Polly po-cket
মোঃ জাফর ইকবালের
প্রচ্দত
গল্প সংকলন
একটি গহিন গ্রাম
রাস্তার পাশে রিকশা-ভ্যানটা থামিয়ে রিকশাওয়ালা নেমে গামছা দিয়ে মুখ মুছে বলল, ‘আর সামনে যাবে না। বাকিটা হেঁটে যেতে হবে।’ আম্মু অন্যমনস্কভাবে বললেন, ‘হেঁটে যেতে হবে?’ ‘জে।’ মধ্যবয়সী রিকশাওয়ালা সামনের কাঁচারাস্তাটা দেখিয়ে বলল, ‘বর্ষার সময় সব পানিতে ডুবে যায়, তখন নৌকা করে যাওয়া যায়।’ আম্মু বললেন, ‘ও।’ বহুদিন পর আম্মু এখানে এসেছেন। আজকাল যেখানেই কিছুদিন পরে যান, গিয়ে জায়গাটা চিনতে পারেন না। ফাঁকা একটা জায়গা বাড়িঘরে ঘিঞ্জি হয়ে যায়। এই এলাকার কোনো পরিবর্তন হয়নি, সেই ছোট থাকতে যে রকম দেখেছিলেন, এখনো সে রকমই আছে। রাশা রিকশা-ভ্যানে পা তুলে বসেছিল, এবার নেমে পড়ে। গত রাতে তারা রওনা দিয়েছে, সারা রাত ট্রেনে কেটেছে, সকালে নেমে বাস ধরেছে। বাসের পর স্কুটার,তারপর রিকশা-ভ্যান। বাকিটা হেঁটে যেতে হবে। রাশা অন্যমনস্কভাবে চারপাশে তাকাল কিন্তু খুব ভালো করে কিছু দেখল বলে মনে হয় না। একটু আগে জলার ধারে গাছের ওপর একটামাছরাঙা পাখি বসেছিল, এত সুন্দর রঙিন পাখি সে জীবনে কখনোই দেখেনি, কিন্তু তার পরও পাখিটা দেখে তার ভেতরে কোনো আনন্দ হলো না। আসলে তার ভেতরটা এখন মনে হয় মরে গেছে, আনন্দ বা দুঃখ কোনোঅনুভূতিই হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, চার পাশে যেটা ঘটছে তার পুরোটাই একটা দুঃস্বপ্ন। মনে হচ্ছে, এক্ষুণি তার ঘুম ভেঙে যাবে, আর ঘুম থেকে উঠে দেখবে, সে তার ঘরে কম্পিউটারের সামনে বসে আছে। রাশা জানে, এটা দুঃস্বপ্ন নয়, সত্যি। তাইসম্পূর্ণ অপরিচিত এক ধরনের দুঃখ, হতাশা আর আতঙ্কে বুকের ভেতরটা অসাড় হয়ে আছে। আম্মু রিকশা-ভ্যান থেকে নেমে রাশাকে বললেন, ‘নেমে আয় মা। হেঁটে যেতে হবে। পারবি না?’ রাশা কোনো কথা না বলে মাথা নেড়ে জানাল যে, সে পারবে। রিকশাওয়ালা ভ্যানথেকে আম্মুর ছোট ব্যাগ আররাশার বড় স্যুটকেসটা নামাল। এই স্যুটকেসের মধ্যে তার বাকি জীবনটা কাটানোর জন্য যা যা লাগবেসেটা আঁটানো হয়েছে। আম্মু বারবার বলেছেন, ‘যা যা লাগবে সব নিয়ে নে মা। আর তো নিতে পারবি না।’ রাশা তখন খুব চিন্তাভাবনা করেনি। অনেকটা অন্যমনস্কভাবে হাতের কাছে যা পেয়েছে স্যুটকেসে ভরেছে। সে তখনো বিশ্বাস করেনি যে সত্যি সত্যি এটা ঘটছে। স্যুটকেসের মধ্যে তার কিছু জামাকাপড় আছে, কিছু বই। তার কম্পিউটারটা আনতে পারলে হতো, কিন্তু আম্মু বলেছেন, তারা যেখানে যাচ্ছে তার আশপাশে কোথাও ইলেকট্রিসিটি নেই। তা ছাড়া এত বড় একটা কম্পিউটার, সেটা আনবে কেমন করে? এই স্যুটকেসটা আনতেই কত ঝামেলা হয়েছে। রাশা রিকশা-ভ্যান থেকে টেনে স্যুটকেসটা নামাল। নিচে চাকা লাগানো আছে, রাস্তা ভালো হলে টেনে নেওয়া যেত। কাদামাটির এই কাঁচা রাস্তায় কেমন করে নেবে সে জানে না। আম্মু রিকশাওয়ালাকে বললেন, ‘আমি কিন্তু আজকেই ফিরে যাব। মনে আছে তো?’ মানুষটা মাথা নাড়ল, বলল, ‘জে মনে আছে।’ আম্মু রাশার স্যুটকেসটা দেখিয়ে বললেন, ‘এই স্যুটকেসটা পৌঁছে দিতে হবে। কাউকে পাওয়া যাবে?’ মানুষটা বলল, ‘আমি পৌঁছে দেব।’ ‘রিকশা-ভ্যান? কেউ নিয়ে যাবে না তো?’ ‘এইখানে কারও বাড়িতে রেখেযাব। কেউ নিবে না। এই গাঁও-গেরামে সবাই সবাইরেচিনে।’ কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনজনের এই ছোট দলটা এগিয়ে যেতে থাকে, সামনে রাশার স্যুটকেস মাথায় রিকশাওয়ালা, তার পেছনে আম্মু, সবার পেছনে রাশা। আম্মু মাঝেমধ্যে থেমে রাশার সঙ্গে একটা-দুইটা কথা বলার চেষ্টা করেছেন কিন্তু রাশা হু-হ্যাঁ ছাড়া আর কিছু বলেনি, তাই আলাপ বেশি দূর এগোতে পারেনি। গ্রামের কাঁচা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে রাশা দুই পাশে তাকাচ্ছিল। যদি স্কুলের সব ছেলেমেয়েকে নিয়ে এখানে পিকনিক করতে আসত তাহলে এতক্ষণে চারপাশের খেত, মাঠ, খাল, গাছপালা, গরু, ছাগল, পাখি—এসব দেখে সবাই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠত। সবাই মিলে মাঠে দৌড়াদৌড়ি করত, খালের পানিতে লাফঝাঁপ দিত, গরু-বাছুর ধরে ছবি তুলত। এখন সবকিছুকে মনে হচ্ছে, পুরোপুরি অর্থহীন। মেঠোপথে মানুষজন খুব বেশি নেই, হঠাত্ এক-দুইজনকে দেখা যায়, তারা তখন কৌতূহলী হয়ে তাদের দিকে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাকায়। রাশাও একবার ঘুরে একটা মেয়ের দিকে তাকাল, আট-নয় বছরের শুকনো লিকলিকে একটা মেয়ে, কুচকুচে কালো গায়ের রং, মাথার লাল চুল রুক্ষ—বাতাসে উড়ছে, খালি গা, শুধু একটা বেঢপ প্যান্ট পরে আছে। হাতে একটা চিকন বাঁশের কঞ্চি, সেটা হাতে নিয়ে উদাস মুখেসে একটা বিশাল ষাঁড়কে নিয়ে যাচ্ছে। ষাঁড়ের মাথায় ধারালো শিং, লাল ক্রুদ্ধ চোখ দেখে রাশার ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে, কিন্তু এই লিকলিকে ছোট মেয়েটির বুকে কোনো ভয়ডর নেই, রাশা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। একটা বড় বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আম্মু বললেন, ‘ওই যে তালগাছটা দেখছিস, সেটাহচ্ছে তোর নানু বাড়ি।’ রাশা কোনো কথা বলল না। আম্মু বললেন, ‘আগে দুইটা তালগাছ ছিল, একটা বাজ পড়েপুড়ে গেছে।’ রাশা এবারেও কোনো কথা বললনা, ‘তাকিয়ে কল্পনা করার চেষ্টা করল, দুটো তালগাছ হলে সেটা কেমন দেখাত। ধীরে ধীরে রাস্তাটা আরও সরু হয়ে গেল, একেবারে শেষে একটা বাঁশের সাঁকো পার হতে হলো। আম্মু তাঁর স্যান্ডেল দুটো খুলে হাতে নিয়ে নিলেন, রাশা জুতো পরেই পার হয়ে গেল। কিছু ঝোপঝাড় পার হয়ে একটাবিবর্ণ টিনের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আম্মু বললেন, ‘এইটা তোর নানু বাড়ি।’ রাশা চোখ তুলে তাকাল। টেলিভিশনে মাঝেমধ্যে যখনকোনো গ্রামগঞ্জের খবর দেখায়, তখন সে খবরের মধ্যে এ রকম বাড়ির ছবি দেখেছে—এই প্রথমবার সত্যি সত্যি দেখল। বাইরের টিনের ঘরের পাশ দিয়ে আম্মু ভেতরে ঢুকলেন,মাঝখানে খালি একটা উঠান, তার দুই পাশে দুটি ঘর। একটা ঘরে টিনের ছাদ, অন্যটার খড়ের ছাউনি। মাঝখানের উঠানটুকু বড় আর তকতকে পরিষ্কার। কোথাও কোনো জনমানুষ নেই, শুধু একটা মুরগি তার ছানাদের নিয়ে খুঁটে খুঁটে খাচ্ছিল। তাদের দেখে মুরগিটা কঁক কঁক করে একটাসতর্ক শব্দ করল, অমনি সব ছানা ছুটে এসে মুরগির তলায় আশ্রয় নিল। তাদের দেখে যখন বুঝতে পারল কোনোবিপদ নেই, তখন আবার সব আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেতে থাকে।
রিকশাওয়ালা মানুষটি তার মাথা থেকে স্যুটকেসটা উঠানে নামিয়ে রেখে গামছা দিয়ে তার মুখ-গলা মুছতে থাকে। আম্মু এদিক-সেদিক তাকিয়ে ডাকলেন, ‘মা।’ কেউ উত্তর দিল না। আম্মু তখন টিনের ঘরের সামনে গিয়ে দরজাটি ধাক্কা দিলেন, দরজাটি সঙ্গে সঙ্গে খুলে গেল। আম্মু ভেতরে ঢুকে একটু পরে বের হয়ে বললেন, ‘ভেতরে কেউ নেই।’ রাশা কোনো কথা বলল না। আম্মু বললেন, ‘আয়, বাড়ির পেছনে যাই। বাড়ির পেছনে পুকুরঘাটে আছে কি না দেখি।’ আম্মু টিনের ঘরের পাশ দিয়ে বাড়ির পেছনের দিকে রওনা দিলেন। রাশা অপেক্ষা করবে নাকি পেছনে পেছনে যাবে ঠিক বুঝতে পারছিল না, শেষে আম্মুর পেছনে পেছনেই গেল। বাড়ির পেছনে অনেক গাছপালা, বড় বড় বাঁশঝাড়। তার নিচে শুকনো পাতা মাড়িয়ে রাশা আম্মুর পেছনে পেছনে যেতে থাকে। সামনে একটা বড় পুকুর, পুকুরের কালো পানিটলটল করছে। পুকুরের পাশে ছায়াঢাকা একটা পুকুরঘাট।রাশা দেখল, সেই পুকুরঘাটেহেলান দিয়ে গুটিসুটি মেরে একজন মহিলা বসে আছেন। মহিলা পুকুরের পানির দিকে তাকিয়ে আছেন, তাই তাঁর চেহারা দেখা যাচ্ছে না। আম্মু ডাকলেন, ‘মা।’ মহিলাটি পেছনে ঘুরে না তাকিয়ে বললেন, ‘কে?’ ‘আমি মা। আমি নীলু।’ রাশার মায়ের নাম নীলু। বহুদিন তাঁকে এই নামে কেউডাকে না। পুকুরঘাটে বসে থাকা মহিলাটি একবারও পেছন দিকে না তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সঙ্গে কে?’ ‘আমার মেয়ে। রাশা।’ কথা বলতে বলতে আম্মু তাঁরমায়ের পাশে দাঁড়ালেন, কিন্তু তাঁর মা একবারও মাথা ঘুরিয়ে মেয়েকে দেখার চেষ্টা করলেন না। শীতল গলায় জিজ্ঞেস করলেন,‘তোর পাগলি, মাথা খারাপ মায়ের কাছে কেন এসেছিস?’ আম্মু থতোমতো খেয়ে গেলেন,আমতা আমতা করে বললেন, ‘না,মানে ইয়ে আসলে—’ ‘এত বছর পার হয়ে গেল, কখনোএকবারও খবর নিলি না। এখন হঠাত্ করে একেবারে মেয়েকে নিয়ে চলে এসেছিস। ব্যাপারটা কী?’ আম্মু ইতস্তত করে বললেন, ‘আমি আসলে একটু দেশের বাইরে যাব—অস্ট্রেলিয়াতে। রাশাকে—মানে আমার মেয়েকে কোথায় রেখে যাব ঠিক করতে পারছিলাম না। তাই ভাবলাম, তোমার কাছে রেখে যাই।’ ‘কত দিনের জন্য যাচ্ছিস?’ ‘মানে, আসলে বেশ কিছুদিন, মানে হয়েছে কী—’ ‘আরেকজনকে বিয়ে করেছিস?’ আম্মুর মুখটা বিবর্ণ হয়ে গেল, মাথা নিচু করে বললেন,‘হ্যাঁ।’ ‘জামাই তোর মেয়েকে নেবে না?’ আম্মু কোনো কথা না বলে চুপ করে রইলেন। ‘তাই মেয়েটাকে এখানে ফেলেরেখে চলে যাচ্ছিস? এর চেয়ে মেয়েটার গলাটা কেটে নদীতে ভাসিয়ে দিলি না কেন? তোর মেয়ে এই গাঁও-গেরামে কীভাবে থাকবে?’ আম্মু বললেন, ‘আসলে মা তুমি ঠিক বুঝতে পারছ না। আমার কোনো উপায় ছিল না—’ ‘আমার মাথাটা আউলাঝাউলা সেই কথা সত্যি। আমি পাগল মানুষ, সেটাও সত্যি, কিন্তু আমি তো বেকুব না নীলু! তুই তোর মেয়ের এত বড় সর্বনাশ কেন করতে যাচ্ছিস?’ ‘আমি সর্বনাশ করতে যাচ্ছিনা মা—আমি একটু গুছিয়ে নিয়ে—’ রাশা দেখল তার নানি হঠাত্করে হাত তুলে তার আম্মুকেথামিয়ে দিলেন, বললেন, ‘আমার নাতনি কই? আমি কপালপোড়া মেয়েটাকে একবার দেখি।’ তার নানি তখন ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে পেছন দিকে তাকালেন। এই প্রথম রাশা তার মাথা খারাপ পাগলি নানিকে দেখতে পেল। তার নানি দেখতে কেমন হবেন, সেটা সে গত কয়েক দিনে অনেকবার কল্পনা করেছে। সাদা শণের মতো রুক্ষ চুল,তোবড়ানো গাল, মুখে বয়সের বলিরেখা, কোটরাগত লাল ক্রুদ্ধ চোখ, কিন্তু সে অবাক হয়ে দেখল। তার নানিরচেহারায় বয়সের কোনো ছাপ নেই, দেখে মনে হয়, তার মায়ের বড় বোন। চুলে অল্প একটু পাক ধরেছে, রোদে পোড়া চেহারা, তার মধ্যে শুধু জ্বলজ্বলে তীব্র এক জোড়া চোখ। রাশার মনে হলো,সেই চোখ দিয়ে তার নানি তাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে ফেললেন। নানি কিছুক্ষণ রাশার দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন, তারপর হাত নেড়ে ডাকলেন, বললেন, ‘আয়। কাছে আয়।’ রাশা ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেল, নানি হাত দিয়ে তাকে ধরলেন, তারপর কাছে টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘আমি জানতাম, তুই আসবি। তাই আমি সেজেগুজে তোর জন্য অপেক্ষা করছি।’ রাশা অবাক হয়ে তার নানির দিকে তাকাল, বলল, ‘কী বললে?’ ‘বলেছি যে আমি তোর জন্য অপেক্ষা করছি। আমি জানতাম, তুই আজকে আসবি।’ ‘কেমন করে জানতে?’ ‘আমি তো পাগল মানুষ, মাথারঠিক নেই। উল্টাপাল্টা জিনিস মাথায় আসে। আজকে সকালবেলা মাথায় এসেছে তুই আসবি। সে জন্য ট্রাংকথেকে এই শাড়িটা বের করে পরেছি।’ রাশা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তার এই মাথা খারাপ নানির দিকে তাকিয়ে রইল। নানি মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন, ‘তুই আমার কথা বিশ্বাস করলি না? ঠিকআছে, তোর হাতটা খোল—’ রাশা তার হাতটা খুলল। নানি তার মুঠি খুলে কিছু একটা বের করে তার হাতে দিয়ে তার মুঠি বন্ধ করে বললেন, ‘এই যে—তোকে দেওয়ার জন্য এটা আমি হাতেনিয়ে বসে আছি। এখন তোকে দিলাম।’ ‘এটা কী?’ ‘আমার মা আমাকে দিয়েছিলেন। আমার মা পেয়েছিলেন তাঁর মায়ের কাছ থেকে। তাঁর মা পেয়েছিলেন তাঁর মায়ের কাছ থেকে—’ রাশা আবার কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এটা কী?’ ‘একটা মাদুলি।’ ‘কী হয় এটা দিয়ে?’ ‘কাছে আয়, তোকে কানেকানে বলি।’ রাশা তার মাথাটা এগিয়ে দেয়, তার নানি রাশার থুতনিটা ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করেবললেন, ‘পাক-সাফ পবিত্র হয়ে এই মাদুলিটা হাতে নিয়ে তুই যেটা চাইবি সেটাই পাবি।”
একটি বাঘের কথা
আমি হচ্ছি সেই বাঘ, যার চরিত্রকে কটাক্ষ করে একটা গল্প এই দেশে চালু আছে। গল্পটা সবাই জানে, বইপত্রে তার শিরোনাম হচ্ছে দুষ্টু বাঘ। গল্পটা এ রকম: এক বাড়ির সামনে একটা খাঁচায় একটা বাঘকে আটকে রাখা হয়েছে। সেই খাঁচার সামনে দিয়ে যে-ই যায় বাঘ তাকে অনুনয়-বিনয় করে তাকে ছেড়ে দিতে বলে। একজনবোকাসোকা পণ্ডিত সত্যি সত্যি খাঁচা খুলে বাঘকে ছেড়ে দিল। বাঘ বের হয়েই পণ্ডিতকে বলল, ‘আমি তোমাকে খাব।’ পণ্ডিত বলল, ‘আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম আর তুমি আমাকে খাবে, এটা কেমন কথা!’ বাঘ বলল, ‘এটাই জগতের নিয়ম।’ ঠিক এ রকম সময় সেদিক দিয়ে একটা শেয়াল যাচ্ছিল। পণ্ডিতমশায় তখন তাকে সাক্ষী মানল। বলল, ‘ভাই শেয়াল, এই বাঘটা খাঁচার মাঝে আটকা ছিল, আমি এই পথে যাচ্ছিলাম, তখন বাঘটাবলল তাকে ছেড়ে দিতে।’ শেয়াল বলল, ‘এই পথটা খাঁচার মাঝে আটকা পড়েছিল। তখন বাঘটা হেঁটে যাচ্ছিল?’ পণ্ডিত বলল, ‘আরে না, না—বাঘটা খাঁচার মাঝে আটকা পড়েছিল,আমি হেঁটে যাচ্ছিলাম।’ শেয়াল বলল, ‘তুমি খাঁচার মাঝে ছিলে, বাঘটা হেঁটে যাচ্ছিল?’ বাঘটা বলল, ‘ধুরবোকা। তুমি কিছুই বোঝ না।আমি খাঁচার মাঝে ছিলাম, পণ্ডিত হেঁটে যাচ্ছিল।’ শেয়াল তবুও বোঝে না। বাঘ বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তুমি কিছুই বোঝ না।’ সে তখন খাঁচার ভেতরে ঢুকে বলল, ‘আমি এইভাবে খাঁচার মাঝে ছিলাম।’ তখন শেয়াল খাঁচা বন্ধ করে তালা মেরে দিল। তারপর পণ্ডিতকে বলল, ‘এখন তুমি বাড়ি যাও। আর শোনো, ভবিষ্যতে কখনো কোনো দুষ্টু বাঘের উপকার করতে যেয়ো না। তাহলে সে নির্ঘাত তোমার ঘাড় মটকে খাবে।’ এইটা হচ্ছে গল্প আর এই গল্প দিয়ে এই দেশের ছেলে,বুড়ো সবাইকে বোঝানো হয়েছে আমি দুষ্টু এবং আমাকে বোকা বানিয়ে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আমার মনে হয় এখন সত্যি কথা বলার সময় হয়েছে। আমি মোটেও দুষ্টু বাঘ নই এবং সত্যি কথা বলতে কি আমার প্রতি আসলে ঘোরতর অবিচার করা হয়েছিল। আমি এখন জাতির সামনে সত্যিকারের কাহিনীটা তুলে ধরতে চাই। সবাই নিশ্চয়ই লক্ষ করেছে গল্পের শুরুতে বলা হয়েছে একটা বাঘকে একটা খাঁচার মাঝে আটকে রাখা হয়েছে। আমি মুক্ত এবং স্বাধীন একটা বাঘ, সুন্দরবনে আমি ঘুরে বেড়াই, দেশ-বিদেশ থেকে লোকজন আমাকে দেখতে সুন্দরবনে যায়, আমার ফটো তোলে। আমাকে কেমন করে খাঁচায় আটকানো হলো সেই কথাটা কেউ বলে না। আসলে একটা অজ্ঞান পার্টি আমার খাবারে বিষ দিয়ে অজ্ঞান করে খাঁচার ভেতরে নিয়ে এসেছিল। একটা বন্য পশুকে খাঁচার ভেতরে আটকে রাখলে বন্য পশু অধিদপ্তরের কঠোর শাস্তি দেওয়ার কথা কিন্তু অনেক টাকা ঘুষ দিয়ে কর্মকর্তাদের মুখ বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। যাই হোক, স্বাভাবিক কারণেই আমি খাঁচা থেকে বের হতে চাইতাম এবং যে-ই আসত, তাকেই বলতাম আমাকে বের করে দেওয়ার জন্য। নিষ্ঠুর মানুষেরা কেউ আমার খাঁচা খুলে দিল না। একদিন একটা বোকা পণ্ডিত খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে একটা লাঠি দিয়ে আমাকে খোঁচা দিতে লাগল। পশু নির্যাতন আইনে তার বিচার হওয়া উচিত, কিন্তু কে তারবিচার করবে? আমি তাকে বললাম, ‘কেন আমাকে খোঁচাখুঁচি করছ। তার চাইতে তুমি আমাকে ছেড়ে দাও আমি তোমাকে সুন্দরবনে একটা প্লট জোগাড় করে দেব। সেইখানে তুমি একটা হোটেল বানাতে পারবে। সুন্দরবন যখন সপ্তাশ্চর্য হয়ে যাবে তখন লাখ লাখ টাকা কামাই করতে হবে।’ লোভী পণ্ডিত তখন খাঁচার দরজা খুলে দিল। বের হয়ে আমি পণ্ডিতের টুঁটি চেপে ধরে বললাম, ‘ব্যাটা পণ্ডিত, তোকে আমি খাব।’ এইখানে বলে নেওয়া দরকার, আমি মোটেও তাকে খেতাম না, শুধু ভয় দেখানোর জন্য বলেছিলাম। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগাররা শুকনো হাড় জিরজিরে মানুষ খায় না, তারা সুস্বাদু হরিণের মাংস খায়। আমার কথা বিশ্বাস না হলে উইকিপিডিয়াতে গিয়ে আমাদের খাদ্য কী সেটা যে কেউ দেখতে পারে। যাই হোক, আমার কথা শুনে বোকা এবং লোভী পণ্ডিত এতইভয় পেয়ে গেল যে তার কাপড় নষ্ট হয়ে গেল—আমি তার আর বিস্তারিত বর্ণনা দিতে চাই না। ঠিক তখন শেয়াল এদিক দিয়ে যাচ্ছিল। সবাই জানে শেয়াল হচ্ছে প্রতারক, ধূর্ত এবং ঠগ। নিরীহ কুমিরছানাদের খেয়ে ফেলারজন্য তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী আইনে মামলা আছে। পণ্ডিত শেয়ালকে বলল,‘ভাই শেয়াল, আমাকে বাঁচাও।’ শেয়াল আমাকে বলল, ‘বাঘ ভাই, এই শুকনো হাড় জিরজিরে পণ্ডিতকে মেরে কী হবে, ব্যাটাকে ছেড়ে দেন। খাঁচায় দীর্ঘদিন থেকে আপনার চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে, আমার কাছে চোখের ক্রিম আছে আপনার চোখে লাগিয়ে দিই।’ আমার শেয়ালকে বিশ্বাস করা ঠিক হয় নাই। আমি সত্ এবং ন্যায়বান, ধরে নিই সবাই বুঝি আমার মতন। আমি তখনও জানি না যে শেয়াল মলম পার্টিতে যোগ দিয়েছে। সে আমার দুই চোখেমলম লাগিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখে কী যন্ত্রণা! চোখে কিছু দেখি না, কোন দিকে যাচ্ছিকিছুই বুঝতে পারি না। একটা লাফ দিয়েছি, ভুল করেখাঁচার ভেতরেই ঢুকে গেছি। সঙ্গে সঙ্গে খাঁচার দরজা বন্ধ করে শেয়াল তালা মেরে দিয়েছে। সেই থেকে আমি এখনো খাঁচারভেতরে আটকা। খবর পেয়েছি শেয়াল ক্রসফায়ারে মারা পড়েছে। পণ্ডিত চিনি মজুদ করে ব্যবসা করে অনেক টাকাকামিয়েছে। আমি বন্য পশু অধিদপ্তরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। একদিন নিশ্চয়ই আমি যুক্ত হব, আবার সুন্দরবনে ফিরে যাব। ফিরে যাওয়ার আগে আমিসংবাদ সম্মেলন করে সত্য কথাটি সবার সামনে প্রকাশ করে যাব। যতদিন সেটা না হচ্ছে ততদিন আমি সবাইকে জানাতে চাই আমি দুষ্টু বাঘ নই, আমি ষড়যন্ত্রের শিকার একটি অবহেলিত, নির্যাতিত নিপীড়িত বাঘ। বইপত্রে আমাদের সম্পর্কেলেখা মিথ্যা গল্প পড়ে কেউযেন আর বিভ্রান্ত না হন।
শিকারী
সানি ডাইনিং টেবিলে বসে ট্রনকে বলল, ‘আমাকে এক কাপগরম কফি দাও। কুইক।’ ট্রন সানির কাজকর্মে সাহায্য করার জন্য সদ্য কিনে আনা একটা গৃহস্থালি রোবট। সে বলল, ‘গরম কথাটি খুবই আপেক্ষিক। কারও কারও কাছে মনে হয় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হচ্ছে গরম। কেউ কেউ মনে করে, ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হচ্ছে গরম। কাজেই আপনার সুনির্দিষ্টভাবে বলা উচিত আপনি কত তাপমাত্রার গরম কফি চান।’ সানি খেঁকিয়ে উঠে বলল, ‘ব্যাটা বুদ্ধু কোত্থাকার। সোজা জিনিসটাও তোমার ঘিলুতে ঢোকানো যায় না।’ ‘আপনি কয়েকটা শব্দ ব্যবহার করেছেন যাদের মাঝে কোনো সমন্বয় নেই। আপনি ব্যাটা শব্দ ব্যবহার করেছেন। আমার ডিকশনারিতে ব্যাটা শব্দের অর্থ পুরুষ মানুষ। অথচ আমি পুরুষ বা মহিলা কিছু নই। আমি একটি রোবট, আপনি ঘিলু শব্দটা ব্যবহার করেছেন কিন্তু একটা বাচ্চাও জানে, রোবটের ঘিলু থাকে না। তাদের থাকে কপোট্রন।’ সানি মাথা ধরে বলল, ‘চোপ! চুপ করে আমি যা বলছি তা-ই করো। এক কাপ গরম কফি।’ ‘তাপমাত্রা?’ সানি মুখ ভেংচে বলল, ‘৮০ দশমিক ৩৭। এবারে হয়েছে?’ ট্রন টিটকারিটুকু বুঝতে পারল না। শান্তভাবে বলল, ‘হয়েছে। আমি এক্ষুনি নিয়েআসছি।’ চোখের পলকে ট্রন এক কাপ গরম কফি নিয়ে এল। সানি সেই কফির মগ হাতে নিয়ে যখন চুমুক দেবে, ঠিক তখন ট্রন কফির মগটা ছিনিয়ে নিয়ে গেল। সানি বলল, ‘সেকি! সেকি! কী করছ তুমি?’ ‘তাপমাত্রা ৮০ দশমিক ৩৭ থেকে কমে ৩৬ হয়ে গেছে।’ সানি চিত্কার করে বলল, ‘হয়েছে তো হয়েছে। আমি সেটাই খাব। কফির মগটা এক্ষুনি নিয়ে এসো আমার কাছে।’ ট্রন বলল, ‘আপনি বিভ্রান্তিমূলক কথা বলছেন। একবার বলছেন তাপমাত্রা দরকার ৮০ দশমিক ৩৭, আবার বলছেন ৮০ দশমিক ৩৬-তেই কাজ চলে যাবে। সানি অনেক কষ্ট করে নিজেকে শান্ত করে বলল, ‘ট্রন, তুমি আমার সামনে দাঁড়াও। আমি তোমাকে কয়েকটা কথা বলি।’ ট্রন সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, ‘বলেন।’ ‘তোমাকে কয়েকটা জিনিস বলি, তুমি সেটা মন দিয়ে শোনো এবং মনে রেখো, ঠিক আছে?’ ‘আমাদের ইলেকট্রনিক মেমোরি। আমরা মানুষের মতো নই। আমরা কিছু ভুলি না।’ ‘গুড। তোমাদের তৈরি করা হয়েছে মানুষকে সাহায্য করার জন্য। কাজেই তোমাদের মানুষের চরিত্র বুঝতে হবে। মানুষ সিদ্ধান্তহীনতা পছন্দ করে না। মানুষ সব সময় সিদ্ধান্ত নিতে চায়। তার মাঝে খুঁটিনাটি পছন্দ করে না, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চায়।’ ‘বুঝেছি।’ ‘যেমন আমি বলেছি তোমাকে এক কাপ গরম কফি দেওয়ার জন্য। এখন তুমি যদি গরম শব্দটার ব্যাখ্যা নিয়েই দিন পার করে দাও, তাহলে হবে না। গরম বলতে কী বোঝাই, সেটা জানতে হবে, তার ওপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ ‘কিন্তু—’ ট্রন কিছু একটা বলতে চাইছিল, সানি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘তোমার কিছু বলার প্রয়োজননেই। আজকে সারা দিন তুমি আমার সঙ্গে থাকো। তুমি দেখো আমি কীভাবে কাজ করি।সেটা দেখে শেখো। তুমিও যদি সেভাবে কাজ করতে পারো, তাহলে আমি তোমাকে ব্যবহার করতে পারব। যদি না পারো, তাহলে তোমাকে ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া কোনো গতি থাকবে না।’ ‘আমাকে ফিরিয়ে দেওয়া হলে আমাদের কোম্পানির সুনাম নষ্ট হবে,’ ট্রন বলল, ‘আমি চেষ্টা করব আপনার সঙ্গে থেকে আপনার কাছ থেকে শিখতে।’ ‘চমত্কার!’ ট্রন জানতে চাইল, ‘আপনি আজসারা দিন কী করবেন?’ ‘শিকার করতে যাব।’ ‘শিকার? আমার ডিকশনারি বলছে, শিকার অর্থ পশুপাখিহত্যা করা। পশুপাখির বুদ্ধিবৃত্তি মানুষ থেকেকম। কাজেই মানুষ যদি তাদের হত্যা করতে চায়, তারা কোনোভাবেই নিজেদের রক্ষা করতে পারবে না। এটিএকটি অসম প্রতিযোগিতা।’ সানি বিরক্ত হয়ে টেবিলে থাবা দিয়ে বলল, ‘এই যে তুমি আবার ঘ্যান ঘ্যান শুরু করেছ। আমি তোমাকে বলেছি, বাজে তর্ক না করে সিদ্ধান্ত নিতে শেখো। শিকার করা মানুষের একটা প্রাচীন স্পোর্টস। মানুষহাজার হাজার বছর আগে থেকেশিকার করে আসছে, ভবিষ্যতেও হাজার হাজার বছর ধরে শিকার করবে। কাজেই এটা অসম প্রতিযোগিতা কি না, সেটা আমি তোমার কাছে শুনতে চাইনা। বুঝেছ?’ ট্রন বলল, ‘বুঝেছি।’ ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই সানি ট্রনকে নিয়ে বনভূমিতে চলে এল। বড় একটাহ্রদের পাশে পাইনগাছের সারি। পেছনে পাহাড়, পাহাড়ের চূড়ায় মুকুটের মতো সাদা বরফ। সামনে বিস্তৃত বিশাল উপত্যকা, সেখানে ঘন সবুজ গাছ। সানিমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘আহ্! কী মায়াময় পরিবেশ!’ ট্রন বলল, ‘আমার ডিকশনারিতে মায়া শব্দটিরঅর্থ হিসেবে রয়েছে কারও জন্য স্নেহ অনুভব করা। একটা প্রাকৃতিক দৃশ্যের বেলায়—’ ট্রন বাক্যটা শেষ করতে পারল না, সানি তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘তুমি বাজে বকবক করবে না।যেটা বলছি সেটা শোনো। কপোট্রনে জমা করে রাখো।’ ‘অবশ্যই, অবশ্যই সেটা করব।’ ঠিক তখন একঝাঁক পাখি আকাশথেকে উড়ে নিচে নেমে আসে, হ্রদের ওপর দিয়ে একটা চক্কর দিয়ে সেটা কাছাকাছি পানিতে নামতে থাকে। সানির চোখ উত্তেজনায় চকচক করতে থাকে, সে ফিসফিস করে ট্রনকে বলল, ‘বন্দুকটা দাও।’ ট্রন সানির হাতে বন্দুকটা ধরিয়ে দেয়, সে সেটা হাতে নিয়ে গুড়ি মেরেএগিয়ে যায়। হ্রদের কাছাকাছি পৌঁছে একটা বড় গাছের আড়ালে লুকিয়ে বন্দুকটা তুলে সে গুলি করল। গুলির শব্দ দূর পাহাড় থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে, সঙ্গে সঙ্গে সবগুলো পাখি কর্কশ শব্দ করে ডাকতে ডাকতে উড়েগেল, শুধু তিন-চারটা পাখিহ্রদের পানিতে পড়ে ডানা ঝাপটাতে থাকে। সানি পানিতে নেমে পাখিগুলো তুলে নিয়ে আসে। ট্রনও সামনে এগিয়ে যায়, পাখিগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখে বলল, ‘পাখিগুলো অনেক বড় আর শক্তিশালী।’ ‘হ্যাঁ’, সানি বলল, ‘দেখতেওসুন্দর।’
ট্রন বলল, ‘আমার সৌন্দর্যের অনুভূতি নেই।তবে এই পাখিগুলোর জীবনীশক্তি অনেক বেশি। গুলি খাওয়ার পরও মরেনি, ছটফট করছে।’ সানি বলল, ‘আমার শিকারির চাকুটা দাও।’ ট্রন সানির ব্যাগ থেকে শিকারির ধারালো চাকুটা বের করে দেয়। সানি সেটা দিয়ে পাখিগুলোকে জবাই করে নেয়, পাখিগুলো তখন কয়েকবার পাখা ঝাপটিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ট্রন জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কী করলে?’ ‘পাখিগুলোর কষ্ট দূর করে দিলাম। গুলি খেয়ে যন্ত্রণা সহ্য করছিল, এখনকোনো যন্ত্রণা নেই।’ ‘ও!’ ‘অহেতুক কাউকে কষ্ট দিতে নাই।’ ট্রন তার এক হাতে সানির রাইফেল এবং বন্দুক, অন্য হাতে মৃত পাখিগুলো এবং পিঠে তার ব্যাগটা নিয়ে সানির পিছু পিছু হাঁটতে থাকে। সানি বাইনোকুলারটি চোখে লাগিয়ে তাকায়, বহু দূরে উপত্যকার নিচে সে অনেকগুলো হরিণকে দেখতে পেল। সানির চোখ আবার উত্তেজনায় চকচক করে ওঠে, সে ট্রনকে বলল, ‘তুমি আমাকে রাইফেলটা দাও। আমি তাড়াতাড়ি চলে যাই, তুমি পিছু পিছু আসো।’ ‘তুমি কী করবে?’ ‘ওই যে দূরে হরিণের পাল, দেখি, শিকার করতে পারি কিনা।’ সানি তার রাইফেলের ম্যাগাজিনে গুলি ভরে নিচের দিকে নামতে থাকে, ট্রন পেছন পেছন যেতে থাকে। সে গৃহস্থালি রোবট,তাই সে দ্রুত কোথাও যেতে পারে না, আস্তে আস্তে হেলতে-দুলতে যেতে হয়। ট্রন দেখতে পেল, সানি কাছাকাছি গিয়ে আবার একটা ঝোপের আড়াল থেকে গুলি করল, সবগুলো হরিণ তখন ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালিয়ে যায়, শুধু একটা হরিণী নিচে পড়ে ছটফট করতেথাকে। ট্রন যখন কাছে পৌঁছাল, তখনো সেটি বেঁচে আছে। হরিণীটি তার কালো চোখ দিয়ে ট্রনের দিকে তাকিয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছিল, ট্রন কয়েক মুহূর্তসে দিকে তাকিয়ে থেকে সানিকে জিজ্ঞেস করল, ‘এটা এখনো বেঁচে আছে?’ ‘হ্যাঁ, নিশানা ঠিক হয় নাই, গুলিটা যেখানে লাগাতে চেয়েছিলাম, সেখানে লাগাতে পারিনি। হরিণটা উঠতে পারছে না, উঠতে পারলে নিশ্চয়ই পালানোর চেষ্টা করত।’ ট্রন বলল, ‘বুদ্ধিহীন নির্বোধ প্রাণী।’ ‘হ্যাঁ। তবে গুলির আঘাতে কষ্ট পাচ্ছে। যন্ত্রণাটাদূর করে দেওয়া যাক।’ সানিতার রাইফেলটা দিয়ে গুলি করে হরিণীর মাথাটি চূর্ণ করে দিল। হরিণীটা কয়েকবার তার পাগুলো নাড়িয়ে নিশ্চল হয়ে যায়। ট্রন বলল, ‘যন্ত্রণার অবসান হয়েছে?’ সানি মাথা নাড়ে, ‘হ্যাঁ, যন্ত্রণার অবসান করে দিয়েছি। অহেতুক কোনো প্রাণীকে কষ্ট দেওয়া ঠিক নয়।’ ঠিক এ রকম সময় কাছাকাছি ঢাল থেকে একটা ছোট পাথর গড়িয়ে নিচে নেমে আসে। সানি ওপরের দিকে তাকাতেই তার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। একটা পাহাড়ি ছাগল একটা পাথরের ওপর থেকে আরেকটা পাথরে লাফ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সানি বলল, ‘আমার সবচেয়ে প্রিয় শিকার পাহাড়ি ছাগল।’ ‘কেন?’ ‘এরা ক্ষিপ্র, এরা পাহাড়ের পাথর বেয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ওপরে উঠে যায়। পাহাড়ি ছাগল শিকার করা এক ধরনের চ্যালেঞ্জ।’ ‘তুমি এই চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করবে?’ ‘হ্যাঁ। রাইফেলটা রাখো, আমি শটগানটা নিয়ে যাই।’ সানি ডাবল ব্যারল শটগানে দুটো কার্তুজ ভরে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘তুমি এখানে অপেক্ষা করো, আমি আসছি।’ সানি সাবধানী ভঙ্গিতে পাথরে ভর দিয়ে ওপরে উঠতে থাকে। পাহাড়ি ছাগলটা নিজের মনে ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছিল, হঠাত্ সেটা সানিকে দেখতে পায়। সঙ্গে সঙ্গে সেটা ওপরের দিকে ছুটে যেতে থাকে। সানি আর দেরি করল না, শটগানটা তুলে পরপর দুটো গুলি করল। পাহাড়ি ছাগলটা একটা আর্তনাদ করে, তারপর ওপর থেকে গড়িয়ে নিচে পড়তেথাকে। সেটা সোজা সানির দিকে গড়িয়ে আসছিল, সানি একটু সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। তার পরও সেটা এসে সানিকে ধাক্কা দেয়। সানি তাল সামলাতে পারে না, পা হড়কে পড়ে গেল। সে হাত দিয়ে একটা পাথরকে খামচে ধরে নিজেকে থামানোর চেষ্টা করল, পারল না। পাহাড়ি ছাগলটার পিছু পিছু সেও গড়িয়ে নিচে এসে পড়ে। পাহাড়ি ছাগলটি তখনো প্রাণপণে চিত্কার করে ডাকছে। ট্রন হাতের রাইফেলটা নিয়ে এগিয়ে যায়। সানির কাছে গিয়ে উবুহয়ে বসে তার দিকে তাকাল, জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি মরেগেছেন?’ সানি মুখ বিকৃত করে বলল, ‘গাধার মতো কথা বোলো না। মরে যাব কেন? কিন্তু মনে হয় পায়ের হাড় ভেঙে গেছে।’সে পা-টা সোজা করতে গিয়ে যন্ত্রণার শব্দ করল, দেখতে দেখতে তার মুখ ঘামেভিজে ওঠে। ছাগলটা তখনো প্রাণপণে চিত্কার করছে। ট্রন উঠে দাঁড়িয়ে ছাগলটার কাছে যায়। কিছুক্ষণ সেটাকে লক্ষ করে তারপর রাইফেলটা দিয়ে গুলি করে ছাগলটার মাথাটা চূর্ণ করে দিল। সঙ্গে সঙ্গেই ছাগলটা একবার কেঁপে উঠে নিশ্চল হয়ে গেল। ট্রন তখন সানির কাছে ফিরেআসে। রাইফেলটা ধরে রেখে বলল, ‘ছাগলটার যন্ত্রণার অবসান করে দিয়েছি।’ সানি বিরক্ত মুখে বলল, ‘বেশ করেছ।’ ‘তোমারও কি যন্ত্রণা হচ্ছে?’ ‘পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ে পাভেঙে গেলে যন্ত্রণা হয়, সেটা তোমাকে বুঝিয়ে দিতে হবে? বেকুব রোবট কোথাকার!’ ‘বেশ।’ সানি একটা ক্লিক শব্দ শুনল। সে মাথা তুলে তাকাল, দেখল, ট্রন রাইফেলটা ওপরে তুলছে। সানি আতঙ্কিত সুরে জিজ্ঞেস করল, ‘কী করছ? কী করছ তুমি?’ ‘যন্ত্রণার অবসান করে দিচ্ছি।’ পরমুহূর্তে রাইফেলের শব্দটি পাহাড়ের ঢাল থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে।
সাহস
মহাকাশযানের অধিনায়ক জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি প্রস্তুত?’ অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মহাকাশযানের ক্রু ইগর কাঁপা গলায় বলল, ‘জি ক্যাপ্টেন, আমি প্রস্তুত।’ ‘তাহলে যাও, আশা করি শত্রুর সঙ্গে এই যুদ্ধে তুমি জয়ী হবে।’ ইগর তবু দাঁড়িয়ে থাকে, অগ্রসর হয় না। অধিনায়ক জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে?’ ‘ভয় করছে। মহাজাগতিক এই প্রাণীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে যেতে আমার ভয় করছে, ক্যাপ্টেন।’ ‘তোমার কোনো ভয় নেই, ইগর।’ ক্যাপ্টেন তার হাতের রিমোট কন্ট্রোল স্পর্শ করে বললেন, ‘তোমার ভয় আমি দূর করে দিচ্ছি।’ রিমোট কন্ট্রোল স্পর্শকরে মহাকাশযানের অধিনায়কইগরের মস্তিষ্কে বিশেষ কম্পনের বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ পাঠাতে শুরু করলেন। একটু পরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখনো ভয় করছে?’ ইগর মাথা নাড়ল, ‘না, ক্যাপ্টেন। এখন আর মোটেও ভয় করছে না।’ ‘তাহলে যাও, যুদ্ধ করতে যাও।’ ইগর হঠাৎ ঘুরে মহাকাশযানের অধিনায়কের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি কেনযুদ্ধ করতে যাব? তুমি নিজে কেন যাও না?’ অধিনায়ক চমকে উঠে বললেন, ‘কী বলছ তুমি?’ ‘আমি তোমাকে ভয় পাই নাকি? মোটেও ভয় পাই না।’ ইগর অস্ত্রটা মহাকাশযানের অধিনায়কের গলায় লাগিয়ে বলল, ‘ক্যাপ্টেন, তুমি যাও যুদ্ধ করতে। তা না হলে তোমার মাথা আমি ছাতু করেদেব।’ ক্যাপ্টেন কিছু বোঝার আগেই ইগর তাকে ধাক্কা মেরে নিচে ফেলে দেয়। হুমড়ি খেয়ে পড়ে গিয়ে ক্যাপ্টেন বুঝতে পারল রিমোট কন্ট্রোলে ইগরেরসাহসের বোতামে তিনি ভুল করে একটু বেশি জোরে চাপ দিয়ে ফেলেছেন। তার এখন বেশি সাহস হয়ে গেছে!
সিনাপ্সুঘুঁটিয়া
যন্ত্রটার নাম সিনাপ্সুঘুঁটিয়া। যেকোনো স্বাভাবিক মানুষইএই যন্ত্রের নাম শুনে আঁতকে উঠবে এবং এই নামটা উচ্চারণ করার চেষ্টা করলে তাদের দু-চারটা দাঁত ভেঙে যাবার অবস্থা হবে। কিন্তু মিয়া গিয়াসউদ্দিনের সে-রকম কিছুই হলো না, সে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে লেখাপড়া করলেও বিজ্ঞান খুব ভালোভাবে বোঝে। ইন্টারনেট থেকে সে কখনোই সুন্দরী নারীদের কেচ্ছাকাহিনী ডাউনলোড করেনি, সুযোগ পেলেই বিজ্ঞানের বিষয়-আশয় ডাউনলোড করে পড়েছে। কোন ক্রমোজমে কয়টা জিন−জিজ্ঞেস করলে সে বলেদিতে পারে; সব মিলিয়ে কয়টা কোয়ার্ক, আজব কোয়ার্ক কতটুকু আজব−সেটাও সে বলে দিতে পারে। তাই সিনাপ্সুঘুঁটিয়া নাম দেখেই সে বুঝে ফেলল এটা মস্তিষ্কেক ব্যবহার করারএকটা যন্ত্র, বাইরে থেকে স্টিমুলেশন দিয়ে এই যন্ত্র মানুষের মাথার সিনাপ্সকে ঘুঁটে ফেলতে পারবে, যার অর্থ তাকে বুঝিয়ে দিতে হলো না। সেদিন বিকেলেই সে খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনের পাতাটা নিয়ে তার বাবার সঙ্গে কথা বলতে গেল। গিয়াসের বাবা রাশভারী ধরনের মানুষ, বেশি কথা বলতে পছন্দ করেন না; গিয়াস পারতপক্ষে তার বাবার সামনে পড়তে চায় না।কিন্তু তার বাবা মোটামুটি টাকার কুমির এবং গিয়াসের টাকার দরকার হলে তার বাবার কাছে না গিয়ে উপায় নেই। বাবা তাকেদেখে ভুরু কুচকে বললেন, ‘কী ব্যাপার, গিয়াস?’ ‘বাবা, তোমার সঙ্গে একটা জরুরি কথা বলতে এসেছি। ‘কী কথা, তাড়াতাড়ি বলে ফেল।’ কোনো ভনিতা না করে গিয়াস সরাসরি কাজের কথায় চলে এল; বলল, ‘বাবা, আমি ঠিক করেছি একটা রেস্টুরেন্ট দিব। আমাকে কিছু ক্যাশ টাকা দিতে হবে।’ ‘ক্যাশ টাকা দিতে হবে? তোকে?’ ‘জি, বাবা। আমি দুই বছর পরতোমাকে সুদে আসলে ফিরিয়ে দেব।’ বাবা সোজা হয়ে বসে বললেন,‘তুই রেস্টুরেন্টের কী বুঝিস যে বলছিস দুই বছরে সব টাকা তুলে ফেলবি?’ ‘বোঝার দরকার নেই, বাবা। কারণ আমি ব্যবহার করব সিনাপ্সুঘুঁটিয়া।’ বাবা বিদঘুটে শব্দটা শুনে চমকে উঠলেন; বললেন, ‘সেটা আবার কী জিনিস?’ ‘আমাদের মস্তিষ্কেকর সিনাপ্সকে ঘুঁটে দেয়। আমাদের যা কিছু অনুভুতি, সেগুলো সবই আসে মস্তিষ্কক থেকে। তাই অনুভুতিটা সরাসরি মস্তিষ্কেক দিয়ে দেব।’ ‘সরাসরি মস্তিষ্কেক দিয়ে দিবি?’ ‘জি, বাবা। কেউ যখন খুব ভালো একটা কিছু খায়, তখন তার ভালো লাগার অনুভুতিটা আসলে তো মুখে বা জিবে হয় না, হয় মস্তিষ্কেক! আমি রেস্টুরেন্টে সিনাপ্সুঘুঁটিয়া লাগিয়ে রাখব, সেটা সেট করে রাখব সুস্বাদু মজার অনুভুতিতে। এখানে কাস্টমার যেটাই খাবে, সেটাইকেই মনে করবে সুস্বাদু। হু হু করে ব্যবসা হবে। সারা দেশের মানুষ খেতে আসবে আমার রেস্টুরেন্টে।’ বাবা কিছুক্ষণ শীতল চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন;তারপর তাঁর কী মনে হলো কেজানে, ড্রয়ার থেকে চেকবই বের করে খসখস করে বিশাল অঙ্কের একটা চেক লিখে ছেলের দিকে এগিয়ে দিলেন। প্রথম দিন যখন রেস্টুরেন্টটা খোলা হলো, সেদিন গিয়াস তার বাবাকে একটা টেবিলে নিয়ে বসাল। ওপরে আলো-আঁধারি একটা আলো, টেবিলে সুন্দর ন্যাপকিন, ঝকঝকে থালা, পাতলা কাচের গ্লাসে ঠান্ডা পানি। গিয়াস মেনুটা তার বাবার হাতে দিয়ে বলল, ‘বলো, বাবা, তুমিকী খেতে চাও।’ ‘কোনটা ভালো?’ ‘সবগুলোই ভালো।’ ’ঠিক আছে, পরোটা আর শিক কাবাব, তার সঙ্গে ইলিশ মাছের ভাজা আর একটু পোলাও, সঙ্গে খাবার জন্য লাচ্ছি।’ ‘খাওয়ার পর একটু দই-মিষ্টি দেব, বাবা?’ ‘দে।’ কিছুক্ষণের মধ্যেই ধুমায়িত খাবার চলে এল। বাবা খুবই তৃপ্তি করে খেলেন। ঢেঁকুর তোলা বড় ধরনের অভদ্রতা জেনেও একটা বড়সড় ঢেঁকুর তুললেন। গিয়াস জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন লেগেছে, বাবা?’ বাবা ঢুলুঢুলু চোখে বললেন, ‘আমি আমার জীবনে এরচেয়ে সুস্বাদু খাবার খাইনি। আমার ধারণা, বেহেশত ছাড়া আর কোথাও এত সুস্বাদু খাবার পাওয়া যাবে না। তোর বাবুর্চিকে ডাক, আমি তার হাতে চুমু খেয়ে যাই।’ গিয়াস হা হা করে হেসে বলল, ‘বাবা, এর সবই হচ্ছে সিনাপ্সুঘুঁটিয়ার গুণ। তুমি টের পাওনি তোমার মাথার কাছে একটা সিনাপ্সুঘুঁটিয়া বসানো আছে, আমি সেটা সেট করে দিয়েছি সুস্বাদু স্কেলে।তুমি যেটাই খেয়েছ, সেটাই তোমার মজা লেগেছে।’ ‘কিন্তু বাবুর্চি কি রাঁধেনি?’ গিয়াস বলল, ‘আমার বাবুর্চিদের একজনের বয়স এগারো বছর, অন্যজনের সাড়েবারো। সারা দিন পথেঘাটে প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়েবেড়ায়, রাতে এসে রাঁধে।’ ‘বলিস কী!’ ‘এরা রান্নার র-ও জানে না,প্লেটে খালি এটা-সেটা তুলে দেয়।’ ‘এটা-সেটা?’ ‘হ্যাঁ, বাবা। তুমি ভেবেছ তুমি খেয়েছ পরোটা আর শিক কাবাব, পোলাও, ইলিশ মাছ ভাজা, হ্যানো-ত্যানো! আসলে কী খেয়েছ জানো?’ ‘কী?’ ‘খানিকটা খবরের কাগজ, একটা পুরোনো গামছার টুকরো, মোমবাতি, পোড়া মবিল, শেভিং ক্রিম আর কাপড় ধোয়ার সাবান।’ বাবা চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘কী বলছিস তুই!’ ‘সত্যি বলছি, বাবা। সিনাস্পুঘুঁটিয়া অফ করে দিলেই তুমি তা বুঝবে। দেখতে চাও?’
বাবা কাঁপা গলায় বললেন, ‘দেখা।’ গিয়াস তার সিনাস্পুঘুঁটিয়া বন্ধ করে দিল এবং সঙ্গে সঙ্গে বাবা হড়হড় করে খবরের কাগজ, গামছার টুকরো, মোমবাতি, পোড়া মবিল, শেভিং ক্রিম আর কাপড় ধোয়ার সাবান বমি করে দিলেন। গিয়াস যে রকম আশা করেছিল,তার রেস্টুরেন্ট এর চেয়ে অনেক ভালো করে চলল। সে বাবাকে বলেছিল দুই বছর পরেই সে তার বাবাকে টাকাটা সুদে আসলে ফেরত দেবে, কিন্তু সে ছয় মাসেরমাথাতেই পুরো টাকা ফিরিয়ে দিল। রেস্টুরেন্টের ব্যবসা করে গিয়াস তার বাবার মতো টাকার কুমির না হলেও মোটামুটি টাকার গিরগিটি হয়ে গেল। তখন বাসা থেকে সবাই তাকে চাপ দিল বিয়ে করার জন্য। প্রথমে দুর্বলভাবে একটু আপত্তি করে শেষ পর্যন্ত সে বিয়ে করতে রাজি হলো। মেয়ের ব্যাপারে গিয়াস খুবই খুঁতখুঁতে। মেয়ের নাক পছন্দ হয় তো চুল পছন্দ হয় না। চুল পছন্দ হয় তো দাঁত পছন্দ হয় না। ডান চোখ পছন্দ হয়তো বাম চোখ পছন্দ হয় না। সবাই যখন আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছে, তখন হঠাৎ করে এক অপূর্ব সুন্দরী মেয়ের খোঁজ পাওয়া গেল। যারা তাকে দেখেছে, তাদের সবাই নাকি ট্যারা হয়ে গেছে। এইমেয়ে খুব সহজে সবার সামনেদেখা দেয় না, তাকে দেখতে হলে মায়ের একটা বুটিকের দোকানে গিয়ে দেখতে হয়। খোঁজ-খবর নিয়ে গিয়াস বুটিকের দোকানে মেয়েকে দেখতে গেল এবং দেখে তার চোখের পলক পড়ে না। দুধে-আলতায় গায়ের রং, রেশমের মতো চুল, চোখে অতলান্তের গভীরতা, ঠোঁট দুটি ফুলের পাপড়ির মতো, ঠোঁটের ফাঁকে দাঁতগুলো মুক্তার মতোন ঝকমক করছে। গিয়াস মেয়ের দিকে তাকাল, মেয়েটিও তার দিকে তাকিয়ে মোহিনী ভঙ্গিতে একটু হাসল এবং সেই হাসি দেখে গিয়াসের বুকের ভেতরটা নড়েচড়ে গেল। গিয়াস ফিসফিস করে বলল, ‘তুমি কি আমার হবে? মেয়েটি চোখের ভুরুতে বিদ্যুৎ ছুটিয়ে বলল, ‘কেন নয়?’ কাজেই যথাসময়ে ধুমধাম করে বিয়ে হলো। সুন্দরী বউখুবই লাজুক; লম্বা ঘোমটা দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছে। শেষে বাসররাতে বউয়ের মুখের ঘোমটা তুলে গিয়াস ভয়ে চিৎকার করে ওঠে, তাঁরবউয়ের জায়গায় যে বসে আছে তার চেহারা পুরোপুরি বানরের মতো! গিয়াস তোতলাতে তোতলাতে বলল, ‘তু-তু-তুমি?’ ‘হ্যাঁ, আমি।’ ‘কিন্তু তোমাকে তো অন্য রকম দেখেছি। অপরূপ সুন্দরী!’ ‘আবার হয়ে যাব।’ ‘কীভাবে?’ নতুন বউ তরমুজের বিচির মতো কালো দাঁত বের করে হেসে বলল, ‘কাল সকালেই মায়ের দোকানের সিনাপ্সুঘুঁটিয়াটা বাসায় এনে লাগিয়ে দেব!’ মিয়া গিয়াসউদ্দিন তোতলাতে তোতলাতে বলল, ‘সি-সি-সি…?’ এত দিন যে যন্ত্রটার নাম সে অবলীলায় বলে এসেছে, হঠাৎ করে সেই নামটা তার মুখেই আসতে চাইল না।

◊◊◊◊◊◊◊◊

সমাপ্ত

◊◊◊◊◊◊◊◊