতে। জনি বলে, শেষ একবার জিলিপিখাবি নাকিরে মিঠু। মিঠু বলে, না। আমি হোটেলে মিষ্টি খেয়েছি অনেক। তাছাড়া এসব জিলিপি খেলে পেটে সমস্যা হতে পারে। ঢাকায় তো আর পেটে সমস্যা নিয়ে যাওয়া যায় না। শফিক হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলে বলে, শিউলিদের বাসার সামনে দিয়ে একটা চক্কর দিয়ে আসবি নাকি? ওর সঙ্গেতো আর দেখা হবে না তোর। শিউলি মিঠুর দুর্বলতার জায়গা। একদিন বৃষ্টির সময়ওরা এক ছাতার নীচে করে বাসায় ফিরেছিল বলে শিউলিরসঙ্গে মিঠুর নাম জড়িয়ে শফিকরা ওকে ক্ষ্যাপায়। মিঠু প্রতিবাদ করলেও খুব উপভোগ করে। মিঠু কী যেন ভাবে একটু। তারপর বলে, না থাক। শফিকরা একটু অবাক। শিউলিরবাসার সামনে ঘোরাঘুরিরত অবস্থায় পরশুদিনও মিঠু ধরা পড়েছে, অথচ... মিঠু বলে, ওকে বলে দিস আমিচলে গেছি। বলব। বলিস। আমার বাবার গাড়ি আছে। তা-ও বলব। আমাকে সেদিন খুব শোনাচ্ছিল ওর মামার নাকি গাড়ি আছে। ঠিক আছে বলব বলব। ঠিকঠাক বলিস। একটা নয়, আমাদের তিনটা গাড়ি। আচ্ছা। এরপর আর কথা ঠিক জমে না। মিঠুকে ওদের দূরের কেউ মনে হয়। এক লাফে সে যেন এমন জায়গায় চলে গেছে যেখানে তাকে দেখা যাচ্ছে কিন্তু আর ছোঁয়া যাচ্ছে না। শফিক চলে যাওয়ার সময় হঠাৎপকেট থেকে একটা কলম বের করে বলে, এই কলমটা তুই আমার কাছে চেয়েছিলি। আমি দিতে চাইনি। নিয়ে নে। মিঠু বলে, লাগবে না। জানি লাগবে না। তোর বাবা চাইলে তোকে পুরো কলমের দোকান কিনে দিতে পারে। তবু আমি দিতে চাই। তোর মনে না থাকলেও আমাদের তোকে মনে থাকবে। শফিক চোখ মুছতে মুছতে অদৃশ্য হয়ে যায়। জনি-রফিকআরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। আরও কিছু বলার চেষ্টা করে। পারে না। ফেরার পথে কলমটা দেখে মিঠু। সত্যি এই কলমটা তারখুব পছন্দ হয়েছিল। শফিকেরবাবা ঢাকা থেকে এনেছিলেন।শফিক বলছিল, এরকম নাকি এক ডজন এনেছেন বাবা। একেক মাসে সে একেকটা দিয়ে লিখবে। মিঠূ বলেছিল, বাহ তোর ১২টাকলম। একটা আমাকে দিয়ে দে না। শফিক বলল, না। দেয়া যাবে না। জনি পরে টিফিন পিরিয়ডে ওকে কলের তলায় নিয়ে গিয়ে কানে কানে বলল, আরে কিসের ১২টা। ওর বাবা একটা মাত্রকলম এনেছে। এখন তোকে দেয় কী করে! চাপা মেরে ধরা পড়েগেছে। আজ সেই মহামূল্য কলমটা তার কাছে। কিন্তু এখন আর ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। মিঠুঢিল মেরে কলমটা ফেলে দেয়।এমন কত কলম তার জন্য অপেক্ষা করে আছে ঢাকায়। বাসায় ফিরে দেখল, রান্নার তুমুল আয়োজন চলছে। প্রতিদিন রান্নার সময় হলেই ফুফুর বাতের ব্যথা ধলে। আজ ব্যথা নেই। তিনি রান্নায় শরীক। এমনকি বাবাও অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে। মিঠু ফিরতেই বদরুল বললেন, বসো। একটা ছোট্ট কাজ সেরেনেই। কাজটা সারার জন্য শরীফকে ডাকা হলো। তিনি বসলে, মিঠুর বাবা একটা কাগজে কীযেন লিখে বললেন, দেখুন তো এই টাকায় হবে কি-না! কিসের টাকা? আপনারা আমার ছেলেকে এতদিনআপনাদের কাছে রেখেছেন। একটা খরচ হয়েছে না! ১০ লাখটাকা দিলাম। হবে। শরীফ চেকটা ভালোমতো দেখে বলেন, না। হবে না। হবে না? না। ২০ লাখ। বদরুল একটু হেসে আরেকটা চেক লিখে বলেন, ২৫ লাখ টাকা দিলাম। এর মধ্যে ২০ লাখ আপনার। সবচেয়ে ছোট ভাইকে দেবেন ১ লাখ। আর দু লাখ পাবে আরিফ, ওকে আমার লোকেরা মারধর করেছে। আর বাকি ২ লাখ? শরীফ কেমন যেন একটু কৌতুহলী। ওটা আপনার বোনের জন্য। ও। শরীফ চেকটা একটু উল্টে-পাল্টে দেখেন। বদরুল মিঠুর দিকে তাকান। যার অর্থ তোমার ওপর আর কারো কোনো অধিকার নেই। আমি সব টাকা দিয়ে কিনে নিলাম।
মিঠু দেয়ালে ঝোলানো তার ছবিটার দিকে চেয়ে থাকে প্রায়ই। এ-কি সেই মিঠু। সেই মিঠু যে পরীক্ষার ফিসদিতে পারেনি বলে একবার গতবছর হাফ ইয়ারলি পরীক্ষাদিতে পারেনি। কিংবা সেই মিঠু যে বাজারের টাকা থেকে ৫ টাকা বাঁচিয়ে মিষ্টি খেয়েছিল বলে মা তাকে মারতে মারতে বলেছিলেন, তুই চোর। তোর পুরো গোষ্ঠী চোর। এই ছবিটার দিকে তাকালে মিঠুর কেন যেন শুধু দারিদ্র্যের স্মৃতিসূচক ঘটনাগুলোই মনে পড়ে শুধু। চেষ্টা করেও সে ভালো কিছুমনে করতে পারে না। মিঠু অবশ্য খুব মনেও করতে চায় না। এই ছবিটা তোলা হয়েছিল মিঠু এখানে আসার দুই দিন পর। মিঠুর বাবা আলম গ্রুপঅব ইন্ডাস্ট্রিজ এর মালিকবদরুল আলম তার হারানো ছেলেকে ফিরে পাওয়া উপলক্ষে একটা পার্টির আয়োজন করেছিলেন। সেই উপলক্ষে মিঠুর জন্য বিশেষপোষাক তৈরি হল। পোষাক বলতে স্যুট-টাই। শরীফের পুরনো একটা কোট ছিল, শীত আসলে তিনি সেটা পরতেন। আরতাদের হেডমাস্টার কেউ স্কুল ইন্সপেকশনে আসলে পরতেন একটা পুরনো টাই। মিঠু তাই জানত কোট হচ্ছে শীতের কাপড়, টাই হলো স্কুলইন্সপেকশনের দিনে পড়ার জিনিস। কিন্তু এখানে এসে জানল, পার্টি হচ্ছে স্যুট পরতে হয়। টাই ঝোলাতে হয়। এবং যার জন্য পার্টি দেয়াহয় তাকে নতুন স্যুট পরতে হয়। মিঠুর জন্য বানানো হল৬টা স্যুট। তার মধ্যে কোনটার আগে কোনটা পরবে মিঠু সেটাই ভেবে ঠিক করতেপারল না। পৃথিবীতে এত সুন্দর জামা-কাপড়ও আছে। আচ্ছা এগুলোর দাম কত? মিঠু মাকে জিজ্ঞেস করল। মা বললেন, এগুলো নিয়ে তোমার ভাবার দরকার নেই। না। এমনি জানতে চাচ্ছিলামআর কি? কত আর হবে। সব মিলিয়ে লাখখানেক হবে হয়ত। লাখখানেক! শুধু কাপড়ের জন্য লাখখানেক! সোহেলের কাছ থেকে জানা গেল, লাখখানেক নয়। সব মিলিয়ে পড়েছে আড়াই লাখ! এত টাকা! সোহেল বলল, স্যার বলেছিলেন মার্কেটের সেরা কাপড় দিয়ে যেন তৈরি হয়। আমার বাবার কত টাকা? সোহেল হাসল। বলল, এত টাকা যে সেগুলোকে যদি এক টাকারনোট করে তোমাকে গুনতে দেয়া হয় তাহলে তোমার সারাজীবন লেগে যাবে। পার্টির দিনে দুপুরে দুজনলোক এসে মিঠুকে নিয়ে গেল একটা জায়গায়। যাওয়ার আগে মিঠু জানল, তার নাকি ফেসিয়াল করানো হবে। ফেসিয়াল কি? মাকে জিজ্ঞেসকরলে হত। কিন্তু মা নাকি বিউটি পারলার বলে একটা জায়গায় গেছেন। সেখানে তারকয়েক ঘণ্টা লাগবে। পার্টির দিনে মহিলাদের বিউটি পারলারে গিয়ে সেজে আসার নিয়ম আছে। কাজেই মিঠু চলল ফেসিয়ালে।গিয়ে দেখল সেটা সেলুনের মতো একটা জায়গা, কিন্তু তাকে সেলুন বলতে নিজেরই খারাপ লাগে। সামনের একটা চেয়ারে বসতেই চলে এল কফি।এই নামে একটা তিতা জিনিস বড়লোকেরা খুব আয়েশ করে খায়। প্রথমদিন খেয়ে মিঠুরপ্রায় বমি চলে এসেছিল, কিন্তু এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। সে লক্ষ্য করেছে বড়লোকেরা শুধু যে সুস্বাদু খাবার খায় তা নয়,তারা কিছু অখাদ্যও এমনভাবে খায় যেন এর চেয়ে মজাদার কিছু হতেই পারে না। কফি খাওয়া শেষ হলে একজন এসে তাকে স্যার বলে নিয়ে গেল ভেতরে। সেখানে একটা চেয়ারে বসানোর পর তার মুখধোয়া হল এমনভাবে যেন রাজ্যের ময়লা এসে জড়ো হয়েআছে ওখানে। একদিনেই সব ধুয়ে ফেলার দায়িত্ব ওদের।তবে কাজটা করল বটে। শেষ হলে মিঠু নিজের চেহারার দিকে তাকিয়ে অবাক। তার চেহারা এত সুন্দর। মিঠু জানল বড়লোকদের সৌন্দর্য্যের রহস্য। পার্টিতে হাসিহাসি মুখে মিঠুকে দাঁড়িয়ে থাকতে হল প্রায় তিন ঘণ্টা। বাবার দেশী-বিদেশী অনেক বড়লোক বন্ধু এলেন। মিঠুর সঙ্গে হাত মিলিয়ে বেশিরভাগই ইংরেজিতে কী কী সব বললেন, মিঠু বুঝতে পারল না, কিন্তু সে এমন ভাব করে থাকল যেন সব বুঝতে পারছে।ইতিমধ্যে এই শিক্ষাটা তাকে দেয়া হয়েছে কীভাবে না বোঝা বিষয়ে বোঝার ভান করতে হয়। সে এই কয়দিনে শিখেছে বড়লোকদের ভাণ্ডারে নানারকম হাসি আছে। আছে সেগুলোর বহুবিধ ব্যবহার প্রণালী। একেক সময় একেকটা হাসি দিতে হয়। এ উপলক্ষে গানের ব্যবস্থাও ছিল। একজন মোটামতো গায়ক বিশাল বিশালসব জিনিসপত্র নিয়ে এসে দুনিয়া ফাটিয়ে গান গাইল। প্রত্যেকটা গানের আগে আবার সে একটু করে বক্তৃতাদেয়। একটা বক্তৃতা‌য় জানাগেল, এই গানটি নাকি লেখাই হয়েছে মিঠুর বাড়ি ফিরে আসা নিয়ে। মিঠুর ফিরে আসানিয়ে যদিও, কিন্তু তাতে মিঠুর নাম পর্যন্ত নেই। কিংবা হয়ত আছে, মিঠু শুনতেপায়নি। সত্যি বললে গানের কথাগুলো একটুও বুঝতে পারেনি সে। কিন্তু দেখল স্রোতারা সব মুগ্ধ। পার্টি শেষ হল গভীর রাতে।আর পরদিন সকালেই দেয়ালে ঝুলল তার এই ছবি। ক্যামেরাম্যান ছিল, ছিল ভিডিও করার ব্যবস্থাও। এরকোন ফাঁকে এত সুন্দর ছবিটা উঠে গেল মিঠু বুঝতেপারেনি। তা যাই হোক, ছবিটাপ্রতিদিন মিঠু একটু একটু করে দেখে। আর ভাবে ইস শফিকদের যদি দেখানো যেত! মিঠুর এখানে সবকিছুই খুব ভালো লাগছে। একটাই শুধু সমস্যা। দেখানোর কেউ নেই।ওরা স্কুলে কিছু একটা করতই অন্যদের দেখানোর জন্য। এখানে সেই মানুষই নেই। আজ যখন ছবিটা খুব মন দিয়ে দেখছিল, তখন মা এসে পাশে দাঁড়ালেন। বললেন, বাবা ছবিটা তোমার খুব পছন্দ হয়েছে। না! হয়েছে মা। আমরা যখন সামনের মাসে নিউইয়র্ক যাব তখন আরও অনেক সুন্দর জায়গায় তোমাকে নিয়ে যাব। ওখানে আরও চমৎকার সব ছবি তুলব তোমার। আচ্ছা মা। এই কয়দিনে মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক অনেক স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সত্যি বললে এখন মিলিকে তার মা ডাকতে একটুও অসুবিধা হয় না। কিন্তু বাবাকে বাবা ডাকতে কেমন যেন লাগে। বাবারা কি সবসময় একটু দূরের মানুষ থাকেন! হঠাৎ করে মিলি বলল, তোমাকেআমরা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেব। কিন্তু তার আগে কিছুদিন তোমাকে ইংরেজি শিখতে হবে। ইংরেজি তো আমি জানি। এই ইংরেজি তে হবে না বাবা। তোমাকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি হতেহবে। সেরকম ইংলিশ শিখতে হবে। আজ সন্ধ্যা থেকেই একজন শিক্ষক আসবেন তোমাকেইংরেজি শেখাতে। আর... আর তোমার কিছু কাজিন আসবে। কাজিন মানে কি চাচাত ভাই.... হ্যাঁ। চাচাত-খালাত ভাই বোন। ওরা সবাই ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। ওদের সঙ্গেতুমি ইংরেজিতে কথা বলা প্র্যাকটিস করবে। মিঠু খুশি হল। এই কয়দিনে সব পেয়েছে, শুধু সমবয়সী বন্ধুদের অভাব টের পাচ্ছিল। এবার সেই সমস্যাও বোধহয় আর থাকবে না।
বিকালে কাজিনের পরিচয় নিয়ে যে কয়েকজন এল তাদেরকে মিঠু প্রথমটায় চিনতে পারেনি। একজনকে অবশ্য এখনও চেনা যাচ্ছে না। তার চুলের পেছনে ঝুটিবাঁধা। সে কথা বলে মেয়েদের মতো। তার চেহারায়ও একটা সুস্পষ্ট মেয়েলি ভাব। শফিক পাশে থাকলে তার জানটা খেয়ে ফেলত। ঝুঁটিটাকেটে দেয়ার একটা ফন্দিও হয়ত হত। মিঠুরও দুষ্টুমিরইচ্ছা হচ্ছিল। কিন্তু মিঠু এই কয়দিনে বুঝতে পেরেছে দুষ্টুমি একা একা করা যায় না। শফিক-জনি জাতীয় বন্ধুদের লাগেই। আরেকজন আছে। তার প্যান্টটা এত লম্বা যে দেয়ালের ধুলা-ময়লা সব পরিষ্কারের দায়িত্ব যেন তার। মিঠু জিজ্ঞেস করল, এই তোমার প্যান্ট এত লম্বা কেন? ছেলেটি চেঁচিয়ে কী যেন বলল বাকিদের। ওরা সংখ্যায়চারজন। শুনে এমন হাসতে লাগল যে মিঠু খুব লজ্জা পেল। এই সাধারণ প্রশ্নে এত হাসির কী আছে ঠিক বুঝল না। ওদের ভাষাটাও কেমন যেন। ইংরেজি বলে চমৎকার, কিন্তু তার সঙ্গে যে বাংলাটা বলে এর কোনো মাথা-মুণ্ডু নেই। একজন হঠাৎ মিঠুকে বলল, মিঠু। ডু ইউ হ্যাভ অ্যানিসেক্স এক্সপেরিয়েন্স? কথাটার অর্থ মিঠু বুঝতে পারল। এসব নিয়ে যে তাদের মধ্যে হাসি-তামাশা হয় না এমন নয়, তাই বলে হঠাৎ অর্ধচেনা একজনকে এমন প্রশ্ন করা যায়। কিন্তু ওরা সবাই খুব কৌতুহলী। মিঠু মাথা নাড়ল। ঝুঁটিবাধা জন বলল, বলো কি আমরা তো শুনেছিলাম রুরাল প্লেসে ১০-১২ বছর বয়সেই এই এক্সপেরিয়েন্স হয়। মিঠু হঠাৎ কী ভেবে পাল্টাপ্রশ্ন করল, তোমাদের ওটা আছে? সবাই হা-হা করে হাসল যার মানে হতে পারে তুমি এত বোকা যে এই প্রশ্ন করছ। আবার হতে পারে যে, প্রশ্নইওঠে না। আমরা তো আর রুরাল প্লেসের মানুষ না। ওদের সব হাসির ভাষা মিঠু এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। একজন হঠাৎ বলল, মিঠু কিন্তু হ্যান্ডসাম আছে। গার্লস উইল লাইক হিম। ওকেস্কুলে নিয়ে গেলে কেমন হয়! বাকিরা খুব হাসল। এই হাসির মানেও মিঠু ঠিক বুঝতে পারল না। রাতে মা জিজ্ঞেস করলেন, কাজিনদের তোমার কেমন লাগল। মিঠু চুপ করে থাকল। মা বললেন, বুঝতে পারছি। পছন্দ হয়নি। মিঠু এবারও কিছু বলল না। মা একটু ভেবে বললেন, সময় লাগবে। বুঝলে একটু সময় লাগবে। মিঠুর অবশ্য একটুও মনে হচ্ছে না এই বিচিত্র চেহারার ছেলে-মেয়েগুলোকেতার কোনোদিন ভালো লাগবে। মা কী যেন বুঝে বললেন, চলোএখন আমরা একটা সিনেমা দেখি। ঘরের মধ্যেই সিনেমা দেখারব্যবস্থা। সিডিতে তারাও সিনেমা দেখেছে বটে, কিন্তু এখানে বড় পর্দায় ঘর অন্ধকার করে একেবারে সিনেমা হলের মতো সিনেমা দেখার ব্যবস্থা। আর হাজার-হাজার ছবির সিডি। মিঠুরও সিনেমা দেখতে খুব ইচ্ছে হয়। কিন্তু তার পছন্দের কোনো ছবি এখানে নেই। এরা দেখে সব ইংরেজি ছবি। একটাও হিন্দি ছবি নেই। মিঠু বলল, মা শাহরুখ খানেরকোনো ছবি নাই। মা একটু ভেবে বললেন, না। ঠিক আছে কাল আনিয়ে দেবো। তবে তোমার ইংরেজি ছবিই দেখা উচিত। ইংরেজি শেখাও হবে। একটা ইংরেজি ছবি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছিল মিঠু। কিন্তু সকালে যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন সে তার বাসায় নেই। অন্য কোথাও যেন। মিঠু ঘর থেকে বেরোতে গিয়েদেখল ঘর বন্ধ। সে ধাক্কাধাক্কি করল খুব জোরে। কেউ শব্দ করে না। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল, বাইরের ঘরে দুজন লোক নীচুগলায় কথা বলছে। একজনকে সেচিনতে পারে। সোহেল। কিন্তু সে এখানে কী করে এল! পরদিন সে কোথায় যাবে এটা তো আগেরদিনই ঠিক থাকে। ঘুমের মধ্যে তাকে এখানে তুলে নিয়ে এল কে? আর সোহেলই বা এখানে কী করছে? আবার জোরে দরজা ধাক্কা দেয় সে। দরজা বন্ধ। তাকে দরজার ভেতর আটকে রেখে সোহেল বাইরে কার সঙ্গে কথা বলে? বিষয়টা কী!
৪নং ছবি
শরীফের সঙ্গে সালমা কথা বন্ধ রেখেছেন। সালমার অভিযোগ শরীফ টাকার বিনিময়ে তার ছেলেকে বিক্রি করে দিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে শরীফের কোনো বক্তব্য নেই। বদরুলের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা নেয়ার পরদিন তিনি ব্যাংক থেকে ৫ লাখ টাকা আরিফ, তারিফ এবং বোন আলেয়ার পাওনা বুঝিয়ে দেন।তার ২০ লাখ টাকা কোথায় কেউ জানে না! টাকাটা পেয়ে তারিফ খুব খুশি। বলল, লোকটা বিশিষ্ট ভদ্রলোক। আমাদের মিঠু খুবভালো থাকবে। মিঠু আর আমাদের না। শরীফ ভারী গলায় বলেন। সেটা ঠিক আছে। কিন্তু যাইবলো এরকম পয়সাওয়ালা লোক যে সাহিত্যরসিক হবে আমি ভাবতেই পারিনি। এক কথায় আমাকে এক লাখ টাকা দিয়ে দিল। এর ছোট ভাইদের কী মজা! যা চায় তাই পায়। বোন আলেয়া ২ লাখ টাকা পাওয়ার পর থেকে খুব চিন্তায়। কীভাবে এই টাকারসদ্ব্যয় করা যায় সেটা ঠিককরতে পারছেন না। শরীফকে প্রথমে বললেন, টাকাটা ব্যাংকে রাখাই ভালো। কী বলো ভাইজান! তা রাখতে পারিস। কিন্তু ব্যাংকে তো সুদ খুব কম। মাসে মাত্র ২ হাজার টাকা পাওয়া যায়। তাও ঠিক। তাহলে বরং এক কাজ করি। টাকাটা কোনো ব্যবসায় খাটাই। মাসে অন্তত ৫ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। তাও করতে পারিস। শুধুমাত্র আরিফ টাকা নিল না। চিৎকার করে বলল, আমি গুণ্ডাপাণ্ডা মানুষ। মানুষকে ঠকিয়ে আমি টাকা বানানোর চেষ্টা করি। ঠিক আছে। তাই বলে আমার ভাতিজাবিক্রির টাকা আমি নেব। বিক্রির টাকা হবে কেন? বিক্রির টাকা না তো কি! আমি প্রস্রাব করি অমন টাকায়। মুখে অনেকেই টাকায় প্রস্রাব করার কথা বলে বটে, কিন্তু আজ পর্যন্ত এইকাজ করতে দেখা যায়নি কাউকে। আরিফ মনে হয় সত্যিসত্যিই করে দিত। শরীফ বিষয়টা বুঝে ওর সঙ্গে টাকা নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করতে যাননি। বাড়াবাড়ি যা করার তা করছেআলেয়া। সন্ধ্যাবেলাতেই দেখা গেল বাসায় দুজন লোক।একজন বাজারের কুখ্যাত সুদের ব্যবসায়ী। আরেকজনকে তিনি চেনেন না। দুজনের সঙ্গে নিজের ঘরে ফিসফাস অনেক্ষণ কথা বলল আলেয়া। কথার ফাঁকে বেরিয়েএসে বলল, ভাইজান একটা পরামর্শ দাও তো। কী পরামর্শ? সুদে খাটালে মাসে পাওয়া যাবে ৬ হাজার টাকা। তাহলে সুদে খাটাও। কিন্তু এই টাকা দিয়ে যদি একটা সিএনজি কিনে ফেলি... কিনে ফেল। ভাইজান তুমি তো কোনো পরামর্শই দিচ্ছ না। আমি যা বলি তাতেই মাথা নাড়াও। শরীফ দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। একটু পর শোনা যায় ভেতরের ঘরে তুমুল ঝগড়ার শব্দ। আরিফ ক্ষেপে গিয়ে বলছে, তুমি সুদের ব্যবসায় নামতেচাও। মিঠুকে বিক্রির টাকাদিয়ে তোমরা স্বপ্ন দেখছ। লজ্জা লাগছে না তোমাদের! আলেয়া কিছু একটা যুক্তি দিতে চান। আরিফের তাণ্ডবের কাছে পাত্তা পাওয়ার প্রশ্ন নেই। আরিফ চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার সময় তারিফের টেবিল থেকে কিছু বই ফেলে দেয়। তারিফও তার টাকা দিয়ে বই কিনতে শুরু করেছে। শরীফ বাধা দিয়ে বলেন, বইপত্র এভাবে ফেলা ঠিক না। ঠিক না! না। আমার মিঠুকে বিক্রির টাকাদিয়ে তোমরা সবাই মচ্ছব করবে আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখব। হবে না। আমি হতে দেব না। শরীফ একটু অবাক হন। অপদার্থ আরিফের মধ্যে মমতার এই ছায়া দেখে তিনি বিস্মিত। এই ভালোবাসার খবর কি মিঠুর কাছে কোনোদিন পৌঁছাবে। আরিফ চলে গেলে তিনি নিজেরঘরে ঢুকেন। মিঠুরা চলে যাওয়পার পর সালমার সঙ্গে তার খুব ঝগড়া হয়। তারপর থেকে কথা বন্ধ। সালমার রাগটা তিনি ভাঙ্গাতে খুব চেষ্টা করছেন। নিজে থেকে যেচে কথা বলছেন। কিন্তু সালমার কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। ঘরে ঢুকে বললেন, আচ্ছা শোনো তোমার কি ধারণা আমি তোমার চেয়ে কম কষ্ট পাচ্ছি? সালমা চোখ বড় করে তাকান শুধু। আমার দুঃখ কারো চেয়ে কম নয়। তাছাড়া আমি তো তাকে যেতে দিতে চাইনি। তুমি বলাতেই না.... টাকা নেয়ার সময় তো আর তুমি আমার পরামর্শ নাওনি? তা অবশ্য নেইনি। টাকাটা কেন নিলে বলো? কেন? আমাদের টাকার দরকার আছে না! তাই বলে ছেলেকে বিক্রি করে... বিক্রি করলাম কোথায়? ছেলেতার বাবা-মার কাছে ফিরে গেছে। তাহলে কি তুমি এই আশায় মিঠুকে নিয়ে এসেছিলে যে একদিন ওর বাবা-মা আসবে এবং তাদের কাছ থেকে তুমি অনেক টাকা পাবে। তোমার তাই মনে হয়? আমার মনে কী হয় সেটা পরে তুমি আমার কথার জবাব দাও। সেই লোকটা যদি আমাদের কাছথেকে আমাদের ছেলেকে কেড়ে নিতে পারে তাহলে আমরা তারকাছ থেকে টাকা নিতে পারি। এই সময়ই হঠাৎ হৈ-চৈ শোনা যায় বাইরে। কাদের যেন পায়ের শব্দ। একটা গাড়ির হর্নও আসে। শরীফ বেরোতেই একজন এসে সোজা তার কলার চেপে ধরে। বলে, টাকা কোথায় টাকা? কিসের টাকা? অন্ধকারে শরীফ চেহারাটা ঠিক চিনতে পারেন না। তবে বুঝতে পারেন তার পকেটে গুরুতর অস্ত্র আছে। এবং তারা তার ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত। শরীফ বলেন, আপনারা কি বদরুল সাহেব যে টাকাটা দিয়েছেন সেটা চাইছেন। এইতো এবার লাইনে এসেছো? সেই টাকাটাই। টাকার কিছু তো খরচা হয়ে গেছে। এর মধ্যে খরচও করে ফেলেছো। কত খরচ করেছো? ৫ লাখ! বলো কি, এক সপ্তাহের মধ্যে৫ লাখ খরচ করে ফেলেছ? উনি আমার ভাইবোনদের এই টাকা দিয়েছিলেন। সেগুলো আমি তাদেরকে দিয়ে দিয়েছি। তোমার কাছে যে ২০ লাখ ছিল,সেটা!
আছে। নিয়ে আসো। ঠিক আছে আমাকে ছাড়ুন। আমিএনে দিচ্ছি। শরীফ ঘরের দিকে রওনা দেন।ঠিক তার পিছু-পিছু আসে দুজন। ওরা সতর্ক চোখে সবাইকে পর্যবেক্ষন করে। উদ্যত অস্ত্র, যে কোনো চাতুর্যের চেস্টা বানচাল করে দিতে তৈরি। শরীফ একটু সময় নিলেন। ভেতরে তার জরুরী কাগজপত্রের একটা স্যুটকেস আছে। সেটা হাতড়ালেন কিছুক্ষণ। লোক দুটো ধৈর্য্য দেখাল।একটুও তাড়া না দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল। অপেক্ষা শেষ হল যখন শরীফ বললেন, এই নিন আপনাদের টাকা। লোক দুটো চেকটা নিয়ে গভীরভাবে পরীক্ষা করল। চেকে কোনো ঝামেলা নেই তো! প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে চেকটা নিয়ে এসে ওদের দলনেতা গোছের লোকটির হাতেদিল। লোকটি ওটা হাতে নিয়েউল্টেপাল্টে দেখে বলল, গুড। আমি খুশি হয়েছি। চলো। ওরা রওনা হতে শরীফ মিনমিনগলায় বলল, আপনাদের পরিচয়টা যদি জানতে পারতাম। পরিচয়! দলনেতাটি একটু হেসে বলে, আমাদের পরিচয় জেনে কী লাভ! মামলা করবে। লোক লাগাবে আমাদের পেছনে! না। এমনিই জানতে চাইছিলামআর কী! জানবে। সময়মতো জানবে। ওরা যেমন ঝড়ের মতো এসেছিলতেমনি ঝড়ের মতো বিদায় হয়।একটা কাজ অবশ্য হয় তাতে। সালমা কথা বলা শুরু করেন তার সঙ্গে। তাকে ঘরে নিয়ে যেতে যেতে বলেন, ভালোই হয়েছে। এই টাকা যত থাকত তত আমাদের বিপদ বাড়ত। কিন্তু লোকগলো কে? তুমি এত বোকা? বুঝতে পারছনা এরা কারা? কারা? বদরুলের লোকজন। বলছ কি? তাহলে আর কী! উনিই তো টাকাটা দিয়ে গেলেন। আমরা তো চাইনি। সেদিন তার দরকার ছিল ছেলেটাকে নিয়ে যাওয়া। আমরা যাতে কোনো সমস্যা নাকরি...। এখন তো ঝামেলা শেষ। তার ছেলে যখন তখন আমাদের আর ঝামেলা করার সুযোগ ছিলকোথায়? ঝামেলা তো আমরা করতে পারতাম না। আমরা গরীব, শেষপর্যন্ত হয়ত পেরে উঠতাম না, কিন্তু দেরি তো করাতে পারতাম। বিচার বসাতে পারতাম। হেডমাস্টার ছাড়া তো আর কোনো প্রমাণ ওদের কাছে ছিল না। তাহলে এখনই বা এই ঝামেলারদরকার কী! ওদের কত টাকা। ঠিক এই সময়ে আরেকবার গাড়ির শব্দ বাইরে। আরও সশব্দ। আরও বেশি উত্তেজনা। শরীফ বেরোনোর আগেই তারা ঘরে ঢুকে গেল। বদরুল সোজা ঘরে ঢুকে বললেন, মিঠু কোথায়? মিঠু কোথায়? মিঠুর কি হয়েছে? সালমা বলেন। সোহেল ধমক দিয়ে বলে, নাটক করবে না। বলো ছেলে কোথায়? সালমা গলা চড়িয়ে বলে, ছেলেকোথায় মানে? আপনারা না সেদিন নিয়ে গেলেন। বদরুল সোহেলকে ইঙ্গিতে থামিয়ে বলেন, দেখেন যদি আপনাদের মনে হয় টাকা কম হয়েছে তাহলে আরও দেব। কিন্তু মিঠু... মিঠুর কী হয়েছে? আমার মিঠুর কী হেয়েছে? গর্জে উঠেন সালমা। বদরুল গলার স্বর একটু নামিয়ে বলেন, মিঠুকে আজ সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। ওর ঘরেই সে ঘুমিয়েছিল,কিন্তু সকাল থেকে নেই। সারাদিন খোঁজ করা হয়েছে। শেষে ভাবলাম এমনও তো হতে পারে যে মিঠু হয়ত আপনাদেরসঙ্গে দেখা করতে... সোহেল বলল, অবশ্যই এখানে এসেছে। ওরা সেদিন যখন ওকেএত ভালোয়-ভালোয় দিয়ে দেয় তখ নই আমার সন্দেহ হয়েছিল। কেমন টাকাটাও নিয়ে নিল! ২০ লাখ টাকাও পেল। তারপর ছেলেকে এভাবে ফিরিয়ে এনে... শরীফ বললেন, কিন্তু টাকাটা যে নিয়ে গেল একটু আগে। টাকা নিয়ে গেল মানে! বদরুল একটু অবাক হন। একটু আগে কয়েকজন লোক এসে টাকাটা নিয়ে গেল। আমরা তোভেবেছিলাম আপনার লোকই... সোহেল কিছু বলতে চায়। বদরুল তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, চিন্তার কথা তো! কী বলল তারা! তেমন কিছু্‌ই বলেনি। কিন্তু হাতে অস্ত্র ছিল। তাই... সোহেল কিছু একটা বলতে চায়। বদরুল তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, দাঁড়াও একটু ভাবতে দাও তো! সোহেল বলল, স্যার এরা যে সত্য কথা বলছে তার কী প্রমাণ? আপনি যতটা সহজ ভেবেছেন এরা অতোটা সহজ নয়। সোহেল! এদেরকে যে আমি টাকা দিয়েছি সেটা আমাদের লোক ছাড়া আর কেউ জানে না। তার মানে...। তার মানে... সোহেল বলে, স্যার আমরা বোধহয একটু ভুল করছি। এতক্ষণ ভুল হয়েছে। মিঠুকেযে কেউ আমার বাড়ি থেকে কিডন্যাপ করতে পারে এটা আমার মাথায়ই আসেনি। আমার বাড়ি থেকে কেউ নিয়ে গেছে এবং সে জানে কিছুদিন আগে আমি এদেরকে ২০ লাখ টাকা দিয়েছি। তার মানে নিজেদেরলোক। নিজেদের লোক! চলো। উঠে দাঁড়ান বদরুল। সালমা বলেন, আমরাও যাব আপনার সঙ্গে। বদরুল ওদের দিকে না তাকিয়েই বলেন, চলুন।
৬নং ছবি
১০
মিঠুকে যে আটকে রাখা হয়েছে সেটা বুঝতেই মিঠুর পুরো দিন পেরিয়ে গেল। গত কয়েকদিন তার জীবনে স্বপ্নের মতো সব ঘটনা ঘটছে এবং সবগুলোই তার অনুকুলে। মিঠু ভেবেছিল এটাও তেমন কিছু, তাকে এখানে নিয়ে আসা তেমনি একটা ব্যাপার। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে অবাক করে হাজির হবেন বাবাকিংবা মা, জানা যাবে এর পেছনে তাদের বড়লোকি কোনো কারবার লুকিয়ে আছে। দুপুরের দিকে প্রথম তার সন্দেহ হল যখন দেখা গেল তাকে খাবার হিসেবে দেয়া হয়েছে ডাল-ভাত। খাবারটা দেখেই রাগ হল মিঠুর। বলল, এটা কি খাবার? খাবার দিতে যে এসেছিল সে মুখ ভ্যাংচি দিয়ে বলল, ও। তুই তো আবার এর মধ্যে বড়লোকের ছেলে হয়ে গেছিস। মাত্র সপ্তাহখানেক যদিও, কিন্তু এর মধ্যেই ভালো খাবারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে। তার চেয়েও বড় কথা তাকে এখন আর তুই বলে না কেউ। এই যে এত ক্ষমতাধর সোহেল সে-ও পর্যন্ত তাকে সসম্ভ্রমে ডাকে, ভাইয়া বলে। মিঠু ক্ষেপে গিয়ে বলল, তুইতোকারি করছেন কেন? ও তোকে তো আবার আপনে করে বলতে হবে। এই সেলিম এদিকেআয় রে, আমাকে আদব-কায়দা শেখানো হচ্ছে। দেখে যা। সেলিম নামের একজন এসে বলল,কী করতে হবে বলেন। চড় না লাথি? তুই সবসময় আগে লাস্ট দৃশ্যে চলে যেতে চাস। অ্যাকশন সবসময় লাস্ট সিন। আমার আর কোনো সিন ভালো লাগে না। তাও দেখাও দেখি। এই বল না রে। বল তোকে কী করতে হবে। স্যার বলে ডাকতে হবে। মিঠু চিৎকার করে বলে, বেয়াদবি করবেন না। এর ফল ভালো হবে না। সঙ্গে সঙ্গেই সেলিম নামেরলোকটি তার গালে প্রচণ্ড জোরে একটা চড় বসায়। মিঠু ‘মাগো’ বলে চিৎকার করে মাটিতে পড়ে যায়। এবং তার সঙ্গে সঙ্গেই একটা অবাক ঘটনা ঘটে। মিঠু খেয়াল ‘মাগো’ বলার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখের সামনে যেমায়ের ছবি ভেসে উঠেছে সেটা একটুও মিলির ছবি নয়।সেটা সালমার ছবি। তার মফস্বল শহরের দরিদ্র এবং সদা ঝগড়াটে মা’ই যেন তার এখন ভরসা। ছবিটা সরিয়ে সেখানে মিলিকে বসাতে চেষ্টা করে সে। পারে না। মনে হয় তার জন্য কাঁদার সময় শুধু সালমারই আছে। আহারে, তারা হয়ত কোনোদিন খবরও পাবে না। মা না জানলে তার জন্য কাঁদবে। শরীফ না জানলে তার জন্য রাত জাগবে কে? লোকগুলো আরও কী কী যেন বলে। হাসে। হয়ত আবার মারবে। মিঠুর সেদিকে একটুও মন নেই। তার সামনে শুধু শরীফ আর সালমার ছবি।তার বাবা। তার মা। মিঠুর মনে হয় গত কয়দিনে যা হয়েছে তার সবই আসলে স্বপ্ন। ঘুম ভাঙ্গতেই সে শুনবে, মা বাবাকে ধমকাচ্ছে। এক টাকা রোজগারের মুরোদ নেই, আবার ভাই-বোন সবাইকে পিঠে নিয়েছেন। মহামানব। মিঠুর গালে হয়ত একটা চড় বসবে। নবাবজাদা এত বেলা পর্যন্ত ঘুম। হবি তো বাপ-চাচার মতো অকর্মা। মিঠু এখন এই চড়টা খেতে চায়। মিঠু এখন মায়ের গালিশুনতে চায়। তার জন্য ওকে এখান থেকে উদ্ধার পেতে হবে। আহা! শফিকটা থাকলে ঠিক একটা বুদ্ধি বের করে ফেলত। ওর এখন মনে পড়ে আসার দিন শফিকদের সঙ্গে সে খুব ভালো ব্যবহার করেনি। সুন্দর ভবিষ্যতের লোভ তাকে এমন গিলে ফেলেছিল যেঠিকঠাক বিদায়ও নিয়ে আসেনি। শফিক কী গভীর ভালোবাসায় একটা কলম দিয়েছিল, কলমটা ফেলে দিয়েছিল। শফিকদের কী আবারদেখবে! না। মিঠুকে এখান থেকে বেরহতেই হবে। আর তার জন্য মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। আগে বুঝতে হবে তাকে কারা এখানে নিয়ে এসেছে। মিঠু ধীরে ধীরে উঠে শফিকের একটা পরামর্শ মাথায় আসে। শফিক বলেছিল, যে যে কাজ করে সেটার প্রশংসা করলে নাকি সে খুশি হবেই। জনি জানতে চেয়েছিল, সেটা কীরকম? ধর। মা রান্না করে আমাদেরখাওয়ায়। এখন যদি তুই বলিসযে মা আজকের রান্নাটা খুবভালো হয়েছে তাহলে মা খুশিহবেই। স্যারকে যদি বলিস স্যার আপনার পড়ানোটা খুব ভালো হয় তাহলে সে যত কাঠখোট্টা স্যারই হোক খুশি হতে বাধ্য। মিঠু জানতে চেয়েছিল, আচ্ছা তা না হয় বুঝলাম কিন্তু বাবাদের খুশি করারউপায় কী! শফিক একটু ভাবনায় পড়ে বলল,বাবারা মূলত আমাদের মারধরের কাজটা করে। কাজেইএটা বলা যায় যে বাবা তুমি খুব ভালো মারতে পার। হাসির কথা। ওরা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিল। আজ হঠাৎ মনে পড়ে, আচ্ছা লোকটাকে যদি সে বলে যে চাচা তোমার চড়টা খুব ভালো হয়েছে তাহলে কেমন হয়! লোকটা কি খুশি হবে? সঙ্গে সঙ্গেই মিঠু বলল, চাচা আপনি যে চড়টা মেরেছেন সেটা খুব ভালো হয়েছে। জীবনে অনেক চড় খেয়েছি কিন্তু এত ভালো চড়এই প্রথম। বাহ! বাহ দারুণ সিন তো! খাবি নাকি আরেকটা? দেন। বলে মিঠু এমনভাবে গাল বাড়িয়ে দেয় যে লোকটা একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। বলে, থাক। থাক আরেকটাখেলে মরে যাবি। থাক। একটু থেমে লোকটা হঠাৎ বলে,তবে যাই বলিস জীবনে এই প্রথম কেউ আমার কাজের প্রশংসা করল। মিঠুর মনে হয় তার কাজ কিছুটা হয়ে গেছে। কিন্তু এখন এখানে থামতে হবে। এই লোকটিকে একা পেতে হবে। ‘তাহলে আমি এখন খাই’ বলে মিঠু সঙ্গে সঙ্গেই সাগ্রহে সেই ডাল-ভাত খেতেশুরু করল। খাওয়ার ফাঁকে চোরাচোখে চেয়ে দেখল সেলিমনামের অ্যাকশনে বিশ্বাসী লোকটার চেহারায় একটা মায়া-মায়া ভাব। মিঠুর ঢিলটা তাহলে কাজে লেগেছে!
সত্যিই লেগেছে। কারণ ঘণ্টাখানেক বাদে দরজা খুলে সেলিম একাই ঘরে ঢুকল। খুব সাবধানী ভঙ্গি।দরজাটা এমনভাবে লাগাল যেনকাউকে সে গোপন করতে চায় কিছু। বসল এসে একেবারে মিঠুর গা ঘেষে। না, অ্যাকশনের কোনো আশংকা নেই। এখন যা হবে পুরোটাই ইমোশন। মিঠু বলল, চাচা। বলবে কিছু। তুই বল না! কী বলব! ঐ যে তখন বলেছিলি। শুনতে বড় ভালো লাগল রে! কোন কথাটা? ঐ যে বললি আমি খুব ভালো চড়মারি। জানিস সবাই বলে আমিনাকি কোনো কাজ পারি না। মিঠু গলায় যথাসম্ভব আবেগ এনে বলল, লোকজন গুনীর কদর কি আর বুঝে! চড় মারার কাজটা আমার ধারণা বাংলাদেশে তোমার চেয়ে ভালো কেউ পারে না। বলছিস! কিছুক্ষণ পর লোকটি বলল, আমার কাছে তুই কিছু একটা চা। চাইলেই পাব! একটু কম করে চাস। দেখিস আবার বলিস না, আমাকে এখান থেকে বের হওয়ার পথ দেখিয়েদাও। ওটুকু করার সামর্থ্যআমার নাই। না। আমি সেটা চাইব না। আমি শুধু জানতে চাই আমাাকে এখানে আটকে রেখেছেকে? তারা কী চায়? এইতো বিপদে ফেললি। অতো তোবলা যাবে না। তাহলে বললে কেন আমাকে কিছু চাইতে! এত বড় জিনিস চাইলে কী হয় রে! ছোট মানুষ ছোট করে চা। থাক আমার লাগবে না। মিঠু অভিমানী ভঙ্গি করে। লোকটা গলা নামিয়ে বলে, আমার মাথা ছুঁয়ে বল দুনিয়ার কাউকে কথাটা বলবিনা। মিঠু মাথা ছুঁয়ে বলল, বলব না। তাও বিশ্বাস হচ্ছে না। তাহলে থাক। বলা লাগবে না। দূর। তোর রাগটা একটু বেশি। এত রাগ ভালো না। শোন, তোকে এখানে এমন একজন আটকে রেখেছে যাকে তুই চিনিস। তার নাম সোহেল! বলার সঙ্গে সঙ্গেই লোকটা তার মুখ চেপে ধরে বলে, আস্তে বল। আস্তে। ওসব লোকের নাম মুখে নিতে নেই। কিন্তু সোহেল আমাকে এখানেআটকে রাখল কেন? তই বড় বেশি জানতে চাস রে! অত জানার তো দরকার নাই। মিঠু আবার একটু অভিমানী গলায় বলল, থাক আর জানতে চাইব না। লোকটি একটু চিন্তায় পড়ে বলে, তবে একটা কথা বলি তোকে একরাতের মধ্যেই তুই ছাড়া পেয়ে যাবি। আমাকে ছাড়াবে কে? সোহেল। সোহেল! আর কোনো প্রশ্ন করিস না। আমার আবার পেট পাতলা। শেষে সব বলে দিয়ে বিপদে পড়ব। লোকটি আর একটুও অপেক্ষা না করে বেরিয়ে যায়। দরজাটা লাগায় না। ইচ্ছায় না অনিচ্ছায় মিঠু ঠিক বুঝতে পারে না। তবু সুযোগটা নিতে সে ধীর পায়েএগোয়। আস্তে আস্তে দরজাটাখুলে দেখে ঠিক সামনের ঘরের মেঝেতে বিছানা পেতে ওরা দুজন শোয়ার বন্দোবস্তকরছে। দুপুরে খাবার দিতে যে লোকটা ঢুকেছিল সে বলল, কীরে তুই কি এতক্ষণ ফিসফাস করলি! সেলিম নামের লোকটি মায়াভরা গলায় বলে, ছেলেটাকে আমার পছন্দ হয়েছে। কার না কার ছেলে? তোর পছন্দ! কার না কার ছেলে কী বলছ! সোহেল সাহেবের বসের ছেলে না। আরে না। তাহলে! লোকটি উঠে বসে। একটা সিগারেট ধরায়। তারপর বলে, সে এক বিরাট ইতিহাস। কী ইতিহাস! এই ছেলেটা সোহেল সাহেবের বসেরও ছেলে না! তাহলে! সোহেল সাহেবের বসের একটা ছেলে ছোটবেলা হারিয়ে গিয়েছিল। বস পাগলের মতো ছেলেকে খুঁজছে। মহব্বত নামের একটা লোককে বেতন দিয়ে রেখেছে লোকটাকে খুঁজে বের করার জন্য। খুঁজে পায়নি? সোহেল দেখল, এই লোকের কাছ থেকে কিছু আদায়ের একমাত্রউপায় হলো তার ছেলেকে ফিরিয়ে দেয়া। তাই একটা নাটক সাজাল। কী নাটক! মহব্বতকে হাত করে ফেলল। তাকে বলল, তুই এমন একটা ছেলেকে খুঁজে বের কর যে আসলে তার বাবা-মায়ের ছেলেনা। বাবা-মা তাকে কুড়িয়ে পেয়েছে বা এইরকম কিছু। মহব্বত অনেকদিন খুঁজে এই ছেলেটাকে পায় যাকে এক স্কুলের হেডমাস্টার কুড়িয়ে পেয়েছিল। তারপর? সোহেল তার বসকে বলে ছেলে পাওয়া গেছে। তারা গিয়ে ছেলেকে নিয়ে আসে। ছেলের বাবাকে, মানে যে তাকে লালন-পালন করেছিল তাকে ২০লাখ টাকাও দিয়ে আসে! ২০ লাখ টাকা! ঐ লোকের তো ভাগ্য বদলে গেছে। আরে দুর! সোহেলের লোক এরই মধ্যে এই টাকা নিয়ে এসেছে। ও। আর সোহেল এখান থেকে পাবে ১ কোটি। ১ কোটি! হুঁ। ২ কোটি চেয়েছিল, ১ কোটিতে রফা হয়েছে। ওরা কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে। হয়ত ছেলেকে উদ্ধার করে দেয়ার জন্য সোহেল এখান থেকে আরেক দফা টাকা পাবে। বলো কী? সোহেলের তো কয়েক দফা লাভ! তাইতো হচ্ছে। সে হিসাবে আমাদের ভাগটা বড় কম হয়ে গেছে। মাত্র ১ লাখ! তুমি দরাদরিটা কোনোদিনই ভালো করতে পার না। মাত্র একদিন ডিউটি করে ১ লাখ! কম কী রে! তাও। সোহেল কত পাচ্ছে! সেটা দিয়ে তোর কী! শোন দেখিস আবার ঘুমিয়ে পড়িস না। সোহেল মিস কল দিলেই আমাদের পালাতে হবে। আমার কিন্তু ইচ্ছে হচ্ছে ছেলেটাকে ছেড়ে দেই। সোহেলকে একটা শিক্ষা দেই। ওসব কথা মুখেও আনবি না। এরপর ওরা ওদের লাভ-ক্ষতি নিয়ে আরও অনেক কথা বলে। মিঠুর আর সেসব শোনার দরকার পড়ে না। একটু আগ পর্যন্ত তার ছিল দুজন বাবা-মা। এখন দেখছে একজন বাবা-মাও নেই। মিঠুরবাবা-মা আসলে কে? কোথায় তারা! আবার কি কোনো একদিন তারা হাজির হবে। স্কুলের শেষ ক্লাসের ঠিক আগে। দারুণ একটা গাড়ি চালিয়ে! এই সময়ই হঠাৎ লোক দুটোর মধ্যে একটা উত্তেজনা দেখাযায়। একজন আরেকজনকে বলে, চল। সেলিম ঘুরে মিঠুর দিকে একটু তাকায়। মায়াভরা চোখ।মিঠু স্পষ্ট বুঝতে পারে এই লোকটি যেমন নিজের প্রশংসা আগে শোনেনি, তেমনি কারও প্রতি তার মায়াও জন্মেনি তার। আজই প্রথম! আচ্ছা এমনকি হতে পারে যে দেখা গেল সে-ই তারবাবা! সোহেল দৌড়ে এসে ঢুকে। উদ্যত ভঙ্গি। মিঠুকে কোলেতুলে নিয়ে এদিক-ওদিক দৌড়ায়। তারপর বলে, স্যার পালিয়েছে। বদমাশগুলো পালিয়েছে। মিঠুকে জিজ্ঞেস করে, ভাইয়া তোমার সঙ্গে কোনো খারাপ ব্যবহার করেনি তো! তারপর নিজেই উত্তর দেয়। এত সাহস হয়নি স্যার। দেখেন মিঠু পুরো অক্ষত। বদরুল এসে মিঠুকে তার কোলথেকে নামান। মিঠু এখন দেখতে পায়, সঙ্গেশরীফ আর সালমাও আছে। আছে মিলিও। সবাই কাঁদছে। মিঠুর একটু হাসি পায়। যারা তার জন্য কাঁদছে তাদের কেউই মিঠুর কেউ নয়। সোহেল বলে, স্যার। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আমি লোক লাগিয়ে দিয়েছি। কালকের মধ্যেই সত্যিকারের ক্রিমিনালরা ধরা পড়ে যাবে। তার আর দরকার হবে না। বদরুলের গলার স্বরটা একটুকেমন যেন।
বদরুল বলেন, সোহেল তুমি যখন খবরটা দিলে, বললে মিঠুকে পাওয়া গেছে তারপর থেকে তোর মোবাইলটা টেপ করার একটা ব্যবস্থা করা করা হয়েছিল। মানে? মানে কি বুঝতে পারছ না? তোমার ১ কোটি, ১ লাখ সব খেলাই আমরা জানি। সোহেল দৌড়ে পালাতে চায়। বদরুল হেসে বলেন, তোমার বন্ধুরা পালালেও তুমি পারবে না। আমাদের সঙ্গেই পুলিশ আছে। কথাটা শেষ হওয়ার আগেই দুজন লোক গিয়ে ঝাপটে ধরে সোহেলকে। সোহেল বলে, স্যার একটা সুযোগ দেয়া যায় না। শত্রুদের সুযোগ দেয়া যায়।বন্ধুদের দেয়া যায় না। বদরুল এসে মিঠুর হাত ধরেন। হাত ধরে হাটতে থাকেন। কার কাছে তুলে দেবেন তাকে? যিনি সোহেলকে ধরে ফেলেছেনতার পক্ষে আসল সত্যটাও বের হয়ে যাওয়ারই কথা। তাহলে কি বদরুল জানেন! বদরুল মিলির হাতে মিঠুকে দিয়ে বললেন, এই নাও তোমার ছেলে। মিলি তাকে ধরে কাঁদতে থাকে। মিঠুর হাসি পায়। কার জন্যকে কাঁদে। সে চুপিচুপি বদরুলকে দেখে। বদরুল কি জেনেও না জানার ভান করছেন? মিঠু কি তাকে জানাবে? কিন্তু জানিয়েই বা কী হবে! তার চেয়ে সিনেমা যতদিন চলার চলুক। প্রকৃতি যদি তার কাছ থেকে তার আসল বাবা-মা কেড়ে নিতে পারে তাহলে সে-ও দুই ভুল বাবা-মাকে গ্রহন করার অধিকার রাখে। মিঠু কাউকে কিছু বলবে না। শুধু দুজনের সঙ্গে তার দুটো কথা আছে। শরীফের কাছে জানতে চাইবে, কেন তিনি ২০ লাখ টাকা নিয়েছিলেন! আর শফিককে জানাবে তার বুদ্ধিতেই মিঠু একটা বড় বাঁচা বেঁচেছে। শরীফকে সে একদিন জিজ্ঞেস করল, বাবা তুমি আমার জন্য টাকা নিলে কেন? বলো তুমি আমাকে বিক্রি করে দিলে কেন? শরীফ বললেন, না হলে যে তুইতোর সত্যিকারের বাবা-মায়ের কাছে যেতে পারতি না। তুই যেতে চাচ্ছিলি, আমি টাকা নিয়ে জানিয়ে দিলাম তোর যাওয়াটাঠিক আছে। আমরা তোর কেউ না। আমাদের ভালোবাসার কিছু নেই। আমি তোকে বিক্রি করিনি বাবা। টাকা দিয়ে তোর ভালোবাসাটাকে কিনে নিয়েছি। শফিককেও ঘটনাটা জানাল। বলল, তোর সেই প্রশংসার পরামর্শটা আমি কাজে লাগিয়েছি। শফিক বলল, দূর। এটা আমার বুদ্ধি হতে যাবে কেন? এটাতোর বুদ্ধি। আমি ওখানে থাকলে তো মাথা ঘুরে পড়ে মরে যেতাম। কী আশ্চর্য তুই না সবসময় সব কৃতিত্ব নিজের করে নিতি। আর এখন আমি দিতে চাচ্ছি... শফিক বলে, ওগুলো যারা আমারমতো তাদের সঙ্গে করা যায়।তুই তো... মিঠু বলে, তোরা আমাকে কি আর তোদের মতো মনে করতে পারিস না! কোথায় তুই আর কোথায় আমরা! আকাশ আর পাতাল, সাগর আর খাল। শফিক হাসে। মিঠুর খুব ইচ্ছে করে শফিককে সব বলে দিতে। বলে, আবার শফিকদের কাতারে নেমে আসতে। আবার ইচ্ছে করেও না। মনে হয়, এই তো ভালো। কত কিছু খাওয়া যায়। যত ইচ্ছা ঘোরাযায়। যেখানে ইচ্ছা যাওয়া যায়। সময় আর নিয়তির হাতে নিজেকে পুরোপুরি ছেড়ে দেয়মিঠু। আর অলস দুপুরে নিজেকেই নিজের সঙ্গী বানিয়ে সে সংলাপ তৈরি করে। একজন মিঠু বলে, কি হে নিজেকে মিঠু বানিয়ে বেশ আছো না! তা বেশ আছি। খাচ্ছি-দাচ্ছি-ঘুরছি-ফিরছি। কিন্তু এটা কি ঠিক? তুমি তো আর এদের ছেলে নও। প্রতারণা হচ্ছে না। প্রতারণা! নাহলে কী? কে জানে! কিন্তু আমার তো মনে হয় আমিই তো কিং মিঠু। কীভাবে? আমার কিচ্ছু নেই। অথচ সবকিছু আছে। আমিই তো রাজা। কিং। কিং মিঠু! ‘কিং মিঠু’র এই ঘোষণার সঙ্গে পৃথিবীর কাউকে দ্বিমত করতে দেখা যায় না!
সমাপ্ত

Old school Easter eggs.