Polaroid
শিবব্রত বর্মনের উপন্যাস
প্রচ্ছদ
||আলি বাবা ও চালিচার||
মর্জিনা মার্জার সকালবেলাতেই বাসায় একটা তুমুল হট্টগোলের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল মোহম্মদ আলির। প্রথমটায় তিনি ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারলেন না, ব্যাপারটা কী। তার মনেহলো, দুটি বিপরীতধর্মী বাদ্যযন্ত্র সুর-তাল-লয়হীনভাবে একসঙ্গে বাজানো হচ্ছে- একটি তীক্ষ্ম স্বরের, অন্যটি থেকে ভোঁতা ঘড়ঘড় আওয়াজ বেরুচ্ছে। তিনি বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠে শোবার ঘর থেকে বেরিয়েএলেন এবং তখন আওয়াজ দুটিরউৎস বোঝা গেল। তীক্ষ্ম হুইসেলের মতো আওয়াজটি বেরহচ্ছে তার স্ত্রী জমিলার কণ্ঠ থেকে। আর ভোঁতা ঘড়ঘড় আওয়াজ করছে জমিলার সখের বিড়াল মর্জিনা। মর্জিনার কিছু একটা হয়েছে। সে মেঝেতে মুখ ঘষতে ঘষতে এই বিদঘুটে শব্দটি করছে আর মাঝে মাঝেতিড়িং করে লাফিয়ে উঠছে। বিড়ালের এই দুরবস্থা দেখেজমিলা বিপর্যস্ত এবং সে মোহম্মদ আলিকে শাপশাপান্ত করছে। মর্জিনার ফুড পয়জনিং হয়েছে। বিষাক্ত কিছু একটাতার পেটে গেছে। কিন্তু মোহম্মদ আলি বুঝতে পারলেননা, এর পেছনে তাকে কেন দায়ী করা হচ্ছে। প্রাথমিক হট্টগোল থিতিয়ে এলে জানা গেল, রান্নাঘরে হরলিক্সের পুরনো খালি বয়ামে চিনির মতো যে সাদা পাউডার রাখা আছে, সেটি গেছে মর্জিনার পেটে। জমিলা চিনি ভেবে ওই সাদা দানাদার পাউডার দুই চামচ গুলিয়ে দিয়েছে মর্জিনার সকালের দুধ-ভাতের নাস্তায়। মর্জিনা বেশ চুকচুক শব্দ করে লেজ দুলিয়ে খেয়েছে। তারপর শুরু করেছে লাফালাফি, মেঝেতে মুখ ঘষা আর ঘড়ঘড় আওয়াজ। ওই পাউডার মর্জিনার দুধের বাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার কাজটি করেছে জমিলা নিজে। অথচ ভুলের দায় সে এখন তুলে দিতে তৎপর মোহম্মদ আলির ঘাড়ে। কেননা মোহম্মদ আলিইহরলিক্সের বয়ামে অজ্ঞাতকুলশীল পাউডারটা ঢেলে রেখেছিলেন। ইতিমধ্যে মর্জিনার শরীর নিস্তেজ হয়ে এসেছে। সে মেঝেতেই ঘুমিয়ে পড়েছে বলেমনে হচ্ছে। এই সাদা পাউডারের বিষাক্তপ্রতিক্রিয়া কতদূর যাবে, অনুমান করার উপায় নেই। কেননা পাউডারটা যে ঠিক কীদিয়ে তৈরি, এ দিয়ে কী করা হয়, মোহম্মদ আলির জানা নেই। বাসার কারোরই জানা নেই। এর নীল রঙের প্যাকেটের গায়ে তুর্কি ভাষায় কী কী যেন লেখা ছিল। পড়ে বোঝার উপায় নেই।মোহম্মদ আলির ভাতিজা আনোয়ার আহমেদ তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহর থেকে সম্প্রতি দেশে ফেরার সময় নানান জনের জন্যে ব্যাগ ভরে নানারকম উপহারসামগ্রী এনেছে। মোহম্মদ আলিদের ভাগে যেসবউপহার পড়েছে, তার অধিকাংশই প্রসাধন সামগ্রী। সবগুলোর গায়ে তুর্কি ভাষায় লেবেল লাগানো। তবে সেগুলোর পরিচয় বুঝতে সমস্যা হয়নি।কোনোটা শ্যাম্পু, কোনোটা কন্ডিশনার, কোনোটা কোল্ড ক্রিম, একটা সাবানও ছিল। আর ছিল এই নীল রঙের প্যাকেটটা। দেখতে ডিটারজেন্টের প্যাকেটের মতো। প্রথমটায় মনে হয়েছিলডিটারজেন্টই হতে পারে। কিন্তু পরে দেখা গেছে, তা নয়। কিছুতেই উদ্ধার করা গেল না জিনিসটা কী, এ তাদের কী কাজে লাগবে। একবার ভেবেছিলেন আনোয়ারকে জিজ্ঞেস করবেন। কিন্তু আনোয়ার এর মধ্যে দুবার এ বাসায় বেরিয়ে গেছে। তিনি জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছেন। বিদেশী সুদৃশ্য প্যাকেট, ফেলেও দেওয়া যায়নি। কাঁচি দিয়ে প্যাকেট কেটে আনোয়ার সাহেব চিনির মতো দানাদার পাউডার ঢেলে রেখেছেন হরলিক্সের খালি বয়ামে। সেটাকে চিনি ভেবে যাতে ভুল করা না হয়, এ জন্যে বয়ামটা রাখা হয়েছিল একটা উঁচু তাকে পিছনের সারিতে।সেটা কিভাবে নিচের তাকে নেমে সামনের সারিতে চলে এসে আজ সকালে এই লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়েছে কে জানে। এখন পুরো ঘটনার দায়বর্তেছে মোহম্মদ আলির ওপর। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই - এই বাসায় যে কোনো অঘটনেরই দায় কোনো নাকোনোভাবে তাকেই বহন করতে হয়। মোহম্মদ আলি মনে মনে ভাবলেন, ভাগ্যিস এ ভুলের খেসারত অবলা বেড়ালটার ওপরদিয়েই যাচ্ছে। সকালবেলায় যদি চিনি ভেবে এই সাদা পাউডার তার চায়ের কাপে মিশিয়ে দেওয়া হতো, বা জমিলার কাপে! সর্বনাশ! জমিলা এখন ঘুমন্ত মর্জিনাকে কোলে নিয়ে কান্নাকাটি করছে। প্রথমটায় তার মনে হয়েছিল, মর্জিনা মারা যাচ্ছে। কিন্তু সে ভুল ভেঙ্গেছে। বেড়ালটা আসলে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। আরাম করেই ঘুমাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। হরলিক্সের বয়ামটা আবার আগের জায়গায় চলে গেল। ফেলে দিতে গিয়েও সেটা আর ফেলে দেওয়া হলো না। জমিলা কান্নাকাটি শেষ করেআরেক দফা হৈ-চৈ শুরু করতে পারে এই আশঙ্কায় মোহম্মদ আলি বাসা থেকে আগাম সটকে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। দ্রুত জামাকাপড় পাল্টে তিনি সকাল বেলার চা না খেয়েই অফিসের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লেন। তার মাথায় তখন আরো বড় দুশ্চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।
২ নং ছবি
ভবঘুরে দার্শনিক ‘অফিসে গেলাম!’ বলে কাঁঠালবাগানের বাসা থেকে বেরিয়ে খানাখন্দে ভরা রাস্তায় নেমে এলেন মোহম্মদ আলি। নামতেই তার ঘিয়া রঙের প্যান্টের নিচের দিকটায় খানিকটা কাঁদা ছিটিয়ে গেল একটা প্রাইভেট কার। মোহম্মদ আলি তার অফিসের উল্টাদিকে হাঁটা দিলেন। অফিস তার গন্তব্য নয়। গত দেড় সপ্তাহ ধরেই তিনি অফিসে যাচ্ছেন না। তার চাকরি চলে গেছে। নিজের দোষে যায়নি। আরেক জনের ভুলের দায় তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তার চাকরিটা খেয়ে ফেলা হয়েছে। অফিসে একেবারে নিচের সারির কেরানি গোছের কর্মী তিনি।সবচেয়ে চুপচাপ, সবচেয়ে নিরীহ। তাই উপরের কর্মকর্তার ভুলের দায় তারওপর চাপিয়ে দেওয়াই সবচেয়েসহজ কাজ। যার ভুল, ইনকোয়ারির দায়িত্বও তাকেই দেওয়া হয়েছিল। এর ফলাফল আর কী হতে পারে! চাকরি যাওয়ার দুঃসংবাদ বাসায় জমিলাকে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেননি মোহম্মদ আলি। কী লাভ সংসারে অশান্তি বাড়িয়ে। জমিলা এমনিতেই উঠতে-বসতে নানাভাবে খোটা দেয়। বাঁকা স্বরে, স্বৈষাত্মক ভঙ্গিতে প্রায়ই বলে, ‘এই যে আলিবাবা! তোমার লম্বা কাহিনি কবে শেষ হবে!’ লম্বা কাহিনি মানে সংসারেঅনটনের কাহিনি। সেটা লম্বাই বটে। লম্বা এবং আরব্য রজনীর গল্পের মতোই অন্তহীন, গুটি পাঁকানো। একটা গল্প থেকে ডালপালা বের হয়ে আরেকটা গল্প, সেখান থেকে আরেকটা। অভাব-অনটনের ডালপালা শেষ হয় না। মোহম্মদ আলির মাঝেমাঝে মনে হয়, খোঁটা দেওয়ার জন্যে হলেও নামটা জমিলা মন্দ দেয়নি: মোহম্মদ আলি থেকে আলিবাবা। আলিবাবা ও চল্লিশ চোর। আরব্য রজনীর সবচেয়ে পরিচিত গল্প। এই যে হুট করে তার চাকরিটা চলে গেল, এটাও ওই গল্পেরই আরেকটা নতুন শাখা। এরকম ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দেন মোহম্মদ আলি। আর প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার নাম করে বাসা থেকেবের হয়ে চাকরির খোঁজে নামেন। সারাদিন টো-টো করেঘোরেন। ঠিকানা ধরে পুরনো বন্ধু বা চেনা-আধচেনা লোকজনের কাছে চলে যান। ইনিয়ে-বিনিয়ে নানান গল্প ফেঁদে পরোক্ষভাবে জানিয়ে দেন যে, তিনি একটা চাকরি খুঁজছেন। সরাসরি বলতে বাঁধে। মধ্যবয়সে চাকরি পাওয়া খুবকঠিন। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে গেলে একটা পেপার কিনেপার্কের বেঞ্চে বসে চাকরির বিজ্ঞাপন ঘাঁটেন। দুপুরের পর পার্কেরই বেঞ্চে একটা ঘুম দিয়ে বিকেলবেলা আবার উদ্দেশ্যহীন হাঁটতে হাঁটতে বাসায় ফেরেন। এভাবে ঘুরে বেড়াতে তার মন্দ লাগছে না। মোহম্মদ আলি লক্ষ্য করেছেন, ধীরে ধীরে চাকরি খোঁজার ব্যাপারটা গৌণ হয়ে যাচ্ছেতার কাছে। ঘুরে বেড়ানোটাইমুখ্য হয়ে উঠছে। পথিকের মাথায় কোনো উদ্দেশ্যের তাড়া না থাকলে তখন রাস্তাটা চোখের সামনে নিজেকে মেলে ধরে। জগৎ সংসার নিজের উপস্থিতি প্রকাশ করে। টুকরো টুকরো নানান জিনিস চোখে পড়ে তখন,যেগুলো আগে চোখে পড়তো না।খুব মামুলি সব জিনিসপত্র:ট্রাফিক সিগনাল কিভাবে জ্বলে-নেভে, রোদ সরে যেতে শুরু করলে কিভাবে ভিক্ষুকরা ফুটপাথে জায়গা বদলায়, কিভাবে ভাড়া নিয়ে আরোহী আর রিকশাওয়ালার মধ্যে তর্ক বেঁধে যায় ইত্যাদি। আপাত বিচ্ছিন্ন এইসব ঘটনার মধ্যে নতুন নতুন যোগসাজশ আবিষ্কার করেন মোহম্মদ আলি। ধরা দেয় নতুন নতুন প্যাটার্ন।একটা ঘটনার সঙ্গে আরেকটা মিলিয়ে তৃতীয় একটা গল্প তৈরি করে ফেলা যায়। আরব্যরজনীর গল্পের মতোই। অন্তহীন। আজও বাসা থেকে বেরিয়ে প্যান্টের এক কোণায় ছোপ ছোপ কাদা নিয়ে তিনি উদ্দেশ্যহীন হাঁটা দিলেন। তবে আজকের দিনটা অন্য দিনগুলোর মতো নয়। আজকের দিনে মোহম্মদ আলির জীবনে এমন একটা ঘটনা ঘটবে, যা তার পুরো জীবনটাকে পাল্টেদেবে।
প্রচ্ছদ
চালিচার ফার্মা একটা আধা বাণিজ্যিক এলাকাপেরিয়ে মহল্লার রাস্তায় নেমে এলেন মোহম্মদ আলি। রাস্তাটা প্রশস্ত। তবে ভারি যানবাহন চলে না। দূরথেকে মেইন রোডের শোরগোলেরভোঁতা গোঁ-গোঁ আওয়াজ পাওয়া যায়। ফুটপাথের যেদিকটায় দরদালানের ছায়া পড়েছে, সেদিকটা ধরে হাঁটছিলেন মোহম্মদ আলি। হাঁটতে হাঁটতে একটা দোতলা ভবনের সামনে এসে তার পা থেমে গেল। ভবনের সামনে ঝোলানো সাইনবোর্ডটা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে : “চালিচার ফার্মাসিউটিক্যালস” নামটা খুব ভালো লাগলো তার: চালিচার। অর্থ বোঝা যাচ্ছে না। বিদেশী কোনো শব্দ হবে। চাইনিজ? কোরিয়ান? নাকি স্প্যানিশ? কে জানে। ফার্মাসিউটিক্যালস নাম থেকে অনুমান করতে হয়, এটা ওষুধ তৈরীর কোনো প্রতিষ্ঠান হবে। হয়তো এটিই কারখানা। ভিতরে ওষুধতৈরী হয়ে থাকে। অথবা এটা দাপ্তরিক কার্যালয়। কারখানা দূরে কোথাও : সাভার বা গাজীপুরে। ভবনটা আশপাশের ভবনগুলোর সঙ্গে একেবারে বেমানান। প্রাণহীন, গুমোট, স্তব্ধ একটা আবহাওয়া ঘিরে আছে বাড়িটাকে। বাইরে থেকে দেখলে কিছুতেই মনে হয় না ভেতরে জীবন্ত কোনো প্রাণীআছে। একটা উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ভবন প্রাঙ্গণ। পাঁচিলের সঙ্গে প্রায় লাগোয়াই ভবনটা। দোতলার জানালা খাঁচার মতো গ্রিল দিয়ে আটকানো। সব জানালা সিল করা। সামনে ভারি লোহার বড় একটা গেট। কোনো দারোয়ান নেই। এই গেট কোনোকালে খোলে বলে মনে হলো না মোহম্মদ আলির। ভবনটা দেখলে সবার আগে প্রাচীন কোনো দুর্গের কথামাথায় আসে, কারো প্রবেশ অসম্ভব করে তোলাই যেটির প্রধান উদ্দেশ্য। বা কোনোঅপ্রবেশ্য গুহা। ভবনটার সামনে দাঁড়ালে কেমন একটা অস্বস্তি তৈরি হয় মনের মধ্যে। গা ছমছম করে। মোহম্মদ আলি কিছুক্ষণ সেটার সামনে দাঁড়িয়ে থেকেদেখতে পেলেন, উল্টোদিকে একটা ছোলাবাদামওয়ালা কাঠের ট্রাইপডে গামলা রেখে ছোলা বিক্রি করছে। তিনি রাস্তা পেরিয়ে বাদামওয়ালার পাশে গিয়ে দু-টাকার ছোলা বাদাম কিনলেন। তারপর ছোলা চিবাতে চিবাতে তাকিয়ে থাকলেন চালিচার ফার্মার অদ্ভুত বাড়িটার দিকে। এবার বাড়তি দুয়েকটা জিনিসচোখে পড়লো তার: গেটের এক কোণায় ছোট আরেকটা প্লেটে লেখা : ‘প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত’। লোহার সদর দরজাটার এক পাশে দেয়ালে বসানো একটি ছোট্ট কালো ইলেকট্রনিক বক্স। তাদের অফিসেও কাচের প্রবেশ দরজার পাশে এররকম ইলেকট্রনিক বক্স আছে। এই বক্সের গায়ে ইলেকট্রনিক পরিচয়পত্র ছুঁয়ে দিলে ‘বিঁ...ই...প!’ করে একটা যান্ত্রিক শব্দ তুলে কাচের দরজা খুলে যায়। দরজা খোলার পাশাপাশি যন্ত্রটি কে-কখন অফিসে ঢুকলো-বেরুলো সেই হিসাবও রাখে। মোহম্মদ আলি ছোলা বাদাম চিবাতে চিবাতে বাড়িটার ওপর নজর বোলাতে লাগলেন। কেন এভাবে নজর বোলাচ্ছেন, তিনি জানেন না। এখানে এই চালিচার ফার্মাসিউটিক্যালসে চাকরির তদ্বির করার ক্ষীণকোনো চিন্তাও তার মাথায় উঁকি দিচ্ছে না। তবে এটা যে চাকরি খোঁজা নামক একটি বৃহত্তর, অনির্দিষ্ট, আকারহীন প্রকল্পেরই অংশ - এমন একটা অবচেতন চিন্তা রোদেরমধ্যে তার দাঁড়িয়ে থাকার পেছনে অদৃশ্য যুক্তি হিসেবে কাজ করছে। যুক্তি ছাড়া আধুনিক মানুষের চলা কঠিন। এভাবে মিনিট বিশেক দাঁড়িয়ে ছিলেন মোহম্মদ আলি। রাস্তা দিয়ে সাইকেল-রিকশা আসছে যাচ্ছে। বেশ কিছু প্রাইভেট কারও চলাচলকরছে। মাঝে মাঝে কোনো কারণ ছাড়াই কিছুক্ষণের জন্য যানজট লেগে যাচ্ছে। হঠাৎ একটা কালো প্রাইভেট কার দ্রুত বেগে এসে চালিচার ফার্মাসিউটিক্যালসের ভবনটার সামনে কড়া ব্রেক কষলো। গাড়িটা লম্বাটে। মোটরগাড়ি সম্পর্কে মোহম্মদ আলির খুব বেশি ধারণা নেই। তবে এটুকু বুঝলেন, গাড়িটা নতুন, খুব দামি আর এরকম গাড়ি ঢাকার রাস্তায় খুব একটা চোখে পড়ে না। কালো অস্বচ্ছ কাচের কারণে গাড়ির ভেতরটাদেখা যাচ্ছে না। বাদামের ঠোঙ্গা হাতে মোহম্মদ আলি উৎসুক ভঙ্গিতে ঘাড় উঁচিয়েতাকিয়ে থাকলেন। গাড়িটার চারপাশের চারটা দরজা ঝট ঝট করে খুলে গেল। সেখান থেকে বের হলো কালো স্যুট, কালো জুতা পরা লম্বাটে ধরনের পাঁচটা লোক। তাদের সবার হাতে একটা করে কালো স্যুটকেস। চোখে কালো সানগ্লাস। পরিপাটি চুল, ব্যাকব্রাশ করা। মোহম্মদ আলির খুব অবাক লাগলো: পাঁচটি লোক আকারে-প্রকারে প্রায় একই রকম দেখতে, পার্থক্য যেটুকু আছে সেটা ঢাকা পড়ে গেছে একই রকম সাজপোশাকের কারণে। ফলে তাদেরকে মানুষমনে না হয়ে পাঁচটি রোবট মনে হচ্ছে। তাদের চলাফেরাও খুবই রোবোটিক, মাপা, ছন্দবদ্ধ। পাঁচটি লোকের একজনের কাঁধে একটা বাদামি কার্টন। কার্টনটা ভারিই মনে হচ্ছে, কেননা সেটার চাপে লোকটার কাঁধ কেমন একপাশে কেত্রে আছে। পাঁচটি লোকই গাড়ির দরজা বন্ধ করে লোহার গেটের সামনে দাঁড়ালো। এদের একজনকে দলনেতা মনে হচ্ছে।কেননা অন্যদের চেয়ে সে একটু এগিয়ে আছে। দলনেতা তার বুকপকেট থেকে একটা কার্ড বের করে গেটের পাশেদেয়ালে বসানো ইলেকট্রনিক বাক্সটার গায়ে ছোঁয়ালো। ‘বি....ই...প!’ শব্দ তুললো বাক্সটা। রাস্তার এইপার থেকেও সেটা শোনা গেল। তারপর দুপাশে সরে যেতে থাকলো লোহার গেটের দুটি ভারি পাল্লা। মোহম্মদ আলিএই প্রথম লক্ষ্য করলেন, পাল্লার নিচে ছোট ছোট লোহার চাকা লাগানো আছে, তাতে ভর দিয়ে গেট দুভাগ হয়ে খুলে যাচ্ছে। গেট পুরাটা খুলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলো লোকগুলো। তারপর গটগট করে ভেতরে ঢুকে গেল। এই পুরো সময়টা লোকগুলো আশপাশে কোনোদিকে তাকায়নি, একবারের জন্যেও না। যেন দূর্গের মতো এ বাড়িটাই মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু, জগৎ সংসারের আর সবকিছু তুচ্ছ। যে-কয়েকটা মুহূর্ত লোহার ফটক খোলা ছিল, ভিতরে কী আছে দেখার জন্যে উৎস্যুক তাকিয়ে ছিলেন মোহম্মদ আলি। কিছুই দেখা গেল না। ফটক থেকে একটা আর্চওয়ের মতো চলে গেছে মূল ভবনে। সেটার গোড়ায় সম্ভবত আরেকটি লোহার কালো গেট দেখতে পেলেন তিনি।
মাত্রইকয়েক ঝলক। ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাইরের গেটের পাল্লা আবার বন্ধ হয়ে গেছে। একজন উদ্দেশ্যহীন ভবঘুরের জন্য উৎসুক পথনাটকের এখানেই সমাপ্তি। আর কিছু দেখার নেই। থাকার কথা নয়। মোহম্মদ আলি শেষ হয়ে যাওয়া ছোলার ঠোঙ্গাটা একপাশে ফেলে দিয়ে হাঁটা দিলেন। কিন্তু কয়েক পা গিয়েই থেমে গেলেন তিনি। তার কিছু একটা মনে পড়েছে। কী সেটা? পাঁচটি লম্বা লোক গেটের ভিতরে ঢোকার আগমুহূর্তে একটা কিছু ঘটেছিল। দৃশ্যটি মোহম্মদ আলির চোখে পড়েছে। তার সব মনোযোগ তখন ছিল গেটের ভিতরের দৃশ্যের প্রতি। লোক পাঁচটির ওপর তার নজর ছিল না। কিন্তু তবু তার রেটিনার কোণায় দৃশ্যটি ধরা পড়েছে। কিন্তু কী সেটা? কী? হ্যাঁ, মনে পড়েছে: যে লোকটির কাঁধে ভারি কার্টনটি ছিল, সে ভেতরে ঢোকার আগমুহূর্তে বুক পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছেছিল। আর সে-সময় তার পকেট থেকে অসাবধানে কিছু একটা টুপ করে রাস্তায় পড়েছে। রাস্তায় মানে ফুটপাথে। ছোট্ট, চারকোণা কিছু একটা। লোকটাআর সেটা কুড়িয়ে নেয়নি। তার অজান্তে সেটি ঘটেছে। মোহম্মদ আলি রাস্তা পেরিয়ে আবার চালিচার ফার্মার গা ছমছমে বাড়িটারসামনে এসে দাঁড়ালেন। ওই তো, রাস্তায় এখনও পড়ে আছে চৌকোণা ছোট্ট জিনিসটা। মোহম্মদ আলি আশপাশে কয়েকবার তাকালেন। কেউ দেখছে না। ছোলাওয়ালা লোকটাও না। তিনি জিনিসটা হাতে তুলে নিলেন। প্লাস্টিকের একটা পরিচয়পত্র। সাদা। ওপরে ইংরেজি হরফে লেখা : চালিচার ফার্মাসিউটিক্যালস। আর কিছুই লেখা নেই। না কারো নাম, না কোনো পদবী বা কোনোঠিকানা- কিচ্ছু না। ধবধবেসাদা একটা ইলেকট্রনিক কার্ড। মোহম্মদ আলি সেটা হাতে ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। জিনিসটা তার মালিকের হাতেফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিৎ। কিন্তু কিভাবে?রাস্তাঘাটে থাকলে মানুষের মধ্যে পরোপকারের একটা প্রবণতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জেগে ওঠে। ওরকমই এক প্রবণতায় কার্ডটা হাতে নিয়ে রাস্তার উল্টোদিকে গিয়ে একটা রাধাচূড়া গাছের নিচেদাঁড়িয়ে থাকলেন মোহম্মদ আলি। লোকটা নিশ্চয়ই একটু পরে বেরিয়ে কার্ডটা খুঁজবে। বা ভবনের ভিতরে কাজ শেষ হয়ে গেলে বেরিয়ে এসে গাড়িটায় উঠবে। ফুটপাথের এক কোণায় গাড়িটাএখনও পার্ক করে রাখা। মোহম্মদ আলি টানা দুই ঘণ্টা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তার মনের মধ্যে পরোপকারের বাসনা বা যেটাকে অপ্রচলিত বাংলায় বলে উপচিকীর্ষা- সেটা এই দুই ঘণ্টায় অনেক কমে এলো। আরো পনের মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর তিনি হাঁটা দিলেন। কার্ডটা তার বুকপকেটেই থাকলো।
বুকপকেটে জোনাকিপোকা ‘মর্জিনার ঘুম ভেঙ্গেছে?’ জমিলা দরজা খুলে দিলে সবার আগে এই প্রশ্নটাই করলেন মোহম্মদ আলি। করার সময় লক্ষ্য রাখলেন, কণ্ঠে যাতে যথেষ্ঠ উদ্বেগ প্রকাশ পায়। জবাবের অপেক্ষা করতে হলো না। কেননা আধখোলা দরজার ফাঁক দিয়ে তার চোখে পড়লো, একটা ধূসর গোলাকার বস্তু বেতের সোফা থেকে লাফ দিয়েসেন্টার টেবিলটায় উঠে গেলআর তার লেজের ধাক্কায় টেবিল থেকে একটা পিরিচ মেঝেতে পড়ে ‘ঠ্.......ঠররররররররর!’ আওয়াজতুললো। ভাঙ্গেনি। যাক! বিড়ালটা বহাল তবিয়তেআছে। জমিলার মেজাজ-মর্জিও তাহলে একটু কম ছ্যাৎছ্যাতে থাকবে। বাসায় আজ শান্তি দরকার। নয়াপল্টন আর শাহজাহানপুরে দুটা ভিন্ন জায়গায় যেতে-আসতে খুব ধকলগেছে। প্রচুর ঘেমেছেন। ক্লান্তি এসে গেছে। জামা-কাপড় বদলে নিজে এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে পূব দিকের সংকীর্ণ বারান্দাটায় চেয়ার টেনে বসলেন মোহম্মদ আলি। ইচ্ছা, আয়েশ করে চা-টা খেয়ে সন্ধ্যাবেলায় বিছানায় একটু গড়ান দিয়ে নেবেন। চা প্রথম চুমুক দেওয়ার পরেই রান্নাঘর থেকে জমিলার কণ্ঠ: ‘আলিবাবা!’ ‘শুনছি, বলো!’ ‘ফ্রিজটা আজ আবার গড়বড় করছে। একটু দ্যাখো তো!’ ‘সমস্যাটা কী?’ ‘জিনিসপত্র ঠাণ্ডা হচ্ছে না। আর কোথা থেকে জানি পানি চোয়ায় পড়ছে।’ এই সেরেছে রে! গ্যাস বেরিয়ে গেছে বোধ হয়। মোহম্মদ আলির মুখটা তেতো হয়ে গেল। গ্যাস বেরিয়ে গেলে অনেক ঝক্কি। টাকাই শুধু বেরিয়ে যাবে না, ফ্রিজটা দিন দুয়েক ফেলে রাখতে হবে নিচে পাড়ার দোকানে। বাসায় ফ্রিজ না-থাকা মানে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যাওয়া। রান্নাঘর থেকে জমিলা আটা মাখা হাতে বারান্দায় চলে এসেছে। ‘তুমি দ্যাখো কী হয়েছে। সেইদিনই তো ঠিক করে আনলা।কী ঠিক করলো? শুধু শুধু পাঁচশোটা টাকা দিয়ে আসলা।’ ‘দেখছি।’ রাত ৯টা পর্যন্ত ফ্রিজ নিয়ে টানাটুনি গেল। শেষে পাড়ার দোকানেই সেটা নামিয়ে দিয়ে আসতে হয়েছে। সংকীর্ণ ডাইনিং স্পেসের যে কোণাটায় ফ্রিজ ছিল, এখনসেখানে একটা স্পর্শযোগ্য শূন্যতা। একদিনে এতো টানাটুনি বাহ্য হয়ে গেল মোহম্মদ আলির। রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় গা এলানোমাত্র রাত দশটাতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন তিনি। ঘুমের মধ্যে একটার পর একটা দুঃস্বপ্ন দেখতে থাকলেন। সবগুলোতেই কালো স্যুট পরাপাঁচটি লোক সানগ্লাস আঁটাচোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকলো। একটিতে তিনি দেখলেন, ওই পাঁচ জন তাকে জোর করে একটা বিশাল লম্বালিমোজিন গাড়িতে ঢুকিয়ে দিয়েছে। লিমোজিনের ভেতরে প্রশস্ত সোফা, টেবিল। সোফায় গম্ভীর মুখে বসে আছে একটা অস্বাভাবিক বেঁটে লোক। তারও গায়ে কালো স্যুট, চোখে কালো সানগ্লাস। লোকটা একটা পায়ের ওপর আরেকটা পা ভাঁজকরে নাচাচ্ছে। বিপর্যস্ত মোহম্মদ আলি তার সামনে বসতেই লোকটা হঠাৎ চেঁচিয়েউঠলো ‘চিচিং ফাঁক!’ আর তক্ষুণি ঘুম ভেঙ্গে গেল মোহম্মদ আলির। ঘরটা অন্ধকার। কোনো ডিম লাইট জ্বালানো হয় না এ ঘরে। নিচ্ছিদ্র অন্ধকার না হলে জমিলার ঘুম আসে না। কিন্তু ঘরটা পুরোপুরিঅন্ধকার নয়। একটা মৃদু আলোয় আলোকিত হয়ে আছে ঘর। বাইরে থেকে কি রাস্তার আলো আসছে কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে? মোহম্মদ আলি বালিশ থেকে মাথা তুললেন। না। বাইরে থেকে আসছে না আলোটা। আলোর উৎস ঘরের ভেতরেই কোথাও। মোহম্মদ আলি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারলেন, ঘরের দক্ষিণ কোণায় বাথরুমের দরজার পাশে রাখা আলনা থেকে আসছে আলোটা। আবছা নীলচে আলো। স্থির নয়। একটা নির্দিষ্ট ছন্দে ওঠানামা করছে আলোর আভা। মোহম্মদ আলি বিছানা থেকে নামলেন। হেঁটে আলনাটার কাছে গিয়ে খুব অবাক হয়ে গেলেন। মনে হচ্ছে, তার হাফহাতা চেক শার্টের বুকপকেটে অজস্র জোনাকি পোকা ঢুকে বসে আছে। সবগুলো জোনাকি পোকা এক সঙ্গে জ্বলছে, এক সঙ্গে নিভছে। পুরো পকেটটা অলৌকিক নীলাভ আলোয় ভরে আছে। এই জামা গায়ে দিয়ে আজ তিনি সারাদিন টো-টো করে ঘুরেছেন। আরে...আচ্ছা, আচ্ছা! তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন। এই জামার পকেটের মধ্যেই তো সেই চৌকোণা কার্ডটা.... মোহম্মদ আলি পকেটের মধ্যেহাত ঢুকিয়ে দিলেন। হাতে উঠে এলো কুড়িয়ে পাওয়া ইলেকট্রনিক পরিচয়পত্র। অন্ধকারে মুঠোর মধ্যে সেটা নীলচে আভা ছড়াচ্ছে।
চিচিং ফাঁক আধা ঘণ্টা ধরে রাধাচূড়া গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আছেনমোহম্মদ আলি। তাকিয়ে আছেনউল্টোদিকে চালিচার ফার্মাসিউটিক্যালসের বিসদৃশ বাড়িটার দিকে। আজওবাড়িটা তেমনই নিস্প্রাণ, স্তব্ধ। লোহার গেট নিশ্চল। কেউ ভেতর ঢোকেনি, কেউ বেরও হয়নি। এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে আছেনকেন মোহম্মদ আলি? কারণটা তার নিজের কাছে স্পষ্ট নয়। ইলেকট্রনিক পরিচয়পত্র তার মালিককে ফিরিয়ে দেওয়ার একটা ধোঁয়াটে ইচ্ছা মনের উপরিতলে তেলের মতো ভেসে আছে। কিন্তু তিনি আবার এওটের পাচ্ছেন যে, ওটা ভাণমাত্র। নিজেকে প্রবোধ দেওয়া। রহস্যময় বাড়িটা আসলে অবচেতনে তাকে টানছে।কাল থেকে একটা কৌতুহল দানা বাঁধতে বাঁধতে স্পষ্ট আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। গতরাতে অন্ধকারে পরিচয়পত্রটার নীলাভ দ্যুতি আরো দুর্বার করে তুলেছে সেই আকর্ষণ। তার উৎস্যুক মন বাড়িটার চারপাশে ঘুরঘুর করছে। দোতলা বাড়িটা ইশারায় যেন তাকে ডাকছে। রাধাচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থেকে একবার তার মনে হলো, বাড়িটাও যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। মোহম্মদ আলি রাস্তা টপকে লোহার গেটের সামনে এলেন। কিছুক্ষণ সেটার সামনে পায়চারি করলেন। বেলা দ্বিপ্রহর। রাস্তাটা আজ একটু বেশি নির্জন। উল্টোদিকে বাদামওয়ালাটাও নেই। উত্তর-পূর্ব দিক থেকে একটা মৃদু বাতাস দিচ্ছে। রাস্তার ওপর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে গাছের শুকনো পাতা, পরিত্যক্ত পলিথিন ব্যাগ। লম্বা লোকগুলো কি আজকে আসবে? গতকাল এই সময়ই তো এসেছিল। এখানে আসাটা কি রুটিন তাদের? মোহম্মদ আলি আরো মিনিট বিশেক পায়চারি করলেন গেটের সামনে। আচ্ছা, ভেতরে যাওয়া যাক নাকেন। তার হাতে তো ভেতরে যাওয়ার একটা উপায় আছেই। ভেতরে নিশ্চয়ই কাউকে পাওয়া যাবে। দায়িত্ববান কোনো অফিসকর্মী। তার হাতেপরিচয়পত্রটা তুলে দিয়ে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বললেই হবে। হয়তো তাতে এই ভবনের লোকজন খুশিই হবে। পরোপকারের এই নিষ্ঠা হয়তোতাদের মনে কৃতজ্ঞতার বোধ সৃষ্টি করবে। তারা তাকে ধন্যবাদ জানাবে। হয়তো চা বা কফি অফার করবে। ভিতরে যাওয়ার চিন্তাটা মাথায় আসতেই কেমন কেঁপে উঠলেন মোহম্মদ আলি। কেননাতিনি টের পেয়েছেন, মনের সুপ্ত বায়বীয় বাসনাটাকে তিনি আসলে আকার দিয়ে ফেলেছেন। এই ভবনের ভেতরে ঢোকার অদম্য একটা ইচ্ছা তার মধ্যে নানাভাবে ভাষা পাওয়ার চেষ্টা করছিল। ছদ্মবেশ নেওয়া সেই ইচ্ছাটাকে তিনি চিনে ফেলেছেন আর তাতে নিজের কাছেই নিজে বিব্রত হয়েছেন। সেই সঙ্গে একটা দুশ্চিন্তাও উঁকি দিচ্ছে মনের কোণে। কী দেখবেন তিনি ভিতরে গিয়ে? কী অপেক্ষা করছে তার জন্যে? নিয়তির মতো টানছে কেন তাকে বাড়িটা? মনের সঙ্গে কিছুক্ষণ তর্ককরে গেটের সামনে গিয়ে টানটান হয়ে দাঁড়ালেন মোহম্মদআলি। বুকপকেট থেকে সাদা প্লাস্টিকের ইলেকট্রনিক কার্ডটা বের করে ছোঁয়ালেন দেয়ালে বসানো কালো রঙের বাক্সটার গায়ে। ‘বি...ই....প!’ কয়েক মুহূর্ত কিছুই ঘটলো না। তারপর মৃদু একটা যান্ত্রিক শব্দ। মৌছাছির গুঞ্জনের মতো। একটা চাপা ‘ঘটাং!’ গেটের দুটো পাল্লা খুবই ধীর গতিতে দুপাশে সরে যাচ্ছে। সামনে একটা নিষেধে-ভরা গুপ্ত জগৎ যেন একটু একটু করে উন্মোচিত হচ্ছে, কম্পিউটারের পর্দায় ধীরে ধীরে ডাউনলোড হতে থাকা কোনো বিশাল ছবির মতো। বুকের ধুকপুকানিটা ক্রমাগত বাড়ছে মোহম্মদ আলির। বার বার মনে হচ্ছে, এখনও সময় আছে ছুটে পালিয়েযাওয়ার। কিন্তু কিছু বুঝেওঠার আগেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো ভেতরে পা রেখে ফেলেছেন তিনি। কয়েক মুহূর্ত। তারপর আবারমৌমাছির গুঞ্জন তুলে পেছনে গেটটা বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করল। ‘ঘটাং!’ গেট বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আর চাইলেও পিছন ফেরা যাবে না। মোহম্মদ আলি টেরপেলেন, তিনি এমন একটা অদৃশ্য রেখা পেরিয়ে এসেছেন, যারপর কোনোকিছু আর উল্টোমুখী করা সম্ভব নয়। গেট থেকে হাত দশেক দূরত্বে মূল ভবন। মাঝখানের পথটুকু লোহার গ্রিলের মতো খাঁচা করা। দেখতে সুরঙ্গের মতো লাগে।শ্বাপদশঙ্কুল অভয়ারণ্যে এরকম খাঁচাটে পথে হাঁটেন পর্যটকরা। গেট দিয়ে ঢুকে ডানে-বাঁয়েকোনোদিকে যাওয়ার উপায় নেই, ভবনে ঢোকা ছাড়া। কিন্তু মূল ভবনে ঢোকার মুখে আরেকটা লোহার গেট। এটার পাশেও একই রকম একটা কালো ইলেকট্রনিক বক্স। প্লাস্টিকের পরিচয়পত্রটাএটারও গায়ে ছোঁয়ালেন মোহম্মদ আলি। এই গেটটাও খুলে গেল একইভাবে। এবার একটা লম্বা টানা করিডোর। অল্প পাওয়ারের দুটি বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে। তার হলদেটে আলোয় প্রায় অনালোকিত একটা প্যাসেজ। একটা হলুদ অন্ধকার যেন বিছিয়ে দেওয়া। দু-পাশে একটার পর একটা বন্ধ কাঠের দরজা। বাইরে থেকে তালা দেওয়া দরজাগুলোয়। প্যাসেজে পা রাখলেন মোহম্মদ আলি। ভাদ্র মাসেওএকটা ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটা যেন লাগলো গায়ে। পিছনে দরজাটা নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। খুব ধীর পায়ে তিনি হেঁটে চললেন প্যাসেজ বেয়ে। দুপাশে দরজাগুলো দেখে মনে হয় না সেগুলো কখনও কোনোকালে খোলা হয়েছে। মেঝেতে ধুলা জমেছে। পুরো ভবনটাই যেন পরিত্যক্ত। এখানে কেউ থাকে বলে মনে হচ্ছে না। প্যাসেজের একেবারে শেষ মাথায় একটা সিঁড়ি। সেটা উপরে দোতলায় উঠে গেছে। কিন্তু সিঁড়িতে ওঠার উপায়নেই। কলাপসিবল গেট লাগানো। গেটে লোহার তালা।তবে পাশ দিয়ে আরেকটা সিঁড়ি নিচে নেমে গেছে। নিচে মানে মাটির নিচে। পাতালে। সিঁড়িটা অন্ধকার। মোহম্মদ আলি তার কর্মকাণ্ডের এখন আর কোনো ব্যাখ্যা পাচ্ছেন না। তিনি কেন এই ভবনে ঢুকেছেন,কেন এভাবে গা ছমছম করা পরিত্যক্ত একটা করিডোরে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, নিজের কাছে এসবের আর কোনো বাহানা জাহির করার চেষ্টাতিনি ত্যাগ করেছেন। ঘোরেরমধ্যে চলে গেছেন তিনি। এ জন্যে ভূ-গর্ভে নামার ছায়াচ্ছন্ন সিঁড়িটায় পা রাখার সময় গা একটু ছমছম করা ছাড়া আর কিছু হলো না তার মধ্যে। ঘোরানো লোহার সিঁড়ি। পনের-ষোলটা ধাপ নেমে একটাপাতালকক্ষে শেষ হয়েছে। সেই কক্ষে পা রেখে একটু কাশলেন মোহম্মদ আলি। গলা খাকরি দেওয়া কাশি। এর অর্থ, কক্ষে কেউ যদি থেকে থাকে, তাকে জানানো যে, চুরির উদ্দেশ্যে সন্তর্পণে তিনি এই গুপ্ত কক্ষে প্রবেশ করেননি। ভদ্রভাবে জানান দিয়ে করেছেন। ভদ্রতার এই আয়োজনবিফলে গেল। কক্ষটা নির্জন। ষাট ওয়াটের একটা ফিলামেন্ট বাল্ব জ্বলছে টিমটিম করে। ভালো করে কিছু চোখে পড়ে না। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে ধাতস্থহয়ে চারপাশে ভালো করে তাকালেন মোহম্মদ আলি। অপরিসর একটা কক্ষ। ধুলা আর মাকড়সার জালের আধিক্য।ছোট ছোট বাদামি কার্টন স্তুপ করে রাখা মেঝেতে।
একটার ওপর আরেকটা, তার ওপরআরেকটা। এরকমই একটি কার্টন তিনি পঞ্চ পাণ্ডবের একজনের কাঁধে দেখেছেন। মোহাম্মদ আলিকে এ মুহূর্তে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার কেউ নেই যে, পরিচয়পত্র ফিরিয়ে দেওয়ার বাহানা থেকে বহুদূর সরে এসেছেন তিনি। অনধিকার চর্চ্চার ভদ্রজনোচিত চৌহদ্দিও পেরিয়ে গেছেন। এখন তিনি যেখানে এসে দাঁড়িয়েছেন, সেটাকে অনায়াসে বলা চলে...কী বলা চলে? মোহম্মদ আলি হাত বাড়িয়ে একটি কার্টনের ঢাকনা সরিয়ে ফেলেছেন। উঁকি দিয়েছেন ভেতরে। ঝিকমিক করা এক ঝলক হলুদ আলো এসে পড়ল তার মুখমণ্ডলে। বিস্ময়ে চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল মোহম্মদ আলির। কার্টনের ভেতর এসব কী!!
বাটপারি ফ্রিজটা মৃদু গোঁ-গোঁ শব্দ করছে। গ্যাস ভরা হয়েছে। ভেতরের খাবার-দাবার ঠাণ্ডাও হচ্ছে ঠিকমতো। কিন্তু এই এক নতুন উপসর্গ : বিরক্তিকর শব্দ। ফ্রিজ সারাইয়ের ছেলেটাকে আবার ডেকে আনতে হবে। বোঝাতে হবে, এই আওয়াজটা আগে ছিল না। ফ্রিজটা ফেলে দেওয়ার সময় হয়ে গেছে। বহুদিন তো হয়ে গেল। বিয়ের পর পর কেনা হয়েছিল। বিছানায় শুয়ে শীলতকারক যন্ত্রের দূরবর্তী গোঙানি শুনছিলেন মোহম্মদ আলি। আরো নানারকম আওয়াজ কানে আসছে। রান্নাঘর থেকেডাল বাগার দেওয়ার একটা ‘ছ্যাৎ’ শব্দ ভেসে এলো। ঠিকা বুয়াটাকে বকাঝকা করছে জমিলা। শোকেসের ওপর গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে মেনি বিড়াল মর্জিনা, এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। দূর থেকে করাত কলের মতো একটা শব্দ আসছে। ঢাকা শহরের এই অংশে করাত কল থাকার কারণ নেই। তবু মাঝেমাঝে ঝিম ধরানো দুপুরে এইশব্দটা পান মোহম্মদ আলি। হয়তো শব্দটা তার মাথার ভেতরেই তৈরী হয়। আজ শুক্রবার। অফিস যাওয়ারঅভিনয় করতে হবে না। শুয়ে শুয়ে কালকের ঘটনাটা বার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভাবতে লাগলেন মোহম্মদ আলি। এখনও তার ঘোর ঠিকমতোকাটেনি। জমিলা রান্নাঘরে ব্যস্ত। তিনি বিছানা থেকে উঠে সন্তর্পণে শোবার ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিলেন। তারপর ঘরের এক কোণায় প্রায় পরিত্যক্ত লেখার টেবিলটার নিচে পেছন দিকটাহাতড়ালেন। একটা ছোট ঝোলাব্যাগ তার হাতে উঠে এলো। তিনি ব্যাগের মুখটা খুলে আজ সকাল থেকে পঞ্চমবারের মতো ভেতরে উঁকি দিলেন। তারপর ঝোলাটারেখে দিলেন আগের জায়গায়। জমিলাকে লুকিয়ে ঝোলাটা এইখানে রাখা সম্ভব হয়েছে, তার কারণ কাল বিকেল বেলা হন্তদন্ত হয়ে তিনি যখন ফিরেছিলেন, জমিলা তখন বাসায় ছিল না। দরজায় তিনিদেখতে পেয়েছেন জমিলার চিরকূট, যাতে সে জানিয়ছে, সে গ্যান্ডারিয়ায় তার ছোটভাই আবুল কাশেমের বাসায় বেড়াতে গেছে। চিরকূট পেয়েস্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন মোহম্মদ আলি। তার হাতে তখন ভারি ওই ঝোলাটা, যেটা অতিমাত্রায় ভারি বলেই, নাকি মানসিক উদ্বেগের চাপে, কে জানে, বাসায় ঢুকে দরজা বন্ধ করার পরেও অনেকক্ষণ হাঁপাচ্ছিলেন তিনি। ঝোলাটা কাপড়ের, গতকালকের ওই পাতালকক্ষেরই এক কোণা থেকে সেটা খুঁজে বের করেছিলেন মোহম্মদ আলি। কিন্তু তাতে ভরে চারকোণা যেসব জিনিস তিনি বাসায় বয়ে এনেছেন, এনে লুকিয়ে রেখেছেন, সেগুলো আসলে কী? মোহম্মদ আলি এসে আবার বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন। কালকের ঘটনাগুলো আবার প্রথম থেকে ভেবে দেখতে হবে। এটা ঠিক যে, কাল পাতালকক্ষের মেঝেতে রাখা বাদামি কার্টনগুলোর ঢাকনা খুলে তার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গিয়েছিল। ভিতরে বিস্কুট আকৃতির হলদেটে চকচকে জিনিসগুলোকে না চেনার কিছু নেই। টিভির খবরে তিনি এই বিশেষ আকারের বিস্কুট বহুবার দেখেছেন। খবরের ভাষায় এগুলোকে বলা হয় : সোনার বার। পাতালকক্ষে মোহম্মদ আলি টের পেয়েছিলেন, তিনি তাল তাল সোনার এক বিশাল ভাণ্ডারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন। কুবেরের নিষিদ্ধ কক্ষে। মাথা গুলিয়ে যাচ্ছিল তার। ঠিকমতো চিন্তা করা দুরুহ ছিল। ঘোরের মধ্যে কী-কী করেছেনএখন ঠিকমতো মনেও পড়ছে না।শুধু মনে পড়ছে, কাপড়ের একটা ঝোলাব্যাগ খুঁজে বেরকরেছিলেন কক্ষের কোথাও থেকে। তার মধ্যে ভরেছিলেনবেশ কিছু সোনার বার। কয়টা হবে? পনের-ষোলটা। এর বেশি নেওয়া সম্ভব ছিল না। এতেইযথেষ্ঠ ভারি হয়ে উঠেছিল ব্যাগ। তারপর কোনোদিকে নাতাকিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন তিনি। ইলেকট্রনিক পরিচয়পত্রটা তাকে একই পদ্ধতিতে বের হয়ে আসতে সাহায্য করেছে, যেভাবে ঢুকতে সাহায্য করেছিল। একটা রিকশা কি ডেকেছিলেন?না স্কুটারে এসেছেন? এখন আর মনে পড়ছে না। ‘তুমি দরজা লাগিয়ে কী করছো?’ ঘরের দরজায় জমিলা দাঁড়ানো। ‘না। কই, দরজা তো লাগাইনি।বাতাসে পাল্লা লেগে গেছে বোধ হয়। ’ জমিলা মৃদু সন্দেহের দৃষ্টি হানলেও অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল। ‘শোনো, শুক্রবার দিনটা পায়ের ওপর পা তুলে বসে থেকো না। ও-বেলা একটু বাজারে যেয়ো। এক জোড়া ইলিশ আনতে পারো কিনা দ্যাখো।’ ‘ইলিশ কেন?’ ‘রাতে কাশেম আসবে। অনেকদিন ভালোমন্দ কিছু খাওয়ানো হয় না ওকে।’ ‘ঠিক আছে। দুপুরের ভাত খেয়ে বেরিয়ে পড়বো। তখন বাজার ফাঁকা থাকবে। মাছ সস্তায় পাওয়া যাবে।’ জমিলা চলে গেলে বিছানার পাশের জানালাটা খুলে দিলেন মোহম্মদ আলি। বৃষ্টি আসবে মনে হচ্ছে। ভেজা বাতাস দিচ্ছে। জানালার চৌকাঠ বেয়ে পিঁপড়ার সারি ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছুটোছুটি করছে। পিঁপড়াগুলো তাদের আস্তানা বদলাচ্ছে হয়তো। তাদের আস্তানায় কী আছে? মূল্যবান কিছু? খাবার-দাবার ছাড়া তো আর কিছু পিঁপড়াদের কাছে মূল্যবান নয়। মানুষের কাছে খাদ্য সামগ্রীর চেয়ে বহুগুণে মূল্যবান হলদেটে একটি শক্ত ধাতু। পাতালকক্ষে এতো তাল তাল সোনা কোথা থেকে এলো? কালোপিঁপড়ার মতো কারা এইসব সেখানে জমিয়ে তুলেছে? কী উদ্দেশ্যে? মোহম্মদ আলি লক্ষ্য করলেন, তিনি যতোটা না নিজেকে এই প্রশ্ন করছেন, তার চেয়ে বেশি প্রশ্নটার জবাব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন। কারণ, জবাব অনুমান করা এমন কঠিন কিছু নয়। আর সেই সহজ কাজটা এড়ানোর জন্যেই তিনি নিজেকে বার বার প্রশ্নটা করে যাচ্ছেন। অনুমানটা অতি সহজ : চোরাকারবারিদের আখড়ায় গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন তিনি। চালিচার ফার্মাসিউটিক্যালস আসলে স্বর্ণ চোরাচালানি চক্রের একটা আখড়া, তাদের গুদামখানা। খুব বড় কোনো চক্র। ক্ষমতাধর আর দুর্ধর্ষ। পাঁচ ল¤^ুজির অসাবধানী চলাফেরাই বলে দেয়, কাউকে পরোয়া করে না তারা, কারো ধার ধারে না। দরকার হয় না। চোরের ওপর বাটপারি করেছেনমোহম্মদ আলি। তাও খুবই ক্ষুদ্র আকারে। অগাধ সমুদ্রের মধ্য থেকে এক ঘটি জল নিয়েছেন মাত্র। বিজ্ঞানী নিউটনের মতো সমুদ্রের তীরে নুড়ি কুড়িয়েছেন। এ কথা ভেবে নিজের অনুশোচনা কমানোর চেষ্টা করছেন মোহম্মদ আলি। আরেকটা অপ্রাসঙ্গিক আলটপকা চিন্তা চট করে মোহম্মদ আলির মাথায় এলো। চিন্তাটা এতো ঝটিকা আর স্পষ্ট যে, মুখ ফসকে সেটা শব্দ আকারে বের হয়ে গেল : ‘কাল থেকে আর সস্তার ইলিশ খুঁজতে হবে না। ’
ওয়াল্টজ বেলী ফুলের মিষ্টি গন্ধে চোখ বুজে আসছে। একটা পবিত্র শান্তি ছড়িয়েআছে তাকে ঘিরে। দশ টাকায় দুটা বেলী ফুলের মালা দিয়েছে ছোট্ট মেয়েটা। শস্তাই বলতে হবে। গাড়ির কাঁচ নামানো ছিল। বাইরে থেকে মালাসহ হাতটা ঢুকিয়ে দিয়েছে ডাবল-বেণী-মেয়েটা। তিনি কিনতে বাধ্যহয়েছেন। একসময় ফুটপাথে দাঁড়িয়ে এইসব উৎপাত দেখতেন তিনি। দেখে মজা পেতেন। আজ প্রত্যেকটা সিগনালে আটকা পড়লো গাড়ি। নিউ মার্কেটে পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা ১১টা। ‘গাড়িটা পার্ক করে রাখো, ইদ্রিস,’ বলে টয়োটা প্রিমিও থেকে নেমে নিউ মার্কেটের বাঁধানো শানে পা রাখলেন মোহম্মদ আলি। এখানে বইয়ের দোকানগুলোর উল্টোদিকের সারিতে তিনি একটা ঘড়ির দোকান দিয়েছেন।হাতঘড়ি, দেয়ালঘড়ি আর টেবিলঘড়ি বিক্রি হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দোকান খুলে তিনি কাউন্টারে বসেন। একটা পেপার মেলে ধরেন চোখের সামনে। মোবাইল ফোনে এখন দিব্যি সময় দেখা যায়। ঘড়িআজকাল কেউ কেনেটেনে না। ফলে কাস্টমারের ঝুটঝামেলা খুব একটা নেই। সেটাই চান মোহম্মদ আলি। ঘড়ির এই দোকানের ওপর তার কোনো অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা নেই। খুব ছোটবেলা থেকে ঘড়ির দোকানদার হওয়ার একটা সুপ্ত বাসনা তার মধ্যে দানা বেঁধে ছিল। সুযোগ আসতেই সেই সাধ পূরণ করে নিয়েছেন। দুপুর বারোটায় সবকটা দেয়ালঘড়ি যখন এক সঙ্গে অজস্র ওয়াল্টজ বাজায়, তখন হঠাৎ করে তিনি ভুলে যান কোথায় আছেন। প্রায় দশ মিনিট ধরে চলে ওয়াল্টজ। এই দশটা মিনিট মোহম্মদ আলির মনে হয়, স্কুল যাওয়ার পথে বড়বাজারের চৌরাস্তায় বই-হাতে তিনি হাফপ্যান্ট পরে দাঁড়িয়ে আছেন। তাকিয়েআছেন উল্টোদিকে ‘কালস্রোত’ নামে একটা ঘড়িরদোকানের দিকে। নিউমার্কেট আজ আধবেলা খোলা। দুপুর পর্যন্ত মাত্র দুজন কাস্টমার দোকানে এলো। তাদের মধ্যে একজনই একটা টেবিলঘড়ি কিনলো শুধু। তিনটার দিকে দোকান বন্ধ করে আবার গাড়িতে উঠলেন মোহম্মদ আলি। ইচ্ছা ছিল একবার মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে যাবেন। বেলালের সঙ্গে দেখা করা দরকার। মোহম্মদ আলি দুটি বাস কিনেছেন, যেগুলো চলাচল করে ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কে। বেলাল সেগুলো দেখাশোনা করে। মোহম্মদ আলিকে কোনো মাথা ঘামাতে হয় না। চালিচার ফার্মার সেই ঘটনার পর ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। মাত্রই ছ’টা মাস। এরমধ্যে কত দ্রুত নিজের জীবনটাকে বদলে ফেলেছেন মোহম্মদ আলি। এখন তাকে দেখলে কম লোকই চিনতে পারবে। ওজন বেড়েছে। চেহারায় আগের সেই অসহায় ভাবটা নেই। কেমন একটা আত্মবিশ্বাসী দৃঢ়তার ছাপ তার চোখেমুখে। ফোন বাজছে। ‘হ্যালো।’ ‘বাসায় ফিরছো না?’ জমিলার কণ্ঠ। এই ছয় মাসে জমিলারই কেবল কোনো পরিবর্তন হয়নি। তার মেজাজআগের মতোই ছ্যাৎছ্যাতে। জগৎ সংসারের সব বিষয়ে সর্বদা তিতিবিরক্ত। বদল হয়নি তার মেনি বিড়াল মর্জিনারও স্বভাবচরিত্র।সেটি এখনও ঘরের কাপ-পিরিচভাঙ্গা অব্যাহত রেখেছে। ‘বাসায় ফিরছি। তবে একটু দেরি হবে। মহাখালী হয়ে ফিরবো।’ ‘আজ মহাখালী বাদ দেও।’ ‘কেন? কী হয়েছে?’ ‘কাশেম এসেছে। তোমার সঙ্গে এক সাথে দুপুরের খাবার খাবে।’ ‘আচ্ছা। আসছি।’ মোহম্মদ আলির মুখটা তেতো হয়ে গেল। শ্যালক কাশেমকে তিনি জোরালোভাবে অপছন্দ করেন। ধান্দাবাজ ধরনের কাশেম দিনরাত নানারকম ফন্দিফিকিরের মধ্যে আছে। আর কী কপাল, সব চালাকিতেই সে ধরা খায়। ইদানিং শেয়ারব্যবসায় বিপুলভাবে লস খেয়ে পথে বসেছে। তার দিকেতাকানো যায় না। এখন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সে, যারপ্রধান লক্ষ্যবস্তু মোহম্মদ আলি। কেন? কারণ চোখের সামনে সে মোহম্মদ আলির রাতারাতি ভাগ্য পরিবর্তন দেখতে পেয়েছে। চাকরি হারানো এক গোবেচারাকেরানি থেকে তার দুলাভাই কী করে এক ঝটকায় ঢাকা শহরে তিন-চারটি ব্যবসার মালিক হয়ে উঠলেন, সেই রহস্য সে কিছুতেই ভেদ করতে পারছে না। জমিলাকে জিজ্ঞেস করে কোনো সদুত্তরপায়নি। জমিলাও-যে নিজে কিছুই জানে না। সেও একই রকম অন্ধকারে। তবে কিনা জমিলার কৌতুহলটা কম। আর তাকে নানাভাবে সত্যে-মিথ্যায় মিশিয়ে বুঝ দেওয়াযায়। কিন্তু ধুরন্ধর শ্যালক মহাশয়কে কিভাবে বুঝ দেবেন মোহম্মদ আলি! সে তো রাতদিন টিকটিকির মতো লেগে আছে। ‘কোন আলাদীনের চেরাগ পাইছেন, দুলাভাই, বলেন তো!’, দিনরাত কাশেমের মুখেএই সংলাপ। খুব বিরক্ত লাগে। ইদানিং কৌশল পরিবর্তন করেছে কাশেম। জমিলাকে সে হাত করেছে। কৌতুহলী করে তুলেছে তাকে। ফলে ভাই আর বোন মিলে এখন নিরন্তর তারপিছনে লেগে আছে। আজও তাকেদুপুরের খাবার খেতে ডাকারপিছনে দুজনের দুরভিসন্ধি স্পষ্ট বুঝতে পারছেন মোহম্মদ আলি। চাইলেই এড়াতে পারতেন। দুপুরে বাসায় খেতে না গেলেই হয়। কিন্তু তাতে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না। কাশেম রাতপর্যন্ত থেকে যাবে। তখন রাতের খাবার টেবিলে সে শুরু করবে তার উৎপাত। মোহম্মদ আলি গাড়ি ঘোরাতে বললেন। ‘ইদ্রিস, বাসায় চলো।’ দু মাস হলো বাসাও বদল হয়েছে। কাঁঠালবাগানের ছোট্ট চিপা বাসাটার বদলে এখন ধানমন্ডিতে ছিমছাম একটা ফ্ল্যাটে উঠেছেন তারা। মোহম্মদ আলির এইসব পরিবর্তন কি সবার চোখে লাগছে? ভ্রæ কুচকে কি সবাই তাকিয়ে দেখছে? মনে হয় না। ঢাকা শহরে কে তাকায় কার দিকে। একটা লোকবেশ কিছুদিন পিছু লেগে ছিল বটে- ইনকাম ট্যাক্সেরএক ইন্সপেক্টর। টাকা দিয়েতার মুখ বন্ধ করা হয়েছে। এখনও মাঝে মাঝে নিউ মার্কেটের ঘড়ির দোকানে হাজির হয় লোকটা। তবে তার চোখে কৌতুহলের সেই তেজ আরনেই।
জেরবার ‘একটু ঝেড়ে কাশুন না, দুলাভাই।’ খাবার টেবিলে কাশেমের মুখস্ত মন্তব্য। যেমনটা অনুমান করা হয়েছিল, এ-প্রসঙ্গ সে-প্রসঙ্গ পেরিয়ে সে ঠিকই আসল কথায় চলে এসেছে। ‘ঝেড়েই তো কাশলাম,’ মোহম্মদ আলি গোঁয়ারের মতো জবাব দিলেন। ‘আপনি বলছেন, বন্ধুর কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে আপনি ব্যবসা শুরু করেছেন?’ কাশেম যেন প্রশ্ন করছে না,একটা বরফের চাঙরের মধ্যে শাবল চালাচ্ছে। ‘ধার তো বলি নাই। বন্ধুরও শেয়ার আছে এর মধ্যে। ফিফটি ফিফটি। আমার শ্রম। তার পূঁজি।’ ‘তোমার কোন বন্ধু, গো? নামবলো না’- এইবার বোন যোগ দিলো। দ্বিমুখী আক্রমণ। ‘তুমি চিনবা না। আমার সব বন্ধুকে তুমি চেন?’ কাশেম প্লেটে খাবার মাখছে। খাওয়ার দিকে তার কোনো মনোযোগ নেই। সে তাকিয়ে আছে দেয়ালের একটা শূন্যতার দিকে। কিছু একটাফন্দি আঁটছে মাথার ভিতরে।ভাই-বোনের ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে, তারা আজ বিশদ প্রস্তুতি নিয়ে নেমেছে। অনেকক্ষণ বুদ্ধি-পরামর্শকরেছে। ‘আমি আপনাকে কিছু কাগজপত্র দেখাবো, দুলাভাই।’ ‘কিসের?’ ‘খেয়ে উঠি। তারপর দেখবেন।’ চোখেমুখে কেমন একটা ফিচেলহাসি লুকানোর চেষ্টা করছেকাশেম। খাওয়া-দাওয়া শেষে বসার ঘরে কাঠের সেন্টার টেবিলটার ওপর বসলো কাশেম।তার হাঁটুতে একটা ফোল্ডিংফাইল। সেটা সে এগিয়ে দিলোসোফায় বসে থাকা মোহম্মদ আলির দিকে। উল্টোদিকের সোফায় বসেছে জমিলা। মর্জিনাকে কোলে নিয়ে আদর করছে। আরামে চোখবুঁজে আছে মর্জিনা। ‘এটা কী?’ হাতের ফাইলটা নাড়াচাড়া করতে করতে বললেনমোহম্মদ আলি। ‘উল্টে-পাল্টে দেখেন। দেখলেই বুঝতে পারবেন। এগুলা হলো আপনার ব্যবসার কাগজপত্র। ইনকাম-ট্যাক্সঅফিস থেকে সংগ্রহ করা আপনার হিসাব বিবরণী, জয়েন্ট স্টক কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন দলিল আর আপনার যাবতীয় ব্যাংক স্টেটমেন্ট। আমি জোগাড় করেছি।’ ‘তোমার উদ্দেশ্যটা কী ? কেন এইসব দেখাচ্ছো আমাকে?’ ‘দেখাচ্ছি, কারণ এইসব কাগজআপনার কোনো কথাকেই সমর্থনকরছে না, দুলাভাই। আপনি কিছু লুকাচ্ছেন। শুনুন, আমি তো আর ইনকাম ট্যাক্সের ইন্সপেক্টর নই। খামাখা আমাকে শত্রæ ভাবছেন কেন। আমি আপনার আত্মীয়, শুভানুধ্যায়ী। আসল কথাটা কী, সেটা জানায় দেন। আমি তো আপনার সঙ্গেইআছি, আপনাকে সবরকম সাহায্য দেওয়ার জন্যে।’ মোহম্মদ আলি তাকালেন জমিলার দিকে। জমিলার চোখেভাইয়ের প্রতি প্রশ্রয়। তিনি উঠে দক্ষিণ দিকের ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর মেঝে পর্যন্ত লম্বা পর্দাটা একটানে সরিয়ে দিলেন। একরাশ রোদমাখা আলোয় ভরে উঠলো ঘরটা। বাইরে ফাল্গুনের চমৎকার আবহাওয়া। ধানমন্ডি লেকের পানিতে প্যাডেল-চালিত কয়েকটা বোট চলছে। হিজল গাছগুলোয় এখনও ফুল ধরেনি।আর কিছুদিনের মধ্যে বেগুনি ফুলে ছেয়ে যাবে লেকের পাড়। ‘ঠিক আছে,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন মোহম্মদ আলি। ‘এতো যখন কৌতুহল তোমাদের, আমি সব বলবো। সব জানতে পাবে তোমরা। গুপ্তকথা শুনতে চাও তো? শোনো তাহলে...’ বাইরে রোদের দিকে তাকিয়ে থেকে টানা বলে গেলেন মোহম্মদ আলি। ছয় মাস আগেরএকটি ঘটনার এতো অনুপুক্সখবিবরণ যে তার মনে আছে, সেটা তিনি নিজেও জানতেন না। ওই ঘটনা তিনি এমনকি নিজের কাছেও তো গোপন করারচেষ্টা করে এসেছেন। চেয়েছেন ভুলে যেতে। শুনতে শুনতে বিস্ময়ে মুখ হাঁ হয়ে গেল জমিলার। এমনকি মর্জিনার কানও কেমনখাড়া হয়ে আছে। আর উত্তেজনায় চোখ চকচক করছে কাশেমের। মোহম্মদ আলি গল্প শেষ করার পরও অনেকক্ষণ কেউ নড়লো না। একটা নিস্তব্ধতাঝুলে থাকলো ঘরটায়। এয়ার কুলারের ভেতর থেকে শুধু মিহি একটা হিশ্হিশ্ শব্দ আসছে। প্রথম নীরবতা ভাঙ্গলো কাশেম। গলা খাকরি দিলো সে। ‘ইলেকট্রনিক পরিচয়পত্রটা কোথায়, দুলাভাই? ওটা বের করেন। একবার দেখতে চাই।’
. ‘আলু ফাঁক! পটল ফাঁক!’ রাধাচূড়া গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আছে কাশেম। এলোমেলো জোর বাতাস বইছে আজ শহরের ভিতর দিয়ে। রাধাচূড়া গাছের মিহি হলদেটে পাতা অনবরত ঝরে পড়ছে। কাশেম তাকিয়ে আছে উল্টোদিকের দোতলা বাড়িটার দিকে। ওই তো সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছে : “চালিচার ফার্মাসিউটিক্যালস” মোহম্মদ আলি ঠিক যেমন-যেমন বিবরণ দিয়েছেন,তার সঙ্গে এক চুলও অমিল পাওয়া গেল না কোনো কিছুতে। অনড় ফটোগ্রাফি যেন। ছয় মাসে একটুও বদলায়নি। দুর্গের মতোই লাগে বটে বাড়িটাকে। রাস্তা পেরিয়ে বাড়ির লোহার গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো কাশেম। বর্ণনা অনুযায়ী গেটের পাশে পাচিলের গায়ে কালো ইলেকট্রনিক বক্সটাও দেখা যাচ্ছে। সবই মিলে যাচ্ছে, একটা জিনিস ছাড়া। মোহম্মদআলি তার বর্ণনায় বারবার এই জিনিসটার কথা বলেছে: বাড়িটার সামনে দাঁড়ালেই কেমন গা-ছমছম করে। একটা অস্বস্তি সৃষ্টি হয়। গুমোট একটা আবহওয়া সবসময় ঘিরে থাকে বাড়িটাকে। নিজের মধ্যে তেমন কোনো গা-ছমছমে ভীতি অনুভব করছেনা কাশেম। সে ভিন্ন ধাতুতে গড়া। পোড়খাওয়া। বহু ঘাটের পানি হজম করেছেসে। ভীতির বদলে বরং বলা যায়, একটা উদ্বেগ কাজ করছেতার মধ্যে। কিন্তু সেটা এই অভিযানের অনিশ্চিত ফলাফলকে ঘিরে। বুকপকেটে হাত রেখে পরিচয়পত্রটার উপস্থিতি আরেকবার অনুভব করে নিলো কাশেম। কাল এটা হাত করতে কতো কসরত করতে হয়েছে। দুলাভাই কিছুতেই দেবেন না। শেষে ব্ল্যাকমেইল পর্যন্ত করতে হলো। এতোটা নামতে হবে, কাশেমও টের পায়নি। চারপাশটা একবার দেখে নিলোকাশেম। রাস্তা শুনশান। দুয়েকটা সাইকেল রিকশা যাচ্ছে লম্বা বিরতিতে। সে বুকপকেট থেকে সাদা ইলেকট্রনিক কার্ড বের করেকালো বক্সটার গায়ে ছোঁয়ালো। ‘বি....ইপ!’ খুলে যাচ্ছে লোহার গেট। ধীরে ধীরে হাঁ করছে যেন কোনো প্রাগৈতিহাসিক দানব। গেট পুরোটা খোলার পর টুপ করে ভিতরে ঢুকে পড়লো কাশেম। গেট বন্ধ হতেই দ্বিধাহীনভাবে সামনে পা বাড়ালো, যেন সবকিছু তার মুখস্ত। দ্বিতীয় কালো গেটটাও বাধাহয়ে দাঁড়ালো না। আবছায়া ধুলোমাখা প্যাসেজ লম্বা পা ফেলে পেরিয়ে গেল সে। বদ্ধ জায়গাটায় তার পায়ের আওয়াজ প্রতিধ্বনী তুলছে, যেন সে একা নয়, একসঙ্গে চল্লিশটি কাশেম হেঁটে যাচ্ছে। লোহার সিঁড়ি বেয়ে পাতালে নেমে এলো কাশেম। মেঝে জুড়ে বাদামি কার্টন স্তুপ করে রাখা। একটার ওপর আরেকটা। আকর্ণ হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো কাশেমের মুখ। দাঁত বেরিয়ে পড়লো তার। দ্রুত এগিয়ে গেল কার্টনগুলোর দিকে। খুশিতে সে কি একবার লাফ দিলো, নাকি হোঁচট খেল কোনো কিছুতে? মেঝেতে ওটা লম্বাটে কালো কী পড়ে আছে? ক¤^ল? চোখে এখনও সয়ে আসেনি অন্ধকার। মেঝে থেকে উঠে কাশেম গুটানো কালো কম্বলের মতো জিনিসটা পা দিয়ে নাড়িয়ে-চাড়িয়ে দেখছিল। একটা ভোঁতা আর্ত চিৎকার বেরিয়ে এলো কাশেমের মুখ থেকে! মেঝেতে একটা লাশ পড়ে আছে। কালো স্যুট আর জুতা পরা একটা লাশ। লাশ বলা যাবে কি? শুধু হাড়গোড়-কঙ্কালকে কি লাশ বলা যায়?বহুদিন আগে নিহত হয়েছে এইলোক। মাংসপেশী গলে মেঝের সঙ্গে মিশে গেছে। পড়ে আছেশুধু কঙ্কালের খোলস। কে লোকটা? কার লাশ? অনুমান করতে কষ্ট হলো না কাশেমের। এটা সম্ভবত সেই পঞ্চপাণ্ডবের একজন, যার পকেট থেকে অসাবধানে পড়ে যাওয়া পরিচয়পত্র এখন কাশেমের বুকপকেটে। ভুলের শাস্তি? আতংকে কেঁপে উঠলো কাশেম। এই প্রথম সে অনুধাবন করতেশুরু করেছে, কী নৃশংস নিষ্ঠুর এক অপরাধ চক্রের আস্তানায় সে পা রেখেছে। প্রবল ইচ্ছে হলো, আর না এগিয়ে এখান থেকেই ফিরে যায়। কিন্তু মাত্র কয়েক পা সামনে কুবেরের রত্নভাণ্ডার। এতো কাছে এসে ফিরে যাবে? কাশেম দ্রুত কার্টনগুলোর ঢাকনা খুলে ফেলতে শুরু করলো। এ কী! কিচ্ছু নেই। সব ফাঁকা। না। একেবারে ফাঁকা বলা যাবে না। একটার ভিতর থেকেবের হলো পাঁচটা আঙ্গুল, কারো কব্জি থেকে সেগুলো কেটে রাখা হয়েছে। কাটার খুব বেশিদিন হয়নি। এখনও জমাট বাঁধা কালচে রক্ত দেখা যাচ্ছে। আরেকটা কার্টন থেকে বের হলো একটাকর্তিত কান। আরেকটা থেকে.... ওয়াক্ করে মেঝের মধ্যে বমি করে ফেললো কাশেম। কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকলো এই রক্ত-হিম-করা পাতালকক্ষে। কী এটা? রত্নভাণ্ডার না কসাইখানা? থরথর করে কাঁপছে কাশেম। উঠে দাঁড়ানোর শক্তি ফুরিয়ে গেছে তার। কাঁপতে কাঁপতে সে সিঁড়ি বেয়ে উপরের প্যাসেজটায় উঠে এলো। ষাট ফুট লম্বা প্যাসেজটা কি কোনোকালেই শেষ হবে না? টলতে টলতে সে যেন যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। তার ঘষটানো পায়ের আওয়াজ চারপাশের দেয়ালে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। যেন শত শত আবুল কাশেম পা ঘষটে চলেছে জোম্বির মতো। প্যাসেজের শেষ প্রান্তে লোহার গেটের একপাশে কালো ইলেকট্রনিক বক্সটা ঝাপসা হয়ে আসছে। পকেট থেকে পরিচয়পত্র বের করে তাতে ছোঁয়ালো কাশেম। ‘বি...ইপ!’ গেট নড়লো না। আবার ‘বি...ইপ!’ গেট পাথরের মতো স্থির। এবার বক্সটার গায়ে পাগলেরমতো পরিচয়পত্র ছোঁয়াতে লাগলো কাশেম। অনবরত। বি...ইপ! বি...ইপ! বি...ইপ! বি...ইপ!......... একসময় ক্লান্ত হয়ে নেতিয়েপড়লো সে। তার চিন্তাশক্তি গুলিয়ে আসছে। বাইরে কি একটা প্রাইভেট কার দ্রুত এসে ব্রেক কষার আওয়াজ পাওয়া গেল? নাকি বিভ্রম? বাইরেরগেটটা খুলে যাওয়ার আওয়াজ কি পাওয়া যাচ্ছে? গেটের ওইপারে কয়েক জোড়া জুতা পরা পায়ের আওয়াজ কি দ্রুতএগিয়ে আসছে? বিভ্রম! সব বিভ্রম!
১০
বাবা মোস্তফা একটা লোক নিবিষ্টভাবে তাকিয়ে আছে দেয়াল ঘড়িটার দিকে। এমন কোনো বিশেষায়িত ঘড়ি নয়। সিকো কোম্পানির পুরনোএকটি মডেল। খুব বিরলও নয়। লোকটা কি সময় দেখছে না ঘড়িটা দেখছে? আচ্ছা, তাকিয়ে আছে, থাক নাবাবা। একটা কারো সঙ্গ তো পাওয়া যাচ্ছে। দুপুরের পরথেকে ফাঁকা দোকানটায় তিনিএকাই তো বসে আছেন। মিনিট দশেক পর লোকটার ধ্যান ভাঙ্গলো। কাউন্টারে এসে লোকটা মোহম্মদ আলির মুখোমুখি দাঁড়ালো। ‘ঠিক সময় দিচ্ছে না ঘড়িটা।’ যাক, লোকটা কথা বলতে পারে। ‘আপনার পছন্দ হয়েছে?’ ‘ভুল সময় দেওয়া ঘড়ি আমার পছন্দ নয়।’ মোহম্মদ আলি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন লোকটার দিকে। ‘ওটা এখন কোনো সময় দিচ্ছে না। ব্যাটারি খুলে রেখেছি। কাঁটাগুলো খুলে রাখতে ভুলে গেছি।’ লোকটা কেমন লজ্জিতের ভঙ্গিতে হাসলো। ‘ঘড়িটা প্যাক করে দিন।’ সারদিনে এই একটাই ঘড়ি বিক্রি। তাও কালজ্ঞানহীন একটা লোকের কাছে। সেকেন্ডের কাঁটাটা যে স্থির, সেটা দেখার মতো বুদ্ধিও নেই লোকটার। পুরো নিউমার্কেটটাই আজ কেমন ফাঁকা। অন্যদিন বিকেলের দিকটা ভরা থাকে। অন্তত বইয়ের দোকানের এই আইলটায় আড্ডাবাজ লোকজন ভিড় করে। দাঁড়িয়ে চা-সিঙ্গারা খায়। লেদারের দোকানগুলোর দিক থেকে বাঁক ঘুরে ওটা কে এগিয়ে আসছে? চেনা চেনা লাগছে কেন এই মহিলাকে? আরে মহিলা তো তার দোকানেরদিকেই আসছে। দ্রুত। আলুথালু বেশ। হন্তদন্ত হয়ে দোকানে ঢুকে কাউন্টারে আছড়ে পড়লো মহিলা। ‘ওগো সর্বনাশ হয়ে গেছে!’ ‘এ কী অবস্থা তোমার, জমিলা! কী হয়েছে?’ ‘আমাদের সব গেছে, আলি! কাশেম এখনও ফিরে আসেনি। ওকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। মোবাইল বন্ধ।’ ‘এখনও ফিরে আসেনি বললা যে - ও কোথায় গিয়েছিল?’ জবাব না দিয়ে জমিলা হাপুশচোখে কাঁদতে লাগলো। মোহম্মদ আলির বুঝতে বাকি থাকলো না, কাশেম কোথায় গিয়েছে। জমিলার শত পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও থানায় গেলেন না মোহম্মদ আলি। এই বোকামি করা যাবে না। থানায় যাওয়ামানেই দস্যুদের কাছে নিজের পরিচয় প্রকাশ করে ফেলা। যা করার ঠাণ্ডা মাথায় করতে হবে। কিন্তু জমিলার যন্ত্রণায় কী আর ঠাণ্ডা মাথায় কিছু চিন্তা করার যো আছে! সারাক্ষণ কুঁ-কুঁ করে কাঁদছে। সন্ধ্যার আগে-আগে রিকশাযাত্রী সেজে সেই বাড়িটার সামনে দু-বার চক্কর দিয়ে এসেছেন মোহম্মদ আলি। উল্লেখযোগ্য কিছুই চোখে পড়েনি। লোহার গেটটা পাথরের মতো অনড়। বরাবরের মতো থমথমে স্তব্ধতা বাড়িটাকে ঘিরে। কী ঘটে থাকতে পারে কাশেমের ভাগ্যে? ও কি ধরা পড়েছে? ধরা পড়লে কী করবে ওরা কাশেমের? কাশেম কি মোহম্মদ আলির নাম বলে দেবে? মাঝরাতে সোফা থেকে উঠে জামাকাপড় পরতে শুরু করলেনমোহম্মদ আলি। ‘এখন আবার কোথায় চললা?’ ‘মর্গে।’ জমিলা আবার হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। মর্গে পাওয়া গেল না। একতলা লম্বা ঘরটা থেকে বেরিয়েও মাথাটা কেমন দুলছে মোহম্মদ আলির। এ কোথায় ঢুকেছিলেন তিনি! কোনোকালে তাকে মর্গে ঢুকতে হয়নি। যাও বা ঢুকতেহলো, তাও মাঝরাতে! ইমার্জেন্সির সামনে একটা দালাল গোছের লোক আগ বাড়িয়ে এসে গল্প জুড়ে দিলো। ‘কাউকে খুঁজছেন?’ ‘আমার শ্যালক।’ ‘একটু বর্ণনা দেবেন?’ মোহম্মদ আলি বর্ণনা দিলেন। গায়ের রং, হাইট ইত্যাদি ডিটেইল বিবরণ দেওয়া শেষে যোগ করলেন, ‘চোখের মধ্যে সারাক্ষণ একটা লোভী চাহনি।’ ‘আপনি একবার মিটফোর্ডে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।’ ‘মিটফোর্ডে কেন?’ ‘বুড়িগঙ্গার তীরে অনেকে লাশ ডাম্প করে। ওটাই সবচেয়ে ভালো ক্রাইম জোন। নদীর তীরে যেগুলো পাওয়া যায়, সেগুলো মিটফোর্ডেই নেওয়া হয়।’ মিটফোর্ড হাসপাতালের এক দালাল গোছের লোক একটা রিকশা ভ্যান জোগাড় করে দিলো। অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট চলছে। রিকশা ভ্যান ছাড়া গত্যন্তর নেই। চাদর দিয়ে ঢাকা কাশেমের লাশটা রিকশা ভ্যানের ওপর আড়াআড়ি রাখা হলো। পিছনে পা ঝুলিয়ে বসলেন মোহম্মদ আলি। রওনা দেওয়ার আগে দালাল লোকটাকে তিন হাজার টাকা দিতে হলো। এক হাজার টাকা মর্গ থেকে লাশ বের করে দেওয়ার জন্যে। আর দুই হাজার টাকা মুচির খরচ। দালাল এই শেষরাতে কোথা থেকে এক মুচি জোগাড় করে এনেছিল। এটা যে মুচির কাজ,সেটা মোহম্মদ আলির মাথাতেই আসেনি। মোস্তফা নামের এই মুচি খুবই কাজেরলোক। সুঁই-সুতা চালিয়ে মাত্র আধা ঘণ্টায় চারটা আলাদা টুকরা জোড়া লাগিয়ে কাশেমকে একটা অভিন্ন লাশেরূপ দিয়ে ফেলেছে। রাতের এই শেষ প্রহরে ঢাকাশহর কেমন অচেনা হয়ে গেছে। শাপলা চত্বরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ও মোহম্মদ আলি টের পাননি ডান পাশের পুরনো লাল ভবনটা কার্জন হল। রিকশা-ভ্যানের প্যাডেল চালানোর ক্যাঁচ-ক্যাঁচ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নাই। শুনশান চারিদিক। টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। খোলা ভ্যানগাড়িতে পা ঝুলিয়ে বসা মোহম্মদ আলি ভিজছেন। পাশে চাদরে ঢাকা কাশেমের লাশটাও ভিজেচুপচুপে হয়ে গেছে। অনেকক্ষণ ধরে একটা সাইকেলপিছু পিছু আসছে। হুড তোলারেইনকোট গায়ে লম্বামতোন এক আরোহী। বৃষ্টি ঝুম হয় নামলে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে সেই সাইকেল আরোহী। কিন্তুএকবারও দৃষ্টির বাইরে যাচ্ছে না। ওভারটেকও করছেনা। ওরা বোধ হয় ফলো করছে। না করার কারণ নেই। মর্গে কে লাশ নিতে আসে, দেখার জন্যেই ওরা ফাঁদ পেতেছে। মোহম্মদ আলি জানেন, এই আরোহী তার বাড়ি চিনে যাবে। দরজায় কি চকখড়ি দিয়ে দাগওদিয়ে যাবে নাকি?
১১
ছি ছি এত্তা জাঞ্জাল! কাঠের চেয়ারে পা ঝুলিয়ে বসেছে লোকটা। পা মাটি ছোঁয়নি। এই বেঁটে বামনটাকে এর আগেকোনোদিন দেখেননি মোহম্মদ আলি। তবু লোকটাকে দেখামাত্র চিনে ফেললেন। বহুদিন আগে স্বপ্নে একে দেখেছিলেন। লিমোজিনে বসে ছিল। স্বপ্নের স্মৃতি এতো স্পষ্ট মনে থাকে! লোকটা কুৎকুতে চোখে তাকিয়ে আছে মোহম্মদ আলির দিকে। সেই চাহনিতে কোনো ক্রোধ বা প্রতিহিংসা নেই। এখন আর্ত চিৎকার শুরু করলে কি কোনো কাজ হবে? মনে হয় না। তাতে পরিণতি ত্বরান্বিত করা হবে কেবল। মোহম্মদ আলিকে শক্ত রশি দিয়ে পিঠমোড়া করে বেঁধে কাঠের চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে। ডাইনিং টেবিলের উল্টোদিকে একইভাবে পিঠমোড়া বাঁধা জমিলা। দুজন দুজনের দিকে পিঠ দিয়ে বসে আছেন তারা। ডাইনিং টেবিলের সেটের চেয়ার এগুলো। বেঁটে লোকটা বসে আছে মোহম্মদ আলির মুখোমুখি। সে এ বাসায় একা আসেনি। তার আরো চার সাঙ্গাত এসেছে। বসে আছে আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। চার জনকেই আগে একবার দেখেছেন মোহম্মদ আলি। সানগ্লাস পরা চার লম্বুজি। তারা কলিং বেল বাজিয়ে ভদ্রজনোচিতভাবেই ঢুকেছে এই বাসায়। জমিলা দরজা খুলে দিয়েছিল। মোহম্মদ আলি তখন ছিলেন বাথরুমে। বাথরুম থেকে বেরুতে বেশ দেরি হয়েছিল মোহম্মদ আলির। বেরিয়ে দেখেন, সোফায় অতিথির মতো ভদ্র হয়ে বসে আছে দস্যুরা। জমিলার সঙ্গে এমন হেসে হেসে কথা বলছে, যেন কতোকালের চেনা। জমিলাও তাদের সঙ্গে রীতিমতো আড্ডা জমিয়ে তুলেছে। আতিথেয়তাও প্রায় শেষদিকে। ‘আপনার কফির তুলনা হয় না ভাবি!’ কফির মগ একহাতে তুলে ধরে আমুদে গলায় বলেছিল বেঁটে বামন। এ কথাশুনে বাকি চার সাঙ্গাত এমন দুলে দুলে হেসে গড়িয়েপড়ছিল যে, তাদের একজনের মগথেকে কফি ছলকে কালো কোটটানষ্ট করে দিলো। ‘ও মা, এর মধ্যে এমন হাসির কী পেলেন?’ জমিলাও কৌতুকের চোখে বলেছিল। জমিলার মাথায় ঘিলু বলে কিকিছু নেই? সে টের পাচ্ছে না সন্ধ্যারাতে তাদের বাড়ি ভরে গেছে দস্যুতে? বাথরুমের হলুদ তোয়ালা হাতে স্তম্ভিতের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন মোহম্মদ আলি। অতিথিরা দেখেও না দেখার ভাণ করে গল্পগুজব চালিয়ে গেল। ‘এই, তুমি এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন?’ বলেছিল জমিলা। ‘দ্যাখো, তোমার পুরনো বন্ধুরা এসেছে। এতো মজার মজার কথা বলতে পারে তোমারবন্ধুরা! আমার পেট ফেটে যাচ্ছে। ওহ মাগো! ’ জমিলা কি পাগল হয়ে গেছে? সে দেখতেও পাচ্ছে না মোহম্মদ আলির আতঙ্কে বিস্ফারিত চোখ? ‘আচ্ছা, একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি আপনাদের,’ জমিলা আরেকটা কোনো মজার কথা শোনার প্রস্তুতি নিয়েকথা শুরু করেছে। ‘এই রাতেরবেলা আপনারা সবাই চোখে কালো সানগ্লাস পরে আছেন কেন? হাসাবেন না। সিরিয়াসলি জবাব দেন। কৌতুহল হলো দেখে প্রশ্ন করলাম।’ প্রশ্নটা শুনে একটা ফিচেলহাসি ছড়িয়ে পড়েছিল বেঁটে বামনের ঠোঁটে। ‘না। না। আর হাসাবেন না। আমি সিরিয়াসলি করেছি প্রশ্নটা।’ ফিচেল হাসি আরো বিস্তৃত হয়েছিল। ‘না। হাসাবো না। সিরিয়াসলি বলছি। আমরা সবাই সানগ্লাস পরে আছি একটা জিনিস লুকাবার জন্যে।’ ‘কী সেটা?’ ‘এই কথাটা লুকাবার জন্যে যে, আমাদের কারো চোখ নাই।’ জমিলা প্রথমটায় বুঝতে পারলো না ঠাট্টাটা। বেঁটে বামনের মুখে এখনও ফিচেল হাসি। ‘যাহ!’ জমিলার প্রতিক্রিয়া। ‘সত্যি বলছি, ভাবি। আমাদেরকারো চোখ নাই। শুধু কোটর আছে। আর সেই জন্যেই আমরা আপনাদের বাসায় এসেছি।’ জমিলার হাসি হাসি মুখটা একটু ম্রিয়মান হয়ে গেল। সে ঠিকমতো বুঝতে পারছে নাএটা কোন ধরনের রসিকতা। এতে হাসা উচিৎ হবে কিনা। ‘কেন? সেই জন্যে কেন আমাদের বাসায় এসেছেন?’ জমিলা আবার প্রশ্ন করেছিল। ‘কারণ আমরা আপনাদের চোখগুলো উপড়ে নিবো। আপনারএবং আপনার স্বামীর। নিয়ে আমাদের চোখে বসিয়ে দিবো।’ জমিলার মোটা মাথা এবার কাজ করতে শুরু করেছিল। তার মুখ স্তম্ভিত। সে উঠেদাঁড়িয়েছে। ‘উঠবেন না। বসুন ভাবি। বসুন মোহম্মদ আলি সাহেব। ছয় মাস লেগে গেল আপনার সন্ধান পেতে।’ শুরুতে বেঁটে বামনটা অনেককথা বলেছে বাচালের মতো। বোঝা যাচ্ছে সে-ই রিংলিডার। এখন সে চুপচাপ বসে আছে চেয়ার টেনে। অনেকক্ষণ ধরেই এভাবে বসে আছে। তাকিয়ে আছে মোহম্মদ আলির দিকে। সানগ্লাস খুলেফেলেছে। চোখ ঠিকই আছে লোকটার। কোটরসর্বস্ব নয়। লোকটা অপেক্ষা করছে। রান্নাঘরে পাঠানো হয়েছে এক সাঙ্গাতকে। তার জন্যে অপেক্ষা করা হচ্ছে। সাঙ্গাত একটা লম্বাটে ছুরি গ্যাসের বার্নারে গনগনে গরম করে আনতে গেছে। ‘কামারের পেটানো লোহার মতো গনগনে লাল হয় যেন ছুরিটা,’ যাওয়ার আগে নির্দেশ দিয়েছিল বেঁটে বামন। ছুরিটা এলে সেটা দিয়ে চোখউৎপাটন শুরু হবে। প্রথমে মোহম্মদ আলির। তারপরে জমিলার। একটা ছুরি গনগনে লাল হতে কতো সময় লাগে? সাঙ্গাত কিবেশি সময় নিয়ে ফেলছে? মোহম্মদ আলিই যেন ধৈর্য্যহারিয়ে ফেলছেন। চেয়ারে বসে পা দোলাচ্ছে বেঁটে বামন। তার কোনা তাড়া নেই। এ সময় একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটলো। কোথা থেকে যেন ঘরে উদয় হলো মর্জিনা। বেড়ালটা এতোক্ষণ কোথায় ঘাপটি মেরেছিল, কে জানে। সেটা লাফিয়েডাইনিং টেবিলে উঠে বেঁটে বামনের দিকে তাকিয়ে রাগত স্বরে ‘গররর্র........’ করতে শুরু করলো। এ বাসায় যে আরেকটা প্রাণীথাকতে পারে, এটা এতোক্ষণ টের পায়নি দস্যুরা। একটু যেন বিস্মিত হয়েছে তারা। বেঁটে বামন চেয়ারে বসে থেকে কী একটা ইশারা করলেন। সোফা ছেড়ে উঠে এক সাঙ্গাত এগিয়ে যেতে শুরু করলো মর্জিনার দিকে। কিন্তু মর্জিনার কাছ পর্যন্ত সে পৌঁছতে পারলোনা। মাঝপথে দাঁড়িয়ে পড়ে হঠাৎ হেঁচকি তুলতে শুরু করলো লোকটা। হেঁচকি তুলতেতুলতে সে মেঝেতে শুয়ে পড়লো। তারপর খিচুনি দিয়ে কাঁপতে থাকলো তার শরীর। কয়েক মুহূর্তে নিস্তেজ হয়ে গেল। বেঁটে বামন বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকলো মেঝেতে লুটানো সাঙ্গাতের দিকে। তার মুখ হাঁ হয়ে গেছে। সেই হাঁ-করা মুখে একটা হেঁচকি উঠলো, ‘উকচ্!’ বেঁটে বামন মুখে হাত চাপাদিলো। তার চোখে আতঙ্ক।
১২
ফেরারী দূরে একটা লম্বা বাঁকা আলোর মালা পিট পিট করছে। রাতের বেলার যমুনা ব্রিজ এতো অপূর্ব দেখায়। পাশের আসনে জমিলা ঘুমিয়ে পড়েছে। তার কোলে মর্জিনা।সেও ঘুমন্ত। মোহম্মদ আলির পক্ষে ঘুমানো সম্ভব নয়। তিনিই গাড়ি ড্রাইভ করছেন। সারারাত গাড়ি চালাতে হবে তাকে। যতোটা সম্ভব দূরে সরে পড়তে হবে। দস্যুগুলো কতোক্ষণ মেঝেতে ওরকম অচেতন পড়ে থাকতে পারে? মোহম্মদ আলি হিসাব কষলেন : মর্জিনা অচেতন হয়ে পড়ে ছিল সাড়ে সাত ঘণ্টা। একটা পূর্ণবয়স্ক মানুষের শরীর একটা বিড়ালের চেয়ে কতোগুণবড়? বিষক্রিয়া একই অনুপাতে হবে তো, নাকি? ঘটনাটা মনে হয় মর্জিনাই ঘটিয়েছে। উপর থেকে হরলিক্সের সেই বয়ামটা নিচের তাকে আনার পেছনে সেছাড়া আর কে দায়ি! আর জমিলাআবারও করেছে সেই ভুল। কী করবে, হুবহু চিনির মতোই যেদেখতে ওই পাউডার। ভাগ্য ভালো, জমিলা দস্যুদের অতিথি ভেবে ভুল করেছিল। ‘না। বলো যে, ভাগ্য ভালো, তাদের কফি খেতে দিয়েছিলাম,’ ঘুম ঘুম কণ্ঠেপাশ থেকে বলে উঠলো জমিলা। মোহম্মদ আলি খুব বিস্মিত হলেন। ‘তুমি কি আমার চিন্তা পড়তেপারছো নাকি?’ ‘চিন্তা পড়তে পারবো কিভাবে? তুমিই তো সারাক্ষণ বিড়বিড় করছো। আচ্ছা, গাড়ি চালানো শিখলা কোথায় তুমি?’